কাপ্তাইয়ে বিচারের নামে কলঙ্কের তিলক : স্কুল ছাত্রী বেছে নিলেন আত্মহত্যার পথ !

সামাজিক মিথ্যাচার সইতে না পেরে নদীতে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে রাঙামাটির কাপ্তাই চন্দ্রঘোনা কে.আর.সি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করা মুন্নি আক্তার (প্রকাশ- বিবি ফাতেমা) (১৬)। শনিবার সকালে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনার কয়লার ডিপো এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। আত্মহত্যা করার আগে পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়ে একটি চিরকুটও দিয়ে যায় সে।
পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনার কয়লার ডিপো এলাকায় কে.আর.সি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাশ করা মো. কাসেমের কন্যা মুন্নি আক্তারের (প্রকাশ- বিবি ফাতেমা) সাথে সম্প্রতি বন্ধুত্ব হয় চট্টগ্রামের ইপিজেট এলাকার হাফেজ এমরান হোসেনের ছেলে মো. ফরহাদের (১৭) সাথে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই আসে ফরহাদ। ফাতেমার বাড়ির সামনে পেয়ারা গাছের নিচে দাড়িয়ে মিনিট পাঁচেক ধরে কথা বলে সে (ফরহাদ)। কিন্তু বিষয়টিকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে স্থানীয় একজন কুচক্রী মানুষ। ডেকে আনে স্থানীয় ইউপি সদস্যকেও। শুরু হয় সুতা থেকে সুতা অবিস্কারের নতুন পন্থা। এক পর্যায়ে ছেলেটিকে আটকে রাখা হয় মসজিদের এক কোনায়। ততক্ষণে এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয় নানান মিথ্যাচার।
এমন মিথ্যাচার শুনে শেষ মেষ ফাতেমা ছেলেটাকে বলে, যেহেতু এলাকার মানুষ আমার নামে এভাবে মিথ্যা বদনাম ছড়িয়েছে সেহেতু আমাকে বিয়ে করে ফেলুন কিন্তু ছেলেটি রাজি হয়নি। সে বলে, তোমার সাথে আমার সবে মাত্র পরিচয়, আমি কেন তোমাকে বিয়ে করবো? অন্যদিকে মেম্বারও থানার দোহাই দিয়ে ৫০ হাজার টাকা চেয়েছে বিষয়টি সমাধানের জন্য। কিন্তু টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় এলাকায় রটানো হয়েছে নানান কাহিনী। পরবর্তীতে সামাজিক এই মিথ্যাচার সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ফাতেমা।
শনিবার সকাল ৬টায় সময় একটি চিরকুটে আত্মহত্যার বিষয়টি উল্লেখ করে কর্ণফুলী নদীতে ঝাপ দেয় ফাতেমা। পরে কাপ্তাই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরী দল টানা ১১ঘন্টা উদ্ধার অভিযান চালানোর পর বিকাল ৪টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। কান্নাঝড়া কন্ঠে এই প্রতিনিধিকে এমন কথা বলছিলেন বিবি ফাতেমার ভাই মো. মোশাররফ হোসেন।
চন্দ্রঘোনা ইউপি সদস্য মো. আজিজুল হক (প্রকাশ- মন্ত্রী) ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও টাকা চাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তিনি জানান, আমি তাদের বলেছিলাম তারা যেনো থানায় যোগাযোগ করেন। অন্যদিকে বাড়ির সামনে স্বাভাবিক ভাবে ছেলে মেয়ে উভয়কে দেখার পরে কেন তাদের এভাবে হয়রানি করা হলো তা জানতে চাইলে তিনি এই বিষয়ে কোন মন্তব্যই করতে রাজি হননি।
কাপ্তাই থানা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নূরুল আলম জানান, বৃহস্পতিবার ঘটনার সুত্রপাত হলেও আমরা জানতে পারি শনিবার। স্থানীয়ভাবে আমাদের বিষয়টি কেউই জানায়নি।
কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশ্রাফ আহমেদ রাসেল বলেন, অবশেষে বিকেলে মরদেহটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস। সামাজিক ভাবে তাকে লজ্জিত করার বিষয়টি সম্মন্ধে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে জানিয়েছেন, এই বিষয়ে পরবর্তীতে তদন্ত করলে বিস্তারিত জানা সম্ভব।
এদিকে কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মফিজুল হক বলেন, মেয়েটিকে সামাজিক ভাবে হয়তো অপমানিত হওয়ায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
কাপ্তাই উপজেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এ.আর লিমন জানান, আমি শুক্রবার বিষয়টি জেনে ঘটনাস্থলে গেলে ছেলেটিকে মসজিদে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পাই। পরে স্থানীয়দের বলি যে একটা ছেলেকে এভাবে আটকে রাখা কোন যুক্তি নাই। সে যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিন কিন্তু কেন তাকে আটকে রেখেছেন? তবে মেয়েটি সামাজিক এই মিথ্যাচার সইতে না পেরেই সেদিন আত্মহত্যা করার বিষয়টি সকলকে জানায়, কিন্তু কেউই তো বিষয়টি গুরুত্বে সাথে নেয়নি। অবশেষে মেয়েটি আত্মহত্যা করলো।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।