কমিউনিটি ক্লিনিকের কারণে দূর্গম পাহাড়ে বাড়ছে স্বাস্থ্য সচেতনতা

কদর কমছে আদি চিকিৎসা ও উঝা-বৈদ্ধের

Bandarban-Comunity-Clinic1দূর্গম পাহাড়ী জনপদগুলোতে স্বাস্থ্য সেবায় আমূল পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে কমিউনিটি ক্লিনিক। কমিউনিটি ক্লিনিকের কারণে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে কদর কমছে আদি চিকিৎসা পদ্ধতি ও উঝা-বৈদ্ধদের।

যোগাযোগ ও সচেতনতার অভাবে আগে দূর্গম পাহাড়ী গ্রাম ও পল্লীর মানুষজন আদি চিকিৎসা সেবা, উঝা-বৈদ্ধের উপর নির্বরশীল ছিল। আর তাদের ঔষুধ হিসেবে ভরসা ছিল পাহাড়ী লতাপাতা, গাছ-পালা। গর্ভবর্তী মা, শিশু’র নানা ধরণের রোগ ও সাধারণ মানুষজনের ক্যান্সার, প্যারালাইসেস, হৃদরোগ, ডাইবেটিকস ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, যক্ষা, হাঁপানি, ডাইরিয়া, কলেরাসহ বড় বড় রোগ-বালাইগুলো থেকে মুক্তির আশায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস উঝা-বৈদ্ধের বাড়িতে বাড়িতে ধর্না দিতো তারা। রোগীরা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়লেও বিশেষজ্ঞ হিসেবে মূল ভরসা ছিল গ্রাম্য উঝা-বৈদ্ধরা।

দূর্গমাঞ্চলে এখনো অসংখ্য পাহাড়ী গ্রাম ও পল্লী রয়েছে। যেখানে জনগোষ্ঠীর লোকজনের কাছে এখনো আদি ধ্যানধারণা বৃদ্ধমান। দূর্গমাঞ্চলে এখনো কোন লোকের কোন প্রকার রোগ হলে এবং যদি সে রোগ একদিনের চেয়ে বেশি থাকলে তারা মনে করেন ভূত, পেরত, আত্মা রোগীর শরীরে শোয়ার হয়েছে বা তার উপর বিধাতা ও দেব-দেবী নারাজ হয়েছে।

এধারণায় রোগী ও পরিবারের লোকজন দৌড়াতে থাকে উঝা-বৈদ্ধের বাড়িতে। উঝা-বৈদ্ধের পরামর্শে বা বয়বৃদ্ধের আদি ধ্যন-ধারণায় খাল-নদী পূজা, পল্লী পূজা, ঘর পূজা, বট বৃক্ষ, বড় বৃক্ষ, পাহাড় পূজা, বড় পাথর পূজাসহ নানা পূজায় মগ্ন থাকেন তারা। বর্তমানে গ্রামের মধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক হওয়ায় বাড়ির কাছে দ্রুত চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ পাওয়ায় তাদের আদি ধ্যন ধারণা, আদি চিকিৎসা ও উঝা-বৈদ্ধ থেকে বিমূখ হচ্ছে এসব মানুষ। এখন সর্দ্ধি-কাশি হলেও দূর্গমাঞ্চলের এসব মানুষ পরামর্শ ও চিকিৎসা সেবার জন্য ছুটছে কমিউনিটি ক্লিনিকে।

Bandarban-Comunity-Clinic2কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে লোকজনের ভীড় লেগেই থাকে। বিশেষ করে গর্ভবর্তী মা, মা-শিশুদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা নারী ও স্থানীয় লোকজন জানান, বাড়ির কাছে অতি সহজে দ্রুত সেবা ও পরামর্শ পাচ্ছেন। এতে খুবই খুশি। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে যক্ষা, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের চিকিৎসা পাচ্ছেন। আর অন্যান্য বড়সরো রোগের জন্য পরামর্শও পাচ্ছেন।

সুয়ালকের ৩নং ওয়ার্ডের কদুখোলার বাসিন্দা আসা নুরজাহান বেগম জানান, বিগত দিনগুলোতে সন্তান, আমি বা পরিবারের কারোর সাধারণ রোগ হলেই দূশচিন্তায় থাকতাম। উঝা-বৈদ্ধের কাছে গিয়ে বসে থাকতাম। আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হতাম। এরপরে মাইলের পর মাইল পায়ে হেটে শহরের হাসপাতালে যেত হতো। এভাবে নানা হয়রানী শিকার হতাম। বর্তমানে গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিকটির কারণে বাড়ির কাছেই দ্রুত চিকিৎসা সেবা ও ঔষুধ পাচ্ছি। নিজে ও ছেলে-মেয়েদের কোন প্রকার রোগ হলেই এখন সহজেই চিকিৎসা ও পরামর্শ পাচ্ছি। ক্লিনিকের কারণে এখন চিন্তা মুক্ত। এখন ভাল আছি, সুখে আছি। এতে আমরা খুবই খুশি।

