আমার মা

পৃথিবীর সব ছেলেমেয়েই মনে করেন তার মা-ই সেরা মা। আমার কাছে মা কেমন তা কোন দিন ভেবে দেখিনি, হয়ত মায়ের অভাব বুঝতে দেয়নি বলে। তাছাড়া আমি অনেক ভাইবোনের মধ্যে একটু সৌভাগ্যবান। কলেজ জীবন পর্যন্ত, প্রতিদিন মাকে পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে অনেকটা সময় মায়ের কাছ থেকে দূরে ছিলাম। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আমার প্রয়োজনের সময় সবসময় কাছে পেয়েছি। হলে কোন একদিন ঘুমুতে পারছিলাম না। ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখছিলাম। কাঁচা ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হলো মাকে বলে দেখি, কি করা যায়। ডাক দিতেই তিনি চলে এলেন এবং কি করতে হবে বললেন। আমি তাই করলাম। অবাক হওয়ার মতো কান্ড ! পর মূহুর্তেই সব ঠিক।
আমার মায়ের পুরস্কার পাওয়া নতুন কিছু নয়। গান বাজনা আর খেলাধুলার মাধ্যমে, গ্রামে প্রতিবছর বৈসাবি উৎসব উৎযাপন হতো। আর উৎসবটি শেষ হতো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান দিয়ে। পাড়ার ছেলেমেয়েরা নানা মজার মজার বিষয়ে পুরস্কার দিতো। তেমনি একটি ছিলো ‘গ্রামের সেরা মা’ পুরস্কার। এই পুরস্কারটি অনেকটা মায়ের জন্যই বরাদ্দ থাকতো। মনোনয়ন করতো পাড়ার তরুণরা মিলে আর পুরস্কার তুলে দিতেন আমারই বাবা।
পাড়ার গন্ডি পেরিয়ে মা ইদানিং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রির হাত থেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ের জয়িতা হিসেবে পুরস্কার (জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ-২০১৬) গ্রহণ করার পর থেকে আমার পরিচিত সাংবাদিক বন্ধুরা অনুরোধ করছিল মাকে নিয়ে একটি লেখা তৈরী করার।

ছবি- উবা প্রু মারমা
বাবা মাট্রিকুলেশন পাশ করার পর মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি মং রাজাই মূলত বাবা মার বিয়ে ঠিক করেছিলেন বলে শুনেছি। মা মানিকছড়ি থেকে মহালছড়িতে প্রথম এসেছিলেন হাতির পিঠে চড়ে। সেদিন নাকি বাবার মাট্রিকুলেশন পাশের সময় যেমনি অনেক দূর দূরান্ত থেকে লোকজন দেখতে এসেছিলেন, মাকেও নাকি দেখতে এসেছিলেন অনেকে। সময়টি ছিল যে বছর কাপ্তাই বাধেঁর পানি প্রথমবারের মতো মহালছড়ি পর্যন্ত উঠেছিল।
আমার মা অন্য অনেক মায়ের মতো পড়ালেখা করেননি। কিন্তু কথা বললে মনে হবে তাঁর কত পড়ালেখা জানা। আমার মা ইংরেজি বলতে পারেন না তবে কিছু কিছু শব্দ বুঝতে পারেন। মা জাতিতে চাকমা নন কিন্তু অনেক চাকমা বন্ধুরা অবাক হবেন তার চাকমা ভাষার দক্ষতা জেনে। আমাদের গৃহ শিক্ষকের মতন পড়াতে পারেননি ঠিকই কিন্তু পড়ার সময়টুকুতে সর্বক্ষণ দরজার সামনে বসে থেকে পাহারা দিয়েছেন বছরের পর বছর। আমরা অনেকগুলো ভাইবোন বলে মা তার মহামূল্যবান সবটুকু সময় আমাদের পিছনে ব্যয় করেছেন। আমাদের ছাত্রজীবনে মাকে কোনদিন ঘরের বাইরে কাটাতে দেখিনি। তিনি শুধু আমাদের জন্য কষ্ট করেননি এলাকায় বাবার বন্ধু-বান্ধব আর সহকর্মী ছেলেমেয়েদের জন্যও প্রচুর সময় দিয়েছেন।
