অরক্ষিত রামগড়ের পর্যটন খাত

NewsDetails_01

পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের অভাবে খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পর্যটন খাত ভেঙে পড়েছে। একসময় খাগড়াছড়ির পার্বত্য জেলার রামগড় উপজেলার সৌন্দর্যের সু-খ্যাতি ছিলো সর্বত্র। এ রামগড়ের সাথে জড়িয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা ইতিহাস, দুর্গম পাহাড়, সবুজের সমারোহ, সাজানো চা বাগান, রামগড় লেক, ঝুলন্ত সেতু, বঙ্গবন্ধু পার্ক, পাহাড়ঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু, বিজিবির জন্মস্থান, শহীদ মিনার, পুরাতন ডাক বাংলো, কলসীর মুখ সহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসময় রামগড়ে পর্যটকদের ভীড় লেগে থাকতো অথচ সম্ভাবনাময় এসব স্থাপনার উন্নয়নে যথোপযুক্ত পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় ধসে পড়েছে রামগড়ের পর্যটন শিল্প। এতে করে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে আর রাজস্ব হারাচ্ছে ও সরকার উন্নয়ন বঞ্চিত হচ্ছে এ এলাকার সর্বসাধারণ।

জানা যায়, এক সময় এ রামগড়ে পর্যটকদের প্রতিনিয়ত ভীড় জমতো। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রামগড়ে ছুটে আসতো পর্যটকরা। এখন আর সে সুসময় নেয়। এক প্রকার পর্যটকহীন হয়ে পড়ছে রামগড়। নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং থাকার সুব্যবস্থা নেই বলে পর্যটক আসছেনা বলে দাবী স্থানীয় বাসিন্দাদের। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ বহর নিয়ে আসলেও হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যায়। তবে বারবার রামগড়ের পর্যটন বিকাশে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেয়ার কথা বিভিন্ন-সভা সেমিনারে শুনা গেলেও বাস্তবে তেমন কোন প্রদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

সরেজমিনে রামগড় পার্ক, স্মৃতিসৌধ, ঝুলন্তব্রীজ, কালাডেবা সুইসগেইট এলাকা ঘুরে দেখা যায় এসব পর্যটন কেন্দ্র সম্পূর্ণ অরক্ষিত। পর্যটকদের জন্য কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। বছর দশেক আগেও বিশাল আকাশের নিচে চারদিকে সবুজ গাছ-গাছালির শ্যামল ছায়ায় ঘেরা ছিল এ পার্ক। পাতাবাহার, ঝাউগাছে ও বিভিন্ন ফুলের সমারোহে ও বৈদ্যুতিক লাইটের বাহারী স্বাজে সাজানো ছিল লেকের চারপাশ। বিশাল হ্রদের উপর নির্মিত ঝুলন্ত সেতু পার্কের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছিলো কয়েক গুন। লেকের পানিতে ছিলো কয়েকটি বোর্ট যা পর্যটকদের আনন্দকে আরো কয়েকগুন বাড়িয়ে দিতো। এসব দৃশ্য অবলোকন করার জন্য ছুটে আসত দর্শনার্থীরা। বর্তমানে তার পুরটাই উল্টো। চারদিকে সবুজের সমরোহ আর নেই। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পার্কটি। কোনরকম জোড়াতালি দিয়ে টিকে আছে ঝুলন্ত সেতু। অন্যদিকে কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত রামগড় স্মৃতিসৌধ টি এক প্রকার ধ্বংসের প্রান্তে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে এটি। রাতে মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিনিত হযেছে বলেও অভিযোগ অনেকের। কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। স্মৃতিসৌধের মত একই দশা কালাডেবায় অবস্থিত সুইস গেইটের। এক সময়ের কোলাহল পূর্ণ এই পর্যটন কেন্দ্রটি এক প্রকার পরিত্যাক্ত অবস্থায় রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরঞ্জাম গুলো নষ্ট হয়ে পড়েছে।

রামগড় পার্কে ঘুরতে আসা পর্যটক এম ইদ্রিছ আলী জানান, পরিবারের সবাইকে নিয়ে রামগড় ঘুরতে এসেছেন। রামগড়ের আগের সৌন্দর্য আর নেয়। তাছাড়া এখানে থাকার জন্য ভালো হোটেল নেই। ভাল গণশৌচাগারও নেই। যার ফলে থাকার জন্য দুপুরের একটু পরই খাগড়াছড়ি সদরের দিকে রওনা হবেন।

NewsDetails_03

রামগড় উপজেলার বাসিন্দা খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য অরুণ চন্দ্র সিংহ জানান, রামগড় পর্যটনমুখর শহর ছিলো। নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে মানুষ রামগড় মুখী হচ্ছেনা। কতৃপক্ষ চাইলে রামগড়ের সুখ্যাতি আবার ফিরিয়ে আনতে পারে।

তিনি আরো জানান, দল মত নির্বিশেষে রামগড়ের জনপ্রতিনিধিদের উচিৎ রামগড়ের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে এক হওয়া। সুপরিকল্পিত ভাবে রামগড় নিয়ে কাজ করলে রামগড় খুব দ্রুত আগের সুখ্যাতি ফিরে পাবে।

রামগড় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্ব প্রদীপ ত্রিপুরা জানান, রামগড় উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে রামগড়ের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে কাজ করা হচ্ছে। রামগড়ের প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্র আধুনিক সাজ-সজ্জায় সাজানো হবে। তিনি আরো জানান, রামগড়ে সরকারি ভাবে রেস্ট হাউজ নির্মাণ হচ্ছে। নকশা পরিবর্তনের জন্য কিছুটা থমকে আছে। উন্নত মানের হোটেল নির্মাণের জন্য সাধারণ ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

রামগড় পৌরসভার মেয়র রফিকুল আলম কামাল জানান, রামগড় পার্ক আগে পৌরসভার নিয়ন্ত্রনে ছিলো কিন্তু ভূমি জটিলতায় উপজেলা প্রশাসন এবং উপজেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রনে এখন। পৌরসভার যথেষ্ট লোকবল আছে। রামগড় পার্ক পৌরসভার দায়িত্বে দিলে পুনরায় ঢেলে সাজানো হবে। তিনি আরো জানান, রামগড় পরিত্যাক্ত বাস টার্মিনালটি মাদকের আখড়ায় পরিনত হয়েছে। এটি শিশু ও কিশোরদের বিনোদনের উপযোগী করার জন্য আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে।

রামগড় উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী অফিসার খোন্দকার মো. ইখতিয়ারউদ্দিন আরাফাত জানান, প্রশাসনের সামনে এমন মনোরম লেক তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি প্রথমে পরিকল্পনা নেবেন লেকটির সৌন্দর্য বর্ধন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

আরও পড়ুন