কোভিড-১৯ : মাসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার এখনই সময়

আজ বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস

ঋতুস্রাব বা মাসিক নারী জীবনের একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। নারী মাত্রই যার সঙ্গে এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। মাসিকের মাধ্যমেই একজন নারীর জন্মদানের প্রাথমিক সক্ষমতা প্রকাশ পায়। শুধুমাত্র তাই নয় মাসিকের সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িয়ে আছে নারীর সারাজীবনের প্রজনন স্বাস্থ্য। একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর মেয়েদের যোনিপথের মাধ্যমে জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আস্তরণ থেকে রক্ত এবং মিউকোসাল টিস্যু নিয়মিতভাবে তরল পদার্থ আকারে নৃঃসিত হয়, যা মেনসিস বা মাসিক নামে পরিচিত। প্রথম মাসিক বা পিরিয়ড সাধারণত ৯ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে শুরু হয়, যা মেনারকি নামে পরিচিত। তবে, পিরিয়ড মাঝে মধ্যে ৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদেরও শুরু হতে পারে। অনেকক্ষেত্রে যা সাধারণ সময় হিসেবেই বিবেচিত হয়।

মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ২০১৪ সালের বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন সার্ভে (বিএনএইচবিএস) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৩৬ শতাংশ মেয়েই প্রথম মাসিকের আগে মাসিক সম্পর্কে জানে না। এ কারণে অনেক মেয়েকেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এ ক্ষেত্রে পরিবার, বিশেষ করে মায়েদের দায়িত্ব তার কিশোরী মেয়েকে এ সম্পর্কে জানানো। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে এ ব্যাপারে সচেতন ও সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করে, সে জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আবার নারী ও কিশোরীদের একটি বড় অংশ অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করে।

কিশোরীদের মাত্র ১০ শতাংশ এবং বয়স্ক নারীদের ২৫ শতাংশ মাসিকের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন বা স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ৬ ঘণ্টা অন্তর অন্তর স্যানিটারি ন্যাপকিন পাল্টানো দরকার। তা না হলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে এবং প্রজননতন্ত্রের নানা জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। সরকার ও বেসরকাররি সংস্থার অপর একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামে মাত্র ৯ শতাংশ ও শহরে ২১ শতাংশ বিদ্যালয়গামী ছাত্রী স্বাস্থ্যসম্মত প্যাড ব্যবহার করে। আর সামগ্রিকভাবে ৮৬ শতাংশ কিশোরী ব্যবহার করে পুরোনো, অপরিচ্ছন্ন কাপড়। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর মাসিককালীন পরিচ্ছন্নতা নিয়ে এখনও সমাজে সেভাবে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে খোলামেলা আলোচনার মানসিকতা এখনো আমাদের সমাজে তৈরি হয়নি।

অস্বাস্থ্যকর মাসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলির অসহজলভ্যতা এবং দুর্বল স্যানিটেশন অবকাঠামো সমগ্র বিশ্বের নারী ও মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক অবস্থানকে বাধাগ্রস্থ করছে। ফলস্বরূপ, লক্ষ লক্ষ নারী ও মেয়েদেরকে তাদের সম্পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছানো থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে। নীরবতা ভেঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এবং মাসিকের সাথে সম্পর্কিত চারপাশের বিদ্যমান এই নেতিবাচক সামাজিক নিয়মগুলো পরিবর্তন করতে বিশ্বব্যাপী ২৮ মে বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ২০১৩ সালে জার্মানভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াশ ইউনাইটেড’ কর্তৃক এই দিবসটি পালন করা শুরু হয়েছিল।

২০১৪ সালে প্রথম উদযাপনের পর থেকে সারা বিশ্বে এই দিবসটি পালনের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০২০ সালে দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘মহামারীতে মাসিক থেমে থাকে না : কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই সময়। এ দিবসটি উপলক্ষ্যে জাতীয় এবং স্থানীয় সরকারী সংস্থা, ব্যক্তি, বেসরকারী সংস্থা এবং গণমাধ্যমের সমন্বয়ে সমন্বিতভাবে মাসিক স্বাস্থ্যের প্রতি উন্নয়নযোগ্য দিকগুলো গুরুত্বসহকারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বাড়াতে ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রচারাভিযান চালায়।

যদিও শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা কোভিড-১৯ (করোনা ভাইরাস) এ গুরুত্বর অসুস্থ্য হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় কম। তবুও যেহেতু তারা স্কুলে যেতে পারছে না, বন্ধুদের সাথে বাইরে খেলতে পারছে না বা পরিবারের বাইরে প্রিয় আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করতে পারছে না। তাই তারা মানসিকভাবে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। সেই সাথে করোনা ভাইরাসের কারণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার স্থবিরতার মধ্যে মাসিকের সময় জটিলতায় চিকিৎসা কেন্দ্রে যাওয়া ও উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সাথে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। সর্বোপরি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে স্বাস্থ্যসম্মত মাসিক ব্যবস্থাপনা। যেটি নারীর সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথেও বড় এক অন্তরায়।

আশার কথা হলো, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে সিমাভি নেদারল্যান্ডস্ ও বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস) এর সহায়তায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ১০টি স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আওয়ার লাইভস্, আওয়ার হেলথ্, আওয়ার ফিউচারস্ (আওয়ারএলএইচএফ) প্রকল্পের আওতায় ১২ হাজার কিশোরী ও যুবতী নারীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিশোরী মেয়ে ও যুবতী নারীদের মর্যাদাপূর্ণ, বৈষম্যহীন এবং সহিংসতামুক্ত জীবন গঠনে সহায়তা করা, তাদেরকে ক্ষমতায়িত করা এবং মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কিশোরী ও নারীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৯ সাল থেকে কাজ করছে প্রকল্পটি।

মাসিকের মত একটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক বিষয় নিয়েও লজ্জা আর সংকোচের শেষ নেই বাংলাদেশের সমাজে। এ ব্যাপারে সচেতন ও সংবেদনশীল ভূমিকা ছাড়া প্রত্যাশিত পরিরবর্তন অসম্ভব। সরকারি উদ্যোগ, সহায়তা ও সমর্থন ছাড়া এ পরিস্থিতি বদলানো খুব কঠিন। আমরা আশা করি সরকার, বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যমের সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমে পরিবর্তন হবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অচলাবস্থার।

সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশিক্ষক।
ই-মেইল [email protected]

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। পাহাড়বার্তার -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য পাহাড়বার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আরও পড়ুন
Loading...