আমি কোথায় দাঁড়াবো

ঞ্যোহলা মং
১। আমি কোথায় দাঁড়াবো? প্রশ্নটি একজন জাপানি লেখকের। নাম নাওমি ওয়াতানাবে। তাঁর সম্পর্কে আমার খুব একটা জানা ছিল না। বই মেলায় গিয়ে প্রথম জেনেছি। তিনি চাকরিসূত্রে বাংলাদেশে ৫ বছর ছিলেন। সেই থেকে বাংলা ভাষাও সংস্কৃতির প্রতি ভালবাসা শুরু। তিনি ইতিমধ্যে বাংলায় বেশ ক’টি বইও লিখে ফেলেছেন। আমি কোথায় দাঁড়াবো তাঁর একটি বইয়ের নাম।
মেলায় একটি স্টল থেকে বইটি কিনতে গিয়ে তাঁর সাথে দেখা। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে জেনে, পার্বত্য অঞ্চলের খোঁজ খবর নিতে চাইলেন। আমরাও তাঁর আগ্রহ দেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লেখার জন্য অনুরোধ করি।
বইটি পড়তে গিয়ে বার বার মনে হয়েছে একজন জাপানি হয়ে বাংলায় বই লিখছেন আর আমি এই দেশের সন্তান হয়ে তাঁর ধারের কাছেও নেই। বলতে পারেন এমন কিছু লজ্জাবোধ নিয়েই বইটি পড়েছি।
আমরা যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকি, খুব গর্ব নিয়ে বলি ও লেখি ১০ ভাষাভাষি আর ১১ জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। কিন্তু আমরা কতজন নিজের মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা আর ইংরেজি ছাড়া পাশের গ্রামের কোন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা জানি, বলতে পারি কিংবা শেখার চেষ্টা করি?
চাকরি করতে গিয়ে তিন পার্বত্য জেলায় কাটিয়েছি। খুব কম সহকর্মী পেয়েছি যারা আমার মাতৃভাষা শেখার আগ্রহ দেখিয়েছে বা কিছু শব্দ জানার চেষ্টা করেছে। ভাষা শেখার বা জানার আগ্রহের কথা নাইবা বলি আমার নাম সুন্দর করে উচ্চারণ করার বা লেখার চেষ্টা করেছেন (মারমা কর্মী ব্যতিরেকে) কোন সহকর্মী পেয়েছি কিনা ঠিক মনে পড়ে না। যদিও এক একটি অফিসে কম করে হলেও ৩-৫ বছর কাটিয়েছি। তবে আলাপ আলোচনায় অনেক অভিযোগ পেয়েছি, জেনেছি — ‘তোমাদের মারমা ভাষা খুব কঠিন’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

বান্দরবানে চাকরি করতে গিয়ে দেখেছি অনেক বাঙালি দোকানদার মারমা ভাষা শুধু নয়, বম, খ্যাং, চাক, ম্রো আবার অনেকে খুমি ভাষা পর্যন্ত জানেন। ব্যবসার প্রয়োজনে, ক্রেতাদের মন জয় করতে তাদের একাধিক ভাষা শিখতে কোন কিছুই বাঁধা হয়ে দাঁড়াইনি।