বাবা স্কুলের যেনতেন শিক্ষকতা করেননি। স্কুলের দুর্বল ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়িতে এনে নিজ দায়িত্বে পড়াতেন। তাঁর জন্য সব কাজ মাকে-ই সামলাতে হতো। এর জন্য মাকে কোনদিন বিরক্ত হতে দেখিনি। কারণ মা জানতেন এবং বলতেন ‘নিজের ছেলেমেয়ের মঙ্গল আর পড়ালেখা চাইলে অন্য ছেলেমেয়েদেরকেও পড়াতে হবে। তবেই একে অপরের দেখাদেখি নিজের ছেলেমেয়েরা শিখবে ও জানবে’।
ছবি- উবা প্রু মারমা
পার্বত্য চট্টগ্রামের কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সময় বাবাকে সহায়তা করতে নিজেই নানা কাজের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যেমন: হাঁস-মুরগী পালনসহ ঘরের চারপাশ সবুজ শাকসবজি চাষ করতেন। যা থেকে আমাদের নিজেদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি হাঁসের ডিম আর মুরগী বিক্রি করা যেতো। হাঁস মুরগী পালনেও ছিল তার দারুন দক্ষতা। একদিন পাশ্ববর্তী নতুন বসতি স্থাপনকারী সেটেলাররা আমাদের প্রায় সবকটি হাঁস ধরে (৫০-৬০টি হাঁস) রেখে দেয়। বড় ভাই উহলা মং আর আমি ছোট নৌকাতে করে খুঁজতে গিয়েছিলাম আর পাওয়া যায় নি। সেই থেকে মনের দুঃখে হাঁস পালন বন্ধ করে দেন।
মাকে অর্থের প্রতি মোহ হতে কোনদিন দেখিনি। যেদিন হাতির পিঠে চড়ে মহালছড়ি এসেছিলেন সেই সময়ের জন্য অনেক স্বর্ণ রৌপ্য এনেছিলেন (বিয়ের সময় নিজের বাবা,মা আর আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে পাওয়া)। বাবা তার একমাত্র ছোট ভাইকে ইঞ্জিনিয়ার বানাতে মায়ের স্বর্ণ সব নামমাত্র দামে নানা জায়গায় বন্ধক রেখে অর্থ যোগাড় করেছিলেন। তার জন্য কোনদিন বাবাকে অভিযোগ করতে দেখিনি। তাঁর কিছু স্বর্ণ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে এক আত্মীয়ের বাড়ীতে রেখে স্ব-পরিবারে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে সেই আত্মীয়ের বাড়িতে ডাকাতি হওয়াতে তাও হারিয়ে ফেলেন। তারপরও অবশিষ্ট যা কিছু ছিল সেগুলো আমি হারিয়ে ফেলি। মহালছড়ি হাইস্কুলে পড়াকালিন সময়ে (২টি স্বর্ণসহ ৫-৭টি রৌপ্য মুদ্রা ছিল) পড়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখতাম। আমি বুঝতে পারি, আমার গ্রামের ছেলে বন্ধুরাই নিয়ে ফেলেছিল। নানাভাবে চেষ্টা করেছিলাম ফেরত পেতে তার আর দেখা পাইনি। হারিয়ে ফেলায় খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। একদিন মাকে বললাম, তিনি মুশকি হেসে বললেন ‘ভাল হয়েছে’। হারিয়ে ফেলায় আজও আমার অপরাধবোধ কাজ করে। তাই আজও সময়ে সময়ে মাকে জিজ্ঞেস করি পকেট খরচ তার রয়েছে কিনা।
ফুল মায়ের খুব প্রিয়। ঘরের চারপাশ নানা জাতের ফুল লাগিয়ে রাখতেন। নিয়মিত পরিচর্চা করতেন (এখন বয়সের কারনে সেইভাবে পরিচর্চা করতে পারেন না)। বাড়ির সাথে লাগানো বড় রাস্তা হওয়াতে শুনতে পেতাম পথচারিদের মন্তব্য। তাদের অনেকে যারা সাহস করে মার কাছে ফুলের চারা চাইতে আসতেন সানন্দে দিয়ে দিতেন।
