আমরা জেগে আছি !

untitled-6_232981
হ্যাঁ, আমরা জেগে আছি। আমি, আপনি এই যে জেগে আছি, তা কিন্তু ঘুমের কারণেই। মূলত ঘুমেরই পিঠে চড়ে আমরা জেগে থাকি। ‘ছায়া দোলে তারি ছায়া দোলে- ছায়া দোলে দিবানিশি ধরি’- জাগরণে যায় বিভাবরী গুনগুনিয়ে রবীন্দ্রনাথ। আধো ঘুম আধো জাগরণ। ঘুমের ছায়ায়-মায়ায় লেখালেখি হয়ে ওঠে অনন্য। ঘুম এবং লেখালেখি হাতে হাত রেখেই চলে। কাজের মাঝে একটুখানি ঘুম, তন্দ্রায় হারিয়ে যাওয়া। এতে অপরাধবোধ নয়; বরং নিজেকে দিতে পারেন বাহ্বা। কেননা, এমন তন্দ্রাই আপনার কলমকে করবে আরও সক্রিয়। খসখসিয়ে ভরে যাবে পাতার পর পাতা। মার্কিন লেখক স্টিফেন কিং এমনটাই মনে করেন। স্টিফেন কিংয়ের ছেলেবেলা কেটেছে মেইনির পল্লী অঞ্চলে। ছেলেবেলার নিত্যসঙ্গী ছিল দারিদ্র্য। তবে কষ্টের জীবন তাকে পেছনে টেনে ধরে রাখতে পারেনি। বরাবরই অদম্য স্পৃহা ছিল, লেখক হবেন। লেখালেখির ব্যাপারে এবং জীবনের আরও কিছু বিষয়ে তিনি কিছু নিয়ম খুব কড়াভাবেই মেনে চলেন। তার লেখার কাজে নিজের মানসিক অবস্থা প্রস্তুতের জন্য সব সময়ে তিনি নিজেকে বলতে থাকেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যে তুমি স্বপ্নের জগতে ঢুকতে যাচ্ছ। সেই স্বপ্নের জগতে মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন আধেক ঘুমেও।

যদি আপনি সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে দেখতে চান সফলরূপে, তবে একটি নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের কোল থেকে আসতে হবেই আপনাকে। সারাটা দিন জেগে থাকাকে সঙ্গী করতে চান_ কিন্তু ঘুমকে পাত্তা দেবেন না, তা হবে না। বকেয়া ঘুমগুলো আপনার কাছ থেকে তার পাওনা বুঝে নেবেই। ঘুম অনেকটা ইঞ্জিনের জ্বালানির মতো। আপনার শরীর এবং মস্তিষ্কে সৃজনক্ষমতার জন্য ফুয়েল হিসেবে কাজ করে ঘুম। আপনার চিন্তাকাঠামোকে নিয়ন্ত্রণও করে।

কিন্তু যদি বলা হয়, ঘুমই নিয়ন্ত্রণ করে আপনার মস্তিষ্কের সৃষ্টিশীল কুঠুরিকে, তাহলে সেটা খুব বাড়িয়ে বলা হবে না। আট কুঠুরি নয় দরজা নিয়ন্ত্রণে হাত আছে চোখ বন্ধ করে রাতের সময়টাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ায়। ধরা যাক একজন গল্পকার_ তার গল্পের ঘটনা, এমনকি চরিত্রও বদলে যেতে পারে ঘুমের কারণে। যে কোনো সৃষ্টির মতোই সাহিত্য যেমন নির্ভর করে সাহিত্যিকটির মনের প্রতিনিয়ত অবস্থার ওপরে, তেমনি মনের অবস্থা অনেক সময়ই নির্ভর করে ঘুম আর জাগরণের পরিসংখ্যানের ওপরে। আপনি যেমন জেগে জেগে চিন্তা করতে পারেন, লিখতে পারেন_ ঘুমিয়েও কিন্তু আপনি সেই কাজগুলো করছেন। আমাদের বিশ্রামের ভেতর দিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত লিখে চলেছে আমাদের মনের নিয়তিগুলো।

