অনিশ্চয়তার মুখে লামার ৪ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮শ শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন

আছে শিক্ষক, আছে শিক্ষার্থী, অপ্রতুল হলেও আছে অবকাঠামোগত সুবিধা। শুধু নেই, শিক্ষকদের বেতন ও ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তির ব্যবস্থা। বিনা বেতনে কর্মরত শিক্ষকেরা বিদ্যালয় ছেড়ে চলে গেলে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার চারটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮ শতাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত দূর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের শিশুদের জন্য এ চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া আশপাশের পাঁচ কিলোমিটারের এলাকার মধ্যে আর কোন বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। প্রতি বছর সরকারীভাবে বিনামুল্যের বই ছাড়া আর কোন সুযোগ সুবিধাই পাচ্ছেনা বিদ্যালয়গুলো। এ অবস্থা থেকে উত্তোরনে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সু-দৃষ্টি কামনা করছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও তিন ইউনিয়নবাসী।

অভিভাবক আলী হোসেন ও মো. সৈয়দ বলেন, শিক্ষকরা আর বিনা বেতনে ছেলে মেয়েদের পড়াতে চাচ্ছেনা। তারা চলে গেলে ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়ে কাজে লাগিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা। এই বিষয়ে আমরা পার্বত্য মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি ও সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

সূত্রে জানা যায়, লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যালয়বিহীন পাড়া ও গ্রামের কোমলমতি ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতের জন্য স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও অধিবাসীরা নিজেদের অর্থায়নে ৪টি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন,দীর্ঘদিনেও সরকারী করন না হওয়ার ফলে বর্তমানে শিক্ষকরা চাকরী না করার মতো পরিস্থিতি হওয়ায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে শিক্ষার্ত্রীদের শিক্ষা জীবন।

মিরিঞ্জা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র মেন্নাই মুরুং জানায়, আমার বাবা গরীব, জুম চাষ করে কোন মতে সংসার চালান। অন্য বিদ্যালয়ের যারা পড়ালেখা তারা সবাই উপবৃত্তি পায়, আমরা পাইনা। তাই মাঝে মধ্যে লেখাপড়া খরচ চালাতে বাবার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আরো জানা গেছে, ২০০১ সালে লামা পৌরসভার নুনারঝিরি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২০০০ সালে লামা সদর ইউনিয়নের মিরিঞ্জা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৯৯৮ সালে সরই ইউনিয়নের ধুইল্যা পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২০১১ সালে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের কমিউনিটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। যেসব এলাকায় বিদ্যালয়গুলোর অবস্থান,সেসব এলাকার মানুষগুলো একেবারেই হতদরিদ্র। এ চারটি বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৮ শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী পড়ালেখা করছে। বিদ্যালয়ে কর্মরত আছে ১৬ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিনা বেতনে পাঠদান করা শিক্ষকরা বর্তমানে মানবেতর দিন যাপন করছে।

ধুইল্যাপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিন, সহকারী শিক্ষক নাছিমা আক্তার বলেন, বিদ্যালয়গুলি সরকারি না হওয়ায় আমরা যেমন মানবেতর জীবন যাপন করছি, তেমনি ছাত্র-ছাত্রীরাও দিন দিন ঝরে পড়ছে।

কমিউনিটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক আব্দুস সোবাহান বলেন, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে শিক্ষার্থীদের মাঝে পাঠদান দিয়ে যাচ্ছি। অথচ সরকারি কোন সুযোগ-সুবিধা বিদ্যালয়গুলো পাচ্ছে না।

মেরেঞ্জা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল হামিদ বলেন,আমরা বছরের পর বছর দূর্গম পাহাড়ী এলাকার কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছি। অথচ আমাদের বিদ্যালয়গুলো আজও পর্যন্ত সরকারি করণের আওতায় আসেনি।

ধুইল্যা পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্য ইদ্রিস কোম্পানি বলেন, এলাকার বিদ্যালয় গুলো সরকারি সহযোগিতা পেলে মানোন্নয়ন দিন দিন বৃদ্ধি পাবে এবং টিকে থাকবে। তা না হলে কোমলমতি শিক্ষার্থীগুলোর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। কারন এসব এলাকার মানুষগুলো হত দরিদ্র।

এই ব্যাপারে লামা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার চৌধুরী জানায়, জাতীয়করণের তালিকা থেকে বাদ পাড়া চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিইসি পরীক্ষায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে শতভাগ পাশও করছে। বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ করা খুবই দরকার।

এ বিষয়ে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, পিছিয়ে পড়া পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর ছেলে-মেয়ের শিক্ষা নিশ্চিত করণের জন্য এই চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।