ছবি- উবা প্রু মারমা
মা যে অবস্থায় থাকুক তার দুবার ঘর পরিস্কার করা চাই। নিজেই তা করতেন। শুধু তাই নয়, বড় একটি উঠোন আর বাড়ির সামনে পথচারিদের জন্য রাস্তা প্রায় ৮শ-১ হাজার গজ পর্যন্ত নিজেই ঝাড়ু দিয়ে রাখতেন। রাত হলে হারিকেন দিয়ে হলেও ঝাড়ু দিতেন। মায়ের রান্না যারা খেয়েছেন, এক বাক্যে স্বীকার করবেন তাঁর রান্নার দক্ষতা নিয়ে। ঘরের অতিথি এলে সকলে মায়ের প্রশংসা করে যেতেন। আমি এমনও দেখেছি দিদিদের স্বামীরা মাকে রান্না করতে দেখলে খেয়ে যাওয়ার বায়না করতেন। অনেক নিকট আত্মীরা বাড়ির উঠানে পা রাখতে রাখতে বলতেন ‘নিশ্চয়ই মাষ্টমা রান্না করছে’। আমরা নিজেরাও টের পেতাম। পার্থক্য করতে পারতাম দিদিদের রান্না আর মায়ের রান্না। সবজি কাটতেন অত্যন্ত নিখুঁত হাতে। আর শাক সিদ্ধ ‘আপ্রেং’ কাটতেন যাদুকরি হাত দিয়ে। মায়ের রান্না করা মিষ্টি কুমড়া শাক বা লাউ শাক খেলে কখনো মুখে আঁশ পাওয়া যেতো না। আঁশ পরিস্কার করতেন নিখুঁত হাতে যেন বাঁশ থেকে বেত বের করা হচ্ছে। মায়ের এই দক্ষতা দিদিদের কেউ পায়নি।
মা শুধু আমাদের ১১ ভাইবোনের মা নন। পাড়ার সকলের ও মা। পাড়ার নারীরা নানা পারিবারিক বিশেষ করে, চাল আর ছোট খাট অর্থ সংক্রান্ত সমস্যাবলী নিয়ে আসেন এখনও পর্যন্ত। মা’র পক্ষে সম্ভব হলে চেষ্টা করেন হাসি মুখে সমস্যাটি সমাধানের। গ্রামে মায়ের সমবয়সিসহ তার অধিক বয়সি সকল নারীরা এখনও দিনে দু একবার করে দেখা করতে আসেন, তারা বসে স্বল্প সময়ের জন্য চা বিস্কুট খেয়ে চলে যান।
এছাড়া গ্রামে তার মেয়ের বয়সি কিছু নারীরা দিনে পালাক্রমে নিজেদের উদ্যোগে খবর নিতে আসেন। কোন কাজে সহায়তা করতে হবে কিনা দেখে যান যেমন মাসা মা (আঞো মা), কংচাইরীর স্ত্রী (মিরাঞো) হলাব্রেচাই স্ত্রী (চোরা প্রু ), মংসাই স্ত্রী (সাউমা) ইত্যাদি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক গোলযোগ সময়ে তার আদরের দু কন্যাকে সমানভাবে পড়াতে পারেননি। যারা আজ খাগড়াছড়ি সদরে বৈবাহিক সুত্রে বসবাস করছেন, তাই তাঁর খুব দুঃখ ছিল। সেজন্য তার ঐ দু’ কন্যার নাতি নাতনিকে নিজেদের ঘরে রেখে পড়ালেখার ভিত্তিটা গড়ে দিয়েছেন (বর্তমানে বড় মেয়ের ৩ সন্তানই পড়ালেখা শেষের দিকে আর ছোট মেয়ের তিন কন্যা সন্তানের মধ্যে দুজন খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে পড়ছে অন্যজন এসএসসি পরিক্ষার্থী)।
তাঁর মতে, পড়ালেখা মানে শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার আর চাকরি করে পয়সা উর্পাজন করা নয়। বরং ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করবে একজন ভাল মনের মানুষ হতে, অন্য দশজনকে উপকার করতে আর উপকারে আসতে। তিনি খুশি তার কোন ছেলেমেয়ের জন্য আজ অবদি কারো কাছ থেকে কোন ধরনের কথা শুনতে হয়নি। তার ছেলেমেয়েরা কেউ মাদক নেয় না এবং যাদের তারা জীবন সঙ্গী হিসেবে নিয়েছেন তারাও কেউ মাদক গ্রহণ করেন না।