আলফ্রেড মৌরি, ফ্রেডরিখ মিয়ার্স বা ড. মাভ্রোমতিসের মতো বড় মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের নিদ্রা ও জাগরণের মধ্যবর্তী বিপন্ন, ভঙ্গুর ও অদ্ভুত মায়াময় পৃথিবীকে বোঝাতে ‘হিপনেগগিয়া’ শব্দটাকে বেছে নিয়েছেন। স্বপ্ন, হ্যালুসিনেশন বা মায়াবিভ্রম ও নিদ্রা পক্ষাঘাতজাতীয় মানসিক অবস্থাগুলো ঘুমেরই শাখা-প্রশাখা। স্বপ্নের আগের অবস্থা, জাগ্রত থেকে ঘুমিয়ে পড়া, ঘুম থেকে জাগরণ বা নিদ্রিত দেহ ও জাগ্রত চৈতন্যের মতো অবস্থান হাজার বছর ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল, সভ্যতা ও ভাষাভেদে সেসব জাতির পুরাণ, সাহিত্য ও দর্শনে আলোচিত হয়েছে। অ্যারিস্টটল, ইয়ামম্বিশাস, কার্দানো, সিমন ফোরম্যান ও সুইডেনবর্গ তো বটেই, এডগার অ্যালান পোর উচ্চতার লেখকদের রচনায়ও মানবমনের এই বিশেষ অবস্থার প্রতিফলন নিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে নানা বর্ণনা।

স্টিফেন কিং মনে করেন, মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রম ছাড়া পুরো বছরের সবক’টি দিন যদি ঘুমের রুটিন ঠিকঠাকমতো চলে, তাহলে সৃষ্টিশীল কাজ এগিয়ে যাবে তার নিজস্ব গতিতে। এটাকে ধরা হয়ে থাকে ঘুম যদি ঠিকঠাক, সবকিছু ঠিক। শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার জায়গায় কোষে কোষে প্রভাব পড়ে এই প্রশান্তির। প্রতিটি কাজে। হেঁটে যাওয়ায় পড়বে প্রভাব। ঘুমের অভ্যাস এবং সাহিত্যচর্চা নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে রেখেছে নিজেকে। ইতালির তথ্যরূপকার গোর্জিয়া লুপি তার একদল গবেষকের সহায়তায় আবিষ্কার করেন, যদি আপনি নিজের কাছ থেকে সৃষ্টিশীল কাজের সর্বোচ্চটুকু পেতে চান, নিজেকে নিয়মিত ঘুমরুটিনে ফেলে দিতে পারেন। ঘুমঘোরে নয়, সতেজ মস্তিষ্কে সাহিত্যে নিপুণ খেলায় কালি ও কলমে মেতে উঠবেন আপনি।

গোর্জিয়া লুপি ও তার গবেষক দল দেখতে পায়, যেসব লেখক নিয়ম মেনে ঘুমাতে যান এবং নিয়ম মেনে জাগ্রত হন, তারা অন্যান্য সাহিত্যিকের থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে আছেন। এবং লেখালেখির মানের ক্ষেত্রেও এগিয়ে আছেন তারা। অনেকে সকালবেলায় ঠিক ঠিক সময় মেনে ঘুম থেকে উঠে নির্দিষ্ট সময়ে প্রস্তুত হয়ে কাজের স্থানে পেঁৗছে যান। চেষ্টা করেন, নিজের ডেস্কের চারপাশের আলো, আবহাওয়া আর বাকি সবকিছু ঠিকঠাক রাখতে, যাতে করে আরও বেশি উৎপাদনশীল হতে পারেন তিনি। সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারে তার মাথা। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ রকম কোনো কিছুতেই নয়, বরং একমাত্র ক্লান্তিই পারে মানসিকভাবে মানুষকে আরও বেশি সৃষ্টিশীল করে তুলতে।