আমরা উন্নয়ন সংগঠক, কর্মীরাও তো এক প্রকার ‘উন্নয়ন দোকানদার’ হতে পারতাম। কাজের প্রয়োজনে আমাদেরকে কত পাড়ায় না যেতে হয়। আমরা যদি পাড়াবাসিদের ভাষায় উন্নয়ন আলোচনা পরিচালনা করতে পারতাম, বুঝাতে পারতাম, বর্তমানের তুলনায় অনেক ভাল করার সুযোগ ছিল বলে মনে করি। একজন উন্নয়নকর্মীর ভাষাজ্ঞান না থাকলে ফলাফল কি হতে পারে তা অন্য একটি গবেষণা করতে গিয়ে উপলব্ধি করেছি। আপনাদের আগ্রহ থাকলে অভিজ্ঞতা নিতে খাগড়াছড়ি সদরে জীদি পাড়া ও মঙ্গারামা পাড়ায় গিয়ে দেখে আসতে পারেন।
লেখিকার অটোগ্রাফ নিতে গিয়ে আমার নাম জানতে চাইলে আমি যে বানানে লিখে থাকি সেই বানানে পরিস্কার অক্ষরে লিখে দিয়েছিলেন। যা কিনা সহকর্মীদের ভাষায় এখনো ‘তোমার নাম খুবই কঠিন’।
ঢাকায় একটি আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করা কালিন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত দুজন ছাত্রছাত্রী দেখা করতে এসেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য জেনে খুশি হয়ে একটি ছিমছাম খাবার দোকানে নিয়ে আপ্যায়ন করেছিলাম। মূলত তারা সকল প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের নামের তালিকাযুক্ত একটি প্রকাশনা বের করবে জেনে কন্ট্রিবিউশন হিসেবে দুই হাজার টাকাসহ আমার ভাইবোনদের নাম সাদা কাগজে লিখে দিয়েছিলাম, যাতে বানানে ভুল না আসে। পরে প্রকাশিত স্মরণিকার একটি কপি পেয়েছিলাম সত্য কিন্তু আনন্দ নিয়ে পাড়ার বদলে পাঁচ ভাই বোনের নামের বানান দেখে আগ্রহই হারিয়ে ফেলি। আমার নামের বানান না হয় ভুল হয়েছে বাকি চার ভাইবোনের নামের বানানও ভুল হয় কি করে? রাবিতে পাড়াকালিন সময়ে আদিবাসী বড়ভাইরা শুদ্ধ করে ডাকার চেষ্টার বদলে বরং আরো কিভাবে বিকৃত করে ডাকা যায় তার চেষ্টাই দেখেছি (তবে অনেকের মধ্যে উষাময় দা, মিহির দা ও শ্যামল দা’রা ছিলেন ব্যতিক্রম)। কিন্তু আমার সহপাঠি বাঙালি বন্ধুদের মধ্যে রবিন, আল আমিন, সুমন ও আমিরুলরা (যিনি সিএইচটিডিএফ প্রকল্পে কাজ করেছিলেন) নামের সঠিক উচ্চারণ করার চেষ্টা করে সফল হয়েছিলেন, যাদের আজও মনে রেখেছি।
জাপানি লেখক নাওমি ওয়াতানাবে যদি বাংলায় বই লিখতে পারেন। আমার ‘কঠিন’ নাম লিখতে পারেন, আপনি একজন আদিবাসী হয়ে, পার্বত্য অঞ্চলের সন্তান হয়ে কেন পারবেন না?
আসুন, মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের ভাষা ও জানার চেষ্টা করি। আমি চাকমা ভাষায় কথা বলতে পারি, তনচংগ্যা ভাষা বুঝি, বম ভাষায় কাজ চালিয়ে নিতে পারি, ত্রিপুরা ভাষায় কিছু কিছু শব্দও বলতে পারি। নাওমি পারলে আমরা কেন পারবো না। মন থেকে চেষ্টা করে দেখুন না। আপনার সুন্দর মন আর একটু ভালবাসা থাকলে কোন জনগোষ্ঠীর ৫০টি শব্দ শেখার খুব বেশি কঠিন হওয়ার কথা নয়।