কদুখোলা কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্বাস উদ্দিন জানান, আমাদের মত দূর্গমাঞ্চলে বসবাসকারীরা এতদিন চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত ছিলাম। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে এসব অঞ্চলের কৃষক, শ্রমজীবি, অসহায় দরিদ্র মানুষগুলোকে চিকিৎসা সেবার আওতায় আনায় বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ । তিনি ক্লিনিকগুলোতে অভিজ্ঞ ডাক্তার নিয়োগ দিয়ে স্বাস্থ্য সেবার মান আরো বৃদ্ধি করার দাবী ও জানান।

কদুখোলা কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসক হ্লা নু মং মারমা জানান, ক্লিনিকে সবসময় মানুষের ভীড় থাকে। বিশেষ করে সর্দ্ধি, কাশি, জ্বরের রোগী বেশি থাকে। আমাদের সাধ্যমত এসব মানুষজনের চিকিৎসা ও ঔষুধ দিয়ে থাকি। বড় ধরনের রোগের রোগীদের সদর হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রেরণ করে দেয়া হয়।

টংকাবতী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের আলীনগর এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসক পান্ত মনি চাকমা জানান, আমরা গর্ভবর্তী মা, শিশুর, সর্দ্ধি, কাশিসহ বিভিন্ন জ্বরের রোগীদের চিকিৎসা ও ঔষুধ দিয়ে থাকি। এছাড়াও ডেলিভারী হওয়ার পর মা’দের পিএন্ডটি পরীক্ষা করা হয় এবং ঔধুষসহ মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতনতা সর্ম্পকে নানা পরামর্শ দিয়ে আসছি।

টংকাবতী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের স্বক্ষর পাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসক ভদ্রমালা তংচঙ্গ্যা জানান, এই ক্লিনিকটি ৪মাস হয় তৈরি করা হয়েছে। প্রথম প্রথম লোকজনের সংখ্যা কম থাকলেও এখন এলাকার লোকজন কোন প্রকার রোগ হলেও ক্লিনিকে সেবার জন্য চলে আসছে। আমরা লোকজনকে ভালোভাবে চিকিৎসা, ঔষুধসহ পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করছি।

এব্যাপারে বান্দরবান সিভিল সার্জন ডাঃ উদয় শংকর চাকমা জানান, বান্দরবানের সাত উপজেলায় ৭৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ক্লিনিকে প্রত্যান্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে নিয়োজিত রয়েছেন ৩জন। এরমধ্যে ১জন হেলথকেয়ার প্রোভাইডার, ১জন স্বাস্থ্য সহকারী, ১জন এফ ডাব্লিউ ক্লিনিককে শুক্রবার এবং সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন কমিউনিটি ক্লিনিকে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত উপস্থিত থাকেন।
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রজনন স্বাস্থ্য পরিচর্যার আওতায় অন্তসত্ত্বা নারীদের প্রসব-পূর্ব প্রতিষেধক টিকাদানসহ প্রসব-পরবর্তী সময়ে নবজাতকসহ মাকে ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। এসব ক্লিনিকে যক্ষা, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের সীমিত চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। এসব ক্লিনিকে ৩১ধরণের ঔষধ বিনামুল্যে বিতরণ করা হয়।

সিভিল সার্জন আরো জানান, প্রতি উপজেলায় ১টি করে সাত উপজেলায় ৭টি ডেলিভারী রুম করা হয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় গুংগুরু কমিউনিটি ক্লিনিকে ১টি, রোয়াংছড়ি উপজেলায় কচ্ছপতলী কমিউনিটি ক্লিনিকে ১টি, রুমা উপজেলায় পাগলাছড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে ১টি, থানছি উপজেলায় ঘিনিউপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে ১টি, লামা উপজেলায় দরদরি কমিউনিটি ক্লিনিকে ১টি, আলীকদম উপজেলায় নোয়াপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে ১টি, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় বড়ইতলী পাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে ১টি করে ডেলিভারী রুম রয়েছে। দিন দিন কমিউনিটি ক্লিনিকের ছাহিদা বাড়ছে সাধারণ রোগিদের আর এর ফলে গ্রাম্য উঝা-বৈদ্ধদের কদর কমছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।