তিনি আজ অবদি কোন পুত্রবধুকে কোন ধরনের অভাব অভিযোগ করেননি। পুত্রবধুদের কেউ মাকে নিয়ে কোন কথা বলার সুযোগ পায়নি আজ পর্যন্ত। তেমনিভাবে জামাতারাও মাকে নিয়ে কোন কথা বলতে শুনিনি। মাকে সকলে ভালবাসেন কারণ তার সবকিছু অর্জনে সকলকে ভাগ দিয়ে থাকেন। যেমনটি পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে নাকি বলেছিলেন ‘আমার সকল জামাতা আর পুত্রবধুরাও খুব ভাল’।
বাবার মারমা বন্ধুরা (সে সময়ে মারমারা সবাই কম বেশি অবস্থা সম্পন্ন ছিলেন) সবাই কোন না কোনভাবে বিভিন্ন নেশায় আকৃষ্ট হয়ে জীবনযাপন করেছেন, সময় অতিবাহিত করেছেন। বাবাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সকল ধরনের নেশা থেকে ফিরিয়ে এনে পরিবার ও সমাজের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন, এটাই মায়ের সবচেয়ে বড় গুণ। বাবার বন্ধুরা নানাভাবে হারিয়ে গেলেও বাবাকে হারিয়ে যেতে দেননি।
ছবি- উবা প্রু মারমা
দাদীকে (বাবার মাকে) কয়েক বছর পর্যন্ত নিজের মায়ের সেবা দিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে দাদী মাকে প্রাণ ভরে আর্শীবাদ করে গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ‘তুমিই আমার আসল মেয়ে’। মাকে বাবা কিছুই দিতে পারেননি (যেমন মায়ের স্বর্ণালংকার আর ফিরিয়ে দিতে পারেননি) ঠিকই কিন্তু তার প্রাপ্য সম্মান দিতে ভুল করেননি কখনো। তিনি আমাদের সকলের নাম রাখেছেন মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে যেমন উহলা মং, আহলা মং, থুইহলা মং, মিমা প্রু আর মিস্যাং প্রু।
আমার মাকে চিনতে আরো একটি কথা বলা দরকার তাহলো আজ পর্যন্ত মায়ের সাথে কারোর কোনদিন তর্ক হয়েছে, রাগারাগি হয়েছে, গরম কথা বিনিময় হয়েছে বলে শুনা যায়নি। এমন মা আজকাল দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া বিরলই হবে। তাই আমার মাও একজন সেরা মা। তিনি নিজ যোগ্যতা দিয়ে গ্রাম থেকে বিভাগীয় পযার্য়ে সেরা পাঁচ জনের একজন জয়িতা হয়েছেন। তার এই অর্জনে তার ছেলেমেয়েদের র্কীতি আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না।
যে মারমা সমাজে এখনও বাবা মা ছাড়া নিজের আপন ভাইবোনদের দ্বারা শিক্ষা খরচ চালানোর উদাহরণ হাতে গুণা যায় (বড় ভাইবোন তার ছোট ভাইবোনদের শিক্ষা খরচ বহন)। সে সমাজে তিনি একজন উদাহরণ হতে পারেন। তিনি তার সাধ্যের মধ্যে নিজের ছেলেমেয়ে, আত্মীয় , প্রতিবেশির পাশাপাশি বাবার সহকর্মী আর বন্ধুর ছেলেমেয়েদের যারা জাতিতে অনেকেই চাকমা (একজন ত্রিপুরাসহ) তাদের জন্যও জীবনের বিরাট একটি সময় ব্যয় করেছেন। আমার মায়ের আগামী দিনগুলি মানুষের ভালবাসায় আর সুস্বাস্থ্য নিয়ে কাটুক এটাই পাঠকদের কাছ থেকে প্রার্থনা চাইবো।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও ইউএন ইনডিজেনাস ফেলো।
ইমেইল:[email protected]

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। পাহাড়বার্তার -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য পাহাড়বার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।