এমএনডিপি’র ৭৯ সদস্য : আলোর পথে ফিরে যাদের কাছে আলোয় অধরা

বান্দরবানের আলীকদমে এমএনডিপি’র সাবেক কমান্ডার মেন রুম ম্রোসহ সংগঠনটির সদস্যদের সাথে পাহাড়বার্তার নির্বাহী সম্পাদক এস বাসু দাশ।
একসময় বান্দরবানের পাহাড় জুঁড়ে ম্রো ন্যাশনাল ডিফেন্স পার্টি (এমএনডিপি) শসস্ত্র নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে জনজীবন অতিষ্ট করে তুলে। পরে সু:স্থ জীবনের প্রত্যাশায় অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংগঠনটির ৭৯সদস্য আত্মসমার্পন করলেও তাদের প্রত্যাশিত দাবী পূরন না হওয়ায় ফের তারা অন্ধকার দেখছে বলে অভিযোগ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর জেলার আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা এলাকায় ৫৮টি বন্দুক ও ২১টি কার্তুজ, দা, ছুড়ি, বর্ষাসহ অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমার্পন করে এমএনডিপি’র সদস্যরা। এসময় আত্মসমার্পন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি। এছাড়া জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা, তৎকালিন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নকিব আহম্মেদ চৌধুরী, জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
আরো জানা গেছে, প্রধান অতিথি বীর বাহাদুর এমপিসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা এমএনডিপি’র দুই সদস্যকে ২০ হাজার টাকা এবং অন্য ৭৭ সদস্যকে ১০ হাজার করে নগদ অর্থ প্রদান করে তাদের আগামীদিনেও যথাযথ সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস প্রদান করেন। কিন্তু আত্মসমার্পণের দেড় বছরেও যথাযথ সহযোগিতা পাচ্ছেনা বলে দাবী করেন সংগঠনটির নেতারা।
এমএনডিপি’র সাবেক সদস্য মাং পং ম্রো পাহাড়বার্তাকে বলেন, সু:স্থ জীবনে ফিরে ভাল লাগছে, তবে আমাদের দাবীগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমাদের মনে খুব কষ্ট, অসহায় হয়ে পড়েছি।
আত্মসমার্পনের সময় এমএনডিপি’র সদস্যরা তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় করা মামলা প্রত্যাহার, দুই একর জমি বন্দোবস্তি, ক্ষুদ্র ঋন মওকুফ, আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপনসহ উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রধিকার, নিরাপত্তা বিধান ম্রো অধ্যুষিত এলাকায় পর্যটন স্থাপনা না করা, আয়বর্ধন মূলক কর্মসংস্থানসহ ১২টি দাবী তুলে ধরেন।
আলীকদমের ৩নং কুরুকপাতা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের মেনচিং কারবারি পাড়ার বাসিন্দা এমএনডিপি’র সাবেক সদস্য মেনথক ম্রো জানান, এমএনপির ৭৯ সদস্যের মধ্যে ৩০জনকে পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে আনসারে চাকরী দেওয়া হবে বলে আশ্বস্থ করা হলেও মাত্র ৪ সদস্যকে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা রক্ষী (গার্ড) হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং ৩০টি পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে প্রদান করা হয় ৩০টি গরু।
এমএনডিপি’র সাবেক কমান্ডার মেন রুম ম্রো পাহাড়বার্তাকে বলেন, আত্মসমার্পন করলে আবাসনসহ ২ একর পাহাড়ি ভূমি বন্দোবস্থি দেবার কথা ছিলো কিন্তু দেওয়া হয়নি, কোন দাবীই পূরন হয়নি।
আলীকদমে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংগঠনটির ৭৯সদস্য আত্মসমার্পন করে। (ফাইল ছবি)
আরো জানা গেছে, ১৯৮৪ সালের দিকে জেলার আলীকদমে শান্তি বাহিনীর সাথে সংঘাত সৃষ্টি হলে আলীকদম, থানচি, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে শান্তি বাহিনীকে বিতারিত করে ম্রো সম্প্রদায়। সেই সময়ে সরকার শান্তি বাহিনীকে দমনে তাদের বিভিন্ন ভাবে সহযোগীতা করলেও ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর শান্তি চুক্তি সম্পাদন হলে শান্তি চুক্তিতে ম্রো সম্প্রদায়ের অধিকার উপেক্ষিত থেকে যায়।
আরো জানা গেছে, শান্তি চুক্তির পর ম্রো সম্প্রদায়ের বন্দোবস্তিকৃত জায়গা ও ভোগ দখলীয় জায়গা বেদখল হওয়ার কারনে ২০০৯ সালে ম্রো ন্যাশনাল ডিফেন্স পার্টি (এমএনডিপি) বা এমএনপি গঠন করা হয়। শুরুতে নীতি ও আদর্শিক দিক থাকে সংগঠনটির বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না থাকলেও সংগঠনটির শীর্ষ নেতা মেনরুম ম্রো অন্ত:কোন্দলে নিহত হলে পরে সংগঠনের সদস্যরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। পাহাড়ে শক্ত শসস্ত্র নেটওয়ার্ক তৈরী করে জেলার ৪টি উপজেলায় শুরু করে একের পর এক অপহরণ, খুন, চাঁদাবাজী।
এমএনডিপি’র সদস্যদের আত্মসমার্পনে মধ্যস্থতাকারী শিক্ষক ইংলক ম্রো পাহাড়বার্তাকে জানান, এমএনডিপিতে আর কোন গ্রুপ নেই, তারা খুব কষ্টে দিন পার করছে, তাদের জন্য সবার কিছু করা উচিত।
পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ে এমএনডিপি’র সদস্যদের আত্মসমার্পনের বিষয়টি সবচেয়ে বড় ঘটনা হওয়ায় দেশ ব্যাপি আলোচনার জন্ম দেন। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রধান ভূমিকার জন্য পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর সাধুবাদ পান।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির আলীকদম শাখার সহ সাংগঠনিক সম্পাদ্রক পারাও ম্রো পাহাড়বার্তাকে, পরিবারগুলো খুব অসহায়,তাদের জন্য সরকারের কিছু করা উচিত যাতে সুন্দর ভাবে জীবনযাপন করতে পারে।
উল্লেখ্য, জেলার রুমা,লামা, থানচি ও আলীকদমে এমএনডিপি’র বিশাল নেটওয়ার্ক থাকলেও তাদের প্রধান ঘাঁটি ছিলো আলীকদমের পোয়ামুহুরীতে। ২০১২ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এমএনডিপি’র ৩৭ জনেরও বেশি সদস্য গ্রেফতার হয়, আত্মসমর্পণ করে ৪২ জন।
এই ব্যাপারে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক পাহাড়বার্তাকে বলেন,এই ব্যাপারে কোন ওয়াদা থাকলে তা বাস্তবায়নের জন্য খবর নেওয়া হবে, ইতিমধ্যে তাদের কিছু কিছু সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

বি:দ্র: আলীকদম (বান্দরবান) থেকে ফিরে বিশেষ প্রতিবেদনটি তৈরী করেছেন,পাহাড়বার্তার নির্বাহী সম্পাদক এস বাসু দাশ।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।