২। অনেকের নজরে আনতে ভাষার মাসে উপরের লেখাটি আমি আমার ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলাম। প্রকাশিত ‘স্বরণিকা ২০১১’ এর প্রকাশনা কাজের সাথে জড়িত ছিলেন এমন একজন সদস্যের সাথে দেখা হলে নিজ থেকে প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে বললেন ‘নামের যুক্ত অক্ষর থাকায় ভুল হয়েছে’। আমি ইচ্ছা করে ইস্যুটি নিয়ে খুব বেশি এগুতে দিইনি সেইদিন। আমি দেখেছি তালিকায় থাকা অনেকজনের নামতো যুক্ত অক্ষরের ছিল, তাদের নামগুলো ভেঙ্গে না গেলেও আমাদের ৫ ভাইবোনের নামগুলো ভেঙ্গেছে। এটি আমাদের অনেকটা ইচ্ছাকৃত না হলেও ‘আমি জানি’ ভাবটার কারণে হয়েছে তা আর বলা হয় না বা স্বীকার করা হয় না।
এমনি অনেক কেস বলা যেতে পারে যেমন রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত একটি স্নারক সংকলনেও অনুরূপ ভুল লক্ষ্য করেছি। লেখকের নাম প্রকাশিত প্রবন্ধের বেলায় ঠিক থাকলেও সূচীতে গিয়ে দেখা যায় সেই ‘আমি জানি’ ‘আমি পারি’র বহিঃপ্রকাশ। গবেষণা পত্রে অংশগ্রহণকারীদের নামের সংযুক্তি অংশেও এমনটি দেখা মেলে।
ভোটার আইডি কার্ড করতে গিয়েও আমার নামের বেলায় তেমনটি হয়েছিল। বাংলা বানানে ঠিক থাকলেও ইংরেজী বানানে ঠিক থাকেনি। সেদিন রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে বসে যিনি টাইপ করছিলেন আমার নামের ইংরেজি বানান নিজের মতো করে টাইপ করেছিলেন। বলার পরও তাকে বুঝাতে পারিনি।
আমাদের মাঝে জানি ভাবতো রয়েছেই তার পাশাপাশি প্রতিবেশি গ্রামের ভাষা নিয়ে নিজেদের মধ্যে অনাগ্রহ আর অবজ্ঞা এমনটি ভুলের পিছনে কাজ করে বলে মনে করি। নিজেদের মাতৃভাষার পাশাপাশি প্রতিবেশিদের ভাষা জানলে আমরা ফেসবুকে জানান দিই না। কিন্তু ছেলেমেয়েরা ইংরেজি কিংবা হিন্দি বলতে পারলে খুশিতে ফেসবুকে পোস্ট করতে ভুল করি না।
সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে পাহাড়ী দোকানে বাজার করতে গিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একজন ছাত্রের সাক্ষাতের সুযোগ হয়। ছাত্রটি বান্দরবান আলিকদম থেকে জেনে আগ্রহ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করি। জম্ম যদিও আলিকদমে সে তার মাতৃভাষা ছাড়া নাকি কোন আদিবাসী ভাষা বুঝেন না এমনকি কিছু কিছু শব্দ বাক্যও নাকি বলতে পারেন না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বেড়াতে গিয়ে একজন আদিবাসী ছাত্রের দেখা পেয়েছিলাম, যিনি আমার জনগোষ্ঠীর নন কিন্তু আমার ভাষা জানেন, বলতে পারেন ঠিক আমাদের মতো করে। প্রথম পরিচয়ে আমাদের অনেক সময় নিয়ে গল্প হয়েছিল। বাড়ি গুইমারা উপজেলায়। আমাকে অবাক করে দিয়ে আরো বলেছিলেন, পরিবারের সকল সদস্য নাকি অনরগল মারমা ভাষায় কথা বলতে পারেন এবং তাদের অনেক বন্ধু বান্ধবও নাকি মারমা। এক পর্যায়ে মজা করে জিজ্ঞেস করি মারমা ভাষা শিখেছো কেন? তার উত্তর শুনে নিজেকে বোকাবোকাই মনে হয়েছে। মনে মনে বলি এই আমি কেমন প্রশ্ন করতে গেলাম।

