অতিরিক্ত ডিউটির চাপে অসুস্থ হয়ে পড়ে চিকিৎসক !

বেহাল দশায় রামগড়ের চিকিৎসা ব্যবস্থা

খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার ৫০ শয্যার হাসপাতালে মাত্র ১ জন মেডিকেল অফিসার(এমও) পোষ্টিং রয়েছে। পার্শ্ববর্তী একটি উপজেলা হাসপাতাল হতে আরেকজন মেডিক্যাল অফিসারকে সংযুক্তি আদেশে এখানে পাঠিয়ে এ দুজন ডাক্তার দিয়ে কোন রকমে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্থানীয়রা।

সূত্রে জানা যায়, এরমধ্যে গত শনিবার রোগীদের অতিরিক্ত চাপে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে ডা. জান্নাতুল মাওয়া শুভ্রা নামে এক মেডিক্যাল অফিসার অসুস্থ হয়ে কুমিল্লা মেডিক্যালে চিকিৎসার জন্য গেছেন।

খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি হাসপাতাল থেকে সংযুক্তি আদেশে রামগড়ে কর্মরত ডাক্তার ফরহাদ কামাল জানান, প্রতিদিন আউট ডোরে ২৫০-৩০০ রোগিকে চিকিৎসা দিতে হয়। এছাড়া ইনডোর ও করোনা ইউনিটের রোগি তো আছেই। অতিরিক্ত ডিউটির চাপে ডা. শুভ্রা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন।

তিনি আরও বলেন, এভাবে চলতে থাকলে তিনি নিজেও যে কোন সময় অসুস্থ হয়ে পড়তে পড়েন। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে হাসপাতালে ডাক্তার শূণ্যতায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম উদ্বেগ উৎকন্ঠার মধ্যে রয়েছে।

গত রবিবার (৪ জুলাই) পর্যন্ত রামগড়ে ১০৮ জন করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ৪জন চিকিৎসাধীন আছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ৫০ শয্যার হাসপাতালে একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচ এন্ড এফপিও), ১০জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারসহ ৯ জন মেডিক্যাল অফিসার ও একজন ডেন্টাল সার্জন, ১০জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, ১জন এনেসথেসিয়াসিস্ট, ১জন এসিস্টেনস সার্জন(মেডিসিন), ১জন এসিস্টেনস সার্জন (সার্জারি), ১জন ওটি এটেন্ডেন্ট, কার্ডিওগ্রাফার ১জন ও ১জন এসিস্টেন্ট সার্জন থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে রামগড় হাসপাতালে ইউএইচ এন্ড এফপিও এবং একজন মেডিক্যাল অফিসার পোস্টিং আছেন।

এছাড়া উপ-সহকারি মেডিক্যাল অফিসারের ৫টি পদের মধ্যে পোস্টিং আছে দুজন এবং প্রেষণে কর্মরত আছে ২ জন। নার্সিং সুপারভাইজারের দুটি পদই শূণ্য। এ পদে দুজন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে আছে। এছাড়া সিনিয়র স্টাফ নার্সের ১৪ টি পদের মধ্যে ৬টি শূণ্য, এসিস্টেন্ট নার্সের একমাত্র পদ এবং মিডওয়াইফের ৫টি পদ শূণ্য। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) ৩টি পদের মধ্যে ২টি শূণ্য, মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট (রেডিও), মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট (পিজিও) ল্যাব এটেন্ডেন্ট, প্যাথলজিষ্ট ও কম্পাউন্ডারের পদগুলো শূল্য।

এছাড়া স্বাস্থ্যপরিদর্শকের ২টি পদ ও সহকারি স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ৪টি পদ শূণ্য। এছাড়া ওয়ার্ডবয়, আয়া, ক্লিনারের কয়েকটি পদও শূণ্য। এদিকে, গাইনী ডাক্তার না থাকায় প্রসূতি সেবা কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। দুটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রও ডাক্তার শূণ্য।

এদিকে, ৩১ শয্যা থাকাকালীন সময়ে অপারেশন থিয়েটার রুমে প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়। ২০০৩ সালে পালস্ অক্সি মিটার, ফটো থেরাপি মেশিন, এনেস্থিসিয়া মেশিন ইত্যাদি স্থাপন করা হয়। ২০০৭ সালে অপারেশন থিয়েটারে স্থাপন করা হয় অটো ক্লেব মেশিন। কিন্তু সার্জন, গাইনী কনসালটেন্ট ও এনেস্থিসিয়া ডাক্তার পোস্টিং না দেয়ায় একদিনের জন্যও অপারেশন থিয়েটার চালু করা হয়নি । ব্যবহার করা হয়নি কোন মেশিন বা সরঞ্জাম।

আরো জানা গেছে,২০১৩ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার পর বর্ধিত ভবনে আরও দুটি অপারেশন থিয়েটার রুম নির্মাণ করা হয়। এখানেও অপারেশনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্রসহ যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। ২০১৪ সালে স্থাপন করা হয় হট এয়ারোভেন মেশিন ও আরও একটি এনেস্থিসিয়া মেশিন। পুরাতন অপারেশন থিয়েটারের মত নতুন অপারেশন থিয়েটারও এখনও চালু হয়নি। অনেক যন্ত্রপাতি এখনও বক্স থেকেও খোলা হয়নি। দুটি রুমের মধ্যে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে মূল্যবান সব সরঞ্জাম।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অপারেশন থিয়েটারে যাবতীয় যন্ত্রপাতি ছাড়াও অপারেশনের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রও সরবরাহ করা হয়। বছরের পর বছর তালাবদ্ধ রুমে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার কারণে কোটি কোটি টাকার এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ২০০৫ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কোরিয়ার তৈরী ৩০০ এমএম ক্ষমতা সম্পন্ন একটি এক্স রে মেশিন দেয়া হয় এ হাসপাতালে। মেশিনটি ২০০৬ সালের জুন মাসে এক্স রে রুমে স্থাপন করা হলেও একদিনেও জন্যও চালু করা হয়নি। বর্তমানে মেশিনটি অকেজো অবস্থায় ঐ কক্ষে পড়ে আছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রতীক সেন হাসপাতালে ডাক্তার শূণ্যতায় নাজুক অবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এখন আমরা যারা কর্মকত আছি সবাইকে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি হাসপাতাল থেকে ডা. রাকেশ ত্রিপুরা নামে একজন মেডিক্যাল অফিসারকে রামগড়ে সংযুক্তি আদেশ করা হলেও তিনি এখনও যোগদান করেননি। তিনি আরও জানান, গত অক্টোবরে ডা. আরাফাত নামে একজন মেডিক্যাল অফিসারকে ঢাকা থেকে রামগড়ে পোষ্টিং দেয়া হলেও সংযুক্তি আদেশে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে এবং সেখান থেকে প্রেষণে মাটিরাঙ্গা হাসপাতালে কর্মরত আছেন।

রামগড় উপজেলা চেয়ারম্যান বিশ্ব প্রদীপ কার্বারী বলেন, রামগড় উপজেলার জনসাধারণ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ফটিকছড়ি উপজেলার বাগানবাজার ও দাঁতমারা ইউনিয়নের বিপুল সংখ্যক বাসিন্দাও রামগড় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন। ডাক্তার শূণ্যতার কারণে নিজের চিকিৎসা নিয়ে সবাই কমবেশি এখন উদ্বেগের মধ্যে আছেন।

তিনি বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তার পোষ্টিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কে অনুরোধ করা হয়েছে। সহসাই ডাক্তার সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।