কি করবো বাবা, সংসারে কষ্ট আর কষ্ট

লকডাউনের থাবায় তসলিমের এখন সব ভাসমান

লকডাউনের সময় মুদি দোকান বন্ধ হয়ে গেছে গত বছর। তখন থেকে সংসার চালাতে কর্ম বদল করে নেমে পড়েন দিন মজুরির কাজে। বয়সের টানে দুর্বল শরীরে প্রখর রোদে সয়ছে না, অবর্ণনীয় কষ্টে আছি । কষ্টের খাটনি বেশি, তারপরও ঠিকমতো ভরণ পোষণ চলছে না। অভাব অনটন লেগেই থাকে। তাই আবার কাজের ধরণ বদল করে রাস্তায় রাস্তায় গিয়ে চা বানিয়ে বিক্রি করি। এতেও ভোগান্তি দুর হয় না এখনো। বলছিলেন-মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন (৫৬)।

তসলিম উদ্দিনের বর্তমান বাড়ির ঠিকানা-রাঙ্গামাটি শহর রিজার্ভ বাজারে। লক্ষীপুর থেকে ২০০১ সালে ব্যবসা করতে রাঙ্গামাটিতে আসেন। ভাড়া নিয়ে মুদি দোকান শুরু করেন, সাথে চা-নাস্তাও বিক্রি করা হত, ব্যবসা ভালোই চলছিল। অভাব অনটন ছিল না সংসারে। সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চালাতেও কোনো সমস্যা ছিলনা তার। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রতিরোধে গত ২০২০ সালে মার্চ শেষ সপ্তাহ থেকে টানা প্রায় তিন মাস লকডাউনের বিধি নিষেধ তসলিম উদ্দিনের সুখের সংসারের সব কিছু শেষ করে দিয়েছে।

আজ রোববার (১৮ এপ্রিল) সকালে বান্দরবানের রুমার পাইন্দু ইউনিয়নের খামতাং পাড়ার অদুরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে এসব কথা হয়- এপ্রতিবেদকের সঙ্গে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৫০কোটি টাকার ব্যয়ে নির্মিয়মান রুমা-রোয়াংছড়ি সড়কে পাশে একটি গাছের তলে ভাসমান দোকান দিয়ে তসলিম উদ্দিন চা-নাস্তা বিক্রি করছিলেন। তসলিম উদ্দিন বলেন, আমার এখন সব ভাসমান, জীবনও তাই, স্থায়ী কোনো কাজ নেই। এক সময় দোকান ছিল, গত বছর (২০২০) লকডাউনে মুদি-দোকানের ভাল ব্যবসা করতে পারিনি। লকডাউনের আমার কর্জ্জ-দেনা সামলাতে গিয়ে লকডাউনের পর পরই দোকান ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি। এভাবে আমার মতো লকডাউনে অনেকে বেশি আর্থিক কষ্ট পেয়েছে বলে জানালেন তসলিম।

সে জানায় এখন দুরে কোথাও যেখানে কোনো দোকানপাট নেই, ওসব জায়গায় ঠিকাদারের কাজের এলাকায় গিয়ে চা বিক্রি করি। পাড়ার আশপাশে হলে শ্রমিকরা আমার এখানে চা-নাস্তা না করে পাড়ার দোকানে চলে যায় সবাই। তখন আমিও তাদের সাথে মাঝে মধ্যে লেবার গিরি করি। দৈনিক ৮০-১০০ টাকায় খাবার লেবার ম্যাচে সেরে নিই।

এক প্রশ্নে তসলিম জানায়, গত বছর লকডাউনের পর থেকে রাঙ্গামাটি রিজার্ভ বাজার এলাকায় মাসিক ৮০০ টাকায় ঘর ভাড়ায় থাকি। স্ত্রীসহ দুই ছেলে এক মেয়ে, ছেলে এসএসসি পাস করেছে, এবার আর পড়বে না সে। কেন- জানতে চাইলে, হাত দিয়ে চোখের জল মুছেন। বলেন, কি করবো বাবা, সংসারে কষ্ট আর কষ্ট, একথা বলে কাপে চা বানানো ভান করে মুখ ফিরিয়ে নেয়। খোলামেলায় কথাবার্তায় তসলিমের চেহারা ও মুখে দুঃখ দুর্দশা ও কষ্টের ছাপ ছিল লক্ষণীয়।

আরেক প্রশ্নে তসলিম বলেন রিজার্ভ বাজারে নিজ বাড়ি থেকে তার পরিচিত ও সাইট মাঝি রহমত উল্লাহ তাকে এখানে নিয়ে এসেছেন গত জানুয়ারী মাসে। তখন ঠিকাদার সুজনের রুমা-রোয়াংছড়ি সড়কে পিচ ঢালা চলছিল। সেখানে রাস্তায় গিয়ে টানা ৩৩দিন চা-নাস্তা বিক্রি করেছিলেন। দৈনিক খরচ বাদে তিন চারশ টাকা আয় হয়েছে তার।

সে জানায় এখন যে কাজটা চলে, সেটা রাঙ্গামটির এক ঠিকাদারের। এ রাস্তায় পিচ ঢালাই যে কয়দিন চলবে, ততদিন থাকবো। তারপর থানচি উপজেলায় সীমাসায় সেনাবাহিনীর বড় কাজ চলবে, সে রাস্তায় কোনো দোকানপাট নেই, সেখানে চা বিক্রি করতে সেখানে চলে যাওয়ার কথা জানালেন তসলিম উদ্দিন।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।