আজকালকার পাহাড় সমাজে একে অপরের সংস্কৃতি কে জানার সংস্কৃতি, প্রায় হারাতে বসেছে। নিজেরা শুধু এককভাবে, ক্ষেত্র বিশেষে গোষ্ঠীগতভাবে চেষ্টা করে চলেছি নিজেদের সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করার। পাহাড়ের সংস্কৃতি, সমাজকে একত্রে ধারণ ও লালন করে লেখা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে বলেই মনে হয়।

চারদিকে তাকালে শুধুই দেখি এটা আমার, ঐটা আমার। আমরা, আমাদের সকলের বলার প্রথা ভুলতে বসেছি। লেখালেখি গুলো পড়তে গেলেও দেখা যায় ‘অমুক জনগোষ্ঠী’র জুমচাষ, ‘অমুক জনগোষ্ঠ’র কঠিন চীবর দান, নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করে রান্না ইত্যাদি।
পাহাড়ে পাড়াগুলো আগেই ভাগ হয়ে আছে মারমা পাড়া, চাকমা পাড়া, ম্রো পাড়া বলে (ছোটবেলা থেকে একটি পাড়াকে চিনতাম চিনিঅং মহাজন পাড়া নামে। পরে তা নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাবু পাড়া। ‘বাবুরা’ চিনিঅং মহাজন নামে পাড়ায় থাকবেন কি করে?)। আর এখন আমরা পড়ালেখা জানিয়েরা লেখালেখির মাধ্যমে জুমচাষকে, জুমের সংস্কৃতিকে, ধর্মীয় আচারকেও ভাগ করে আমার, আমার জনগোষ্ঠীর চর্চাগুলো ভাল, সুন্দর বলতে শুরু করেছি। আমাদের, আমরা সকলের বলার লোকজন এখন খোঁজতে হয়। এমন সমস্যা, চিন্তা সব কিন্তু আমাদের মতো শিক্ষিত লোকজনদের মধ্যেই বেশি। গ্রামীণ সাধারণ লোকজনদের মধ্যে এমন মনোভাব খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। তাঁরা এখনো জুমের তরকারী, পাহাড়ী তরকারি, আমরা পাহাড়ী মানুষ ইত্যাদি শব্দ বাক্য ব্যবহার করে কথা বলেন।
৩। আসুন, লেখালেখির আগে একটু চিন্তা করি,…….যা নিয়ে লিখবো তা কি আমার নাকি আমাদের? নিদিষ্ট কোন জনগোষ্ঠীর নাকি পার্বত্য আদিবাসী সমাজের হবে? পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের প্রতিবেশি অন্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কিছু কিছু শব্দ, বাক্য শেখার জন্যও অনুপ্রাণিত করতে পারি। প্রতিবেশি জনগোষ্ঠীর ভাষা না শেখার প্রবণতা আমাদের জন্য একটি নেতিবাচক সমন্বিত ঐতিহ্য বা Negative Composite Heritage (NCM) এর একটি উদাহরণও বটে। নিজেদের চাইতে অপেক্ষাকৃত ছোট জনগোষ্ঠী বলে তাদের কিছু শব্দ, বাক্য শেখার মাঝে নিজেকে ছোট হয়ে যাওয়া ভাবার কোন সুযোগ নেই। বরং একে অপরের দেখাদেখি চর্চাগুলো আমাদের যৌথতার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। বান্দরবান জেলায় জনসংখ্যায় ছোট জনগোষ্ঠীসব যেমন চাক, ম্রো, খ্যাং সম্প্রদায়ের প্রায় সকলে মারমা ভাষা বলতে পারলেও খুব কম মারমা রয়েছেন যারা চাক, ম্রো কিংবা খ্যাং ভাষায় যোগাযোগ করতে পারেন। অন্যদিকে খাগড়াছড়ি আর রাঙ্গামাটি জেলায় মারমা আর ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর লোকজন প্রায় সকালে চাকমা ভাষায় ভাববিনিময় করতে পারলেও কম সংখ্যক চাকমা, মারমা পাওয়া যাবে যারা কিনা ত্রিপুরা ভাষা বুঝতে পারেন।
আবার যদি শিখতে না চাই তাতেও কোন ক্ষতি নেই। তবে, নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে গিয়ে যাতে অন্য জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সচেতনভাবে হেয় না করি সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরী। যেমন দেখা যায় মারমাদের দেখলে অনেকে বলেন “অমুক…. জালে ঝুলে”। এই “জালেঝুলে” মানে কি? বড়দের দেখাদেখি নতুন প্রজম্মরাও এমনটি করে থাকেন। তাই আবারও বলি, আসুন কিছু কিছু শব্দ শিখি। জানার চেষ্টা করি। এতে বন্ধুত্ব বাড়বেতো কমার কোন সুযোগ নেই।
মনে রাখতে হবে আগে আমরা যা চর্চা করতাম (যেটি এখনো গ্রামীণ লোকজনদের মধ্যে চর্চা ও বিশ্বাস বিদ্যমান), যা এখন হারাতে বসেছি, তা ছিল সম্পদ। ইহার মূল্য অনেক। গ্রামীণ মানুষের মাঝে আদিবাসী মূল্যবোধগুলোকে (সহযোগিতা, সহভাগিতা, ভালবাসা) শহর সমাজেও ধারণ ও লালনের মাধ্যমে ধারণাগুলোকে সর্বত্র বাড়ানো দরকার। দ্বদ্ব ও বিরোধ নিরসনে আমাদের যে সমস্ত সমন্বিত ঐতিহ্য বা ev Composite Heritage (উন্নয়ন পরামর্শক এ আর খান এর মতে, Composite Heritage বা সমন্বিত ঐতিহ্য যা আসলে বহু-সংস্কৃতির সহভাগিতায় ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক যৌথতা) রয়েছে তা ধারণের কোন বিকল্প দেখি না। আর যে সব নেতিবাচক সমন্বিত ঐতিহ্য রয়েছে তা ইতিবাচক সমন্বিত ঐতিহ্য (Positive Composite Heritage) বা সংস্কৃতিতে পরিণত করার মাধ্যমে আমাদের সুপ্ত দ্ব›দ্বসব দূর করতে পারি। আমাদের সামনে তার প্রমাণও অনেক,

