আলীকদমে এডিপি’র কোটি টাকার ৭৯টি উন্নয়ন কাজে নয়ছয়

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় ৭৯টি উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থবছর শেষ হলেও অনেক প্রকল্পের কাজ না করে অর্থ আত্মসাত করায় উপজেলার ৪ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বান্দরবান জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিতভাবে এ অভিযোগ করেন।
ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের লিখিত অভিযোগে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় এক কোটি ১১ লাখ টাকার ৭৯টি প্রকল্প নেয় আলীকদম উপজেলা পরিষদ। এর মধ্যে এডিপির সাধারণ খাতে ৭৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় ৫০টি প্রকল্প এবং বিশেষ খাতে ৩৮ লাখ ৩০ হাজার টাকায় ২৯টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প বাছাই, প্রস্তুতকরণ ও অনুমোদন পদ্ধতিতে মানা হয়নি ‘উপজেলা পরিষদ উন্নয়ন তহবিল নির্দেশিকা’, নেওয়া ইউপি চেয়ারম্যানদের মতামতও নেয়া হয়নি।
আলীকদম উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আবুল কালাম জানান, এডিপি প্রকল্প বাস্তবায়নে কোন ধরণের অনিয়ম দুর্নীতি হয়নি। তবে প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে কযেকটি প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে, আশা করি প্রকল্পের শতভাগ কাজ সম্পন্ন হবে।
আরো জানা গেছে, এসব প্রকল্পের কাজ শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে এরই মধ্যে সব বিল পরিশোধ করা হয়েছে। বাস্তবে দেড় মাস পরও কোনটির কাজ শুরু হয়নি, কোনটির কাজ শুরু হয়েছে মাত্র। অথচ নিয়ম অনুযায়ী সরকারি সব কাজে অ্যাকাউন্ট পে চেক বা ট্রেজারি চেক ছাড়া অর্থ লেনদেন করা অপরাধ। কিন্তু দুর্গম এলাকার অজুহাত দেখিয়ে বান্দরবানে প্রকৌশল বিভাগের স্বাক্ষর ও ট্রেজারি কর্মকর্তার অনুস্বাক্ষরযুক্ত ঠিকাদারদের বিল দেখিয়ে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তোলা হয়।
এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা প্রকৌশলী হেলালুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোরার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে না পারায় এখন কাজ করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা ব্যয়ে দরপত্রের পর বিপ্লব মাস্টারের বাড়ির পাশে আবু আহমদ সড়কে কালভার্ট নির্মাণ করার কথা। ঠিকাদার অবসরপ্রাপ্ত সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোক্তার আহমদ গত ৩০ জুন সরকারি ট্রেজারি থেকে পুরো টাকা উত্তোলন করেছেন। দেড় মাস পার হলেও এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। আলীকদম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মঞ্চ নির্মাণের জন্য সরকারি তহবিল থেকে এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে চার লাখ টাকা। শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে ৩০ জুন সম্পূর্ণ বিলও উত্তোলন করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু কাজ শুরু হয়েছে বিল তোলার দেড় মাস পর।
অন্যদিকে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আফসানা এন্টারপ্রাইজ মোমিনুল ইসলাম বলেন, কাগজপত্রে বিল পরিশোধ দেখানো হলেও টাকা ঘরে নিতে পারিনি, সরকারের টাকা সরকারের ঘরেই আছে। কাজ তুলে দেওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে বিলের টাকা উপজেলা প্রকৌশলীর নামে পে-অর্ডার আকারে জমা রাখা আছে।
চৈক্ষ্যং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে আসবাবপত্র সরবরাহ করার জন্য এক লাখ ৩১ হাজার ৩৩৫ টাকা বরাদ্দ দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু গত ৬ আগস্ট পর্যপ্ত আসবাবপত্র সরবরাহ করা হয়নি। বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক সেলিম উদ্দিন বলেন, উপজেলা পরিষদ বা ঠিকাদারের পক্ষ থেকে তাঁরা কোনো আসবাবপত্র পাননি।
আলীকদম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ল্যাপটপসহ চারটি মাল্টিমিডিয়া সিস্টেম সরবরাহ খাতে ৪ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয় ৩০ জুন। গত ৬ আগস্ট জেলা প্রশাসকের (ডিসি) পরিদর্শনকালে তড়িঘড়ি করে বিদ্যালয়টিতে একটি মাল্টিমিডিয়া সেট দেওয়া হয়েছে, অন্যগুলোর কোনো খবর নেই। উপজেলা কমপ্লেক্স ও শিশু একাডেমি সংলগ্ন আবদুল শুক্কুরের বাড়িতে একটি রিংওয়েল স্থাপন করার কথা। এ জন্য ৩০ জুন এক লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে কিন্তু কাজ শুরু হয়নি।
আলীকদম সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন বলেন, প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনা মানা হয়নি। উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্দেশনা মতে মনগড়া প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ফাঁসিয়াখালী সড়ক থেকে আনোয়ার হোসেন পাড়ায় রফিক চৌধুরীর বাড়ি পর্যন্ত ইটের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে বিল পরিশোধ করা হয় দুই লাখ ৭৪ হাজার টাকা। আনুমানিক ৫০ ফুট রাস্তার কাজ করে সব টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পায়া কার্বারীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে ইউ প্যাটার্ন ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় দুই লাখ টাকা। ৩০ জুন বিল পরিশোধ করা হয়; কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজে হাত দেননি ঠিকাদার। থানচি সড়ক থেকে ফুটের ঝিরি হয়ে মুরংপাড়ায় যাওয়ার রাস্তায় গাইড ওয়াল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় দেখানো হয় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। কোনো কাজ না হলেও কাগজপত্রে শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
নয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফোগ্য মারমা ও কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ক্রাতপং ম্রো অভিযোগ করেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া এলাকাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বরং এ দুটি ইউনিয়নের সঙ্গে উপজেলা পরিষদ বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে বলেও জানান তারা।
এদিকে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো.নায়িরুজ্জামান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। তবে শিগগির সব প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।