গবেষকরা এ ক্ষেত্রে মানুষকে দিন ও রাতের কাজের ভিত্তিতে ভাগ করেন আর দেখতে পান যে মানুষের মস্তিষ্ক তখনই অত্যন্ত প্রখরভাবে কাজ করতে পারে, যখন কি-না তার হাতে প্রচুর কাজ থাকে, অর্থাৎ দিনের বেলায়। এ সময় প্রচুর পরিমাণ কাজের চাপে কর্মক্ষম হয়ে থাকে মানুষের শরীর আর মস্তিষ্ক হয়ে পড়ে প্রচণ্ডভাবে কর্মঠ। অন্য সময়, অর্থাৎ দিনের শেষভাগে, যখন মানুষের কাজের চাপ কমে যায়, তখন ধীরে ধীরে একটু একটু করে সারাদিনের কাজের ক্লান্তি চেপে বসতে থাকে তার মন ও মস্তিষ্কে। ফলে খুব বেশি কাজ করতে পারে না মস্তিষ্ক। চিন্তার পরিসর, যুক্তির সীমা ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে, আর সামনে যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে তার বাইরেও একটা বড় পরিসর মাথার ভেতরে খেলা করে মানুষের। ক্লান্ত মস্তিষ্ক নানা রকম অদ্ভুত সব ভাবনা নিয়ে খেলতে থাকে। সৃষ্টিশীল হয়ে উঠতে থাকে মানুষ। চোখে এত এত ঘুম লেগে থাকে। আঁধার নামার পর ক্রমে জীবনের ক্লান্ত ভারে ডুবে যাওয়া। বিগত কান্নার বিনিময়ে চিত্রনাট্য লেখে আবছায়া পটে। ঘুমোয় না শুধু মস্তিষ্ক।

কিংবদন্তিতুল্য ইংরেজ লেখক চার্লস ডিকেন্সও ঘুম না হওয়ার পেছনে বিছানাকে দায়ী ভাবতেন। তিনিও বিশ্বাস করতেন, বিছানার অবস্থান অনিদ্রার সমস্যা কাটাতে পারে। তিনি সব সময় বিছানার মাথার দিকটা দক্ষিণে রাখতেন। শুধু দখিনা হাওয়ায় অবশ্য তার চলত না, তিনি বিছানায় শুয়ে দু’পাশে হাত ছড়িয়ে ঠিক মাঝামাঝি জায়গাটা ঠিক করতেন, তার পর সেখানে ঘুমাতেন। জাদুবাস্তবতার রাজা, লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গল্প-উপন্যাসে ঘুম নিয়ে বিস্তর জাদুময়তা থাকলেও তিনি নিজে মনে করতেন, একজন লেখকের সবচেয়ে কঠিন এবং প্রথম কাজটি হচ্ছে তার বিছানা থেকে লেখার টেবিল পর্যন্ত দূরত্বটুকু অতিক্রম করা।

এদিকে, ফ্রানৎস কাফকার ঘুম নিয়ে তেমন একটা সমস্যা ছিল না। কিন্তু যখনই নতুন কোনো লেখা শুরু করতেন কিংবা কোনো লেখার প্লট মাথায় ঘুরপাক খেত, তখনই নিদ্রাহীনতায় পেয়ে বসত তাকে। তার দিনপঞ্জিতে কাফকা ঘুম আনার খুব প্রিয় একটি পদ্ধতির উল্লেখ করেছেন নিজেকে যতটা সম্ভব ভারী করে নেওয়ার জন্য, যাকে আমি ঘুম আসার একটি ভালো উপায় মনে করি, আমি আমার দুই হাতকে আড়াআড়িভাবে কাঁধের ওপর রাখি। এর ফলে আমি শয্যায় বোঝাসহ একজন সৈনিকের মতো শুয়ে থাকি।

নোবেলজয়ী ইংরেজি সাহিত্যিক, জঙ্গল বুকখ্যাত রুডইয়ার্ড কিপলিং অনিদ্রায় ভুগতেন। যখন ঘুম আসত না তখন তিনি বাড়ি ও বাগানে হাঁটাহাঁটি করতেন। তিনিই লিখেছিলেন, ‘আমাদের করুণা করো! ওহ করুণা করো! আমরা জেগে আছি!’ সূত্র : সমকাল ।

আরও পড়ুন
Loading...