বান্দরবান সদরসহ রুমা উপজেলায় যে সমস্ত দোকানদার আদিবাসী ভাষায় কথা বলতে পারেন তাদের দোকানে আদিবাসীরা জড়ো হন, বেচাবিক্রিও অন্য অনেক দোকানদারদের তুলনায় ভাল হয়ে থাকে। ত্রিপুরা অধ্যুষিত বলে পরিচিত সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নে ত্রিপুরা ভাষায় অনরগল ভাববিনিময় করতে পারতেন বলে র্দীঘ ২৫টি বছর চেয়ারম্যান ছিলেন একজন মারমা। ভাষার দক্ষতা তাকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে অনেকাংশে সাহায্য করেছে এতে কোন সন্দেহ নেই।

এই প্রাক্তন চেয়ারম্যানের মতে, পাকিস্তান আমলেও পাহাড় সমাজে একে অপরের সংস্কৃতিকে জানার চেষ্টা বর্তমানের তুলনায় অনেক ভাল ছিল। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, ডেবলছড়ি মৌজার মৃত কংহলা প্রু মগ, সিন্দুকছড়ি মৌজার মৃত মধু মঙ্গল ত্রিপুরা (কারবারি)কে নিজ পুত্রের ন্যায় স্নেহ করতেন। এবং ভূমিহীন ছিলেন বলে ৫ কানি পরিমাণ জায়গা ভাগ দিয়েছিলেন। এই প্রাক্তন চেয়ারম্যানের মতে, সেই সময়ে সম্প্রদায়গত /জাতিগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাছবিচার করা হতো না। তিনি আরো বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে বাঙালিরা নানা প্রয়োজনে (বিশেষ করে কাজের সন্ধানে) পার্বত্য চট্রগ্রামে গেলে তাদের খাওয়া দাওয়ার ভিন্নতার বিবেচনায় রান্নার জন্য সবকিছু আলাদা করে দেয়া হতো’। যা থেকে মারমা সমাজে ‘সিইড়া’ শব্দের প্রচলন বিদ্যমান (‘সিইড়া’ প্রকৃত অর্থে অন্য সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ)। পাহাড় সমাজে এমন সুন্দর সুন্দর উদাহরণ অনেক রয়েছে। সমাজে একে অপরের ভাষা জানার চেষ্টা হতে পারে আগের হারানো দিনের সৌন্দর্যগুলোকে আবার ফিরিয়ে আসার একটি সুন্দর প্রচেষ্টা। মনে রাখতে হবে, আদিবাসী মানেই বৈচিত্র্য। বৈচিত্র্যতাই আদিবাসীদের বড় শক্তি। এই বৈচিত্র্যই আদিবাসীদের একটি প্রধাণতম সমন্বিত ঐতিহ্য (Composite Heritage)। পাহাড়ে শান্তির প্রশ্নেও সকলকে বৈচিত্র্য ধারণের মাধ্যমেই শক্তি ও সংহতি খুঁজতে হবে।

►লেখক: উন্নয়নকর্মী। ইমেইল: [email protected]

আরও পড়ুন
Loading...