খরচের ভয়ে সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলে মধ্যবিত্ত

বর্তমানে মধ্যবিত্তের সব ব্যয় নির্বাহ করে সমাজে টিকে থাকার মতো অবস্থা নেই বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম। কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, মধ্যবিত্তের জীবনধারণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে সামাজিকতাও রক্ষা করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তারা খরচের ভয়ে সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলে।

বর্তমান সমাজে মধ্যবিত্তের ভদ্রভাবে বেঁচে থাকার অবস্থা আছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে নেহাল করিম বলেন, ‘বর্তমানে মধ্যবিত্তের সব ব্যয় নির্বাহ করে সমাজে টিকে থাকার মতো অবস্থা নেই। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে পারে না। কারণ একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে হলে সেখানে কিছু উপহার দিতে হয়। পরিবার নিয়ে সেখানে যাতায়াত বাবদ আরো কিছু খরচ করতে হয়। এই খরচটা সে নির্বাহ করতে পারে না, ফলে ধীরে ধীরে সামাজিক অনুষ্ঠানে যাতায়াত কমে যাচ্ছে। ’

নেহাল করিম আরো বলেন, ‘মধ্যম আয়ের দেশ ধারণা ভিত্তিহীন। আবার সরকারের পক্ষ থেকে যে মাথাপিছু আয়ের কথা বলা হয় এগুলো সব ভুল কথা। একজনের আয় ১৯ লাখ আর আরেকজনের এক লাখ মিলিয়ে যদি বলি দুজনের মাথাপিছু আয় ১০ লাখ তাহলে তো আর সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে না। গাড়ির ট্যাক্স কমানো হয়েছে এতে সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হবে না। কারণ গ্রামের একজন কৃষক কখনো গাড়ি কিনতে পারবে না। বর্তমানে এই যে বলা হচ্ছে দেশ ডিজিটাল হচ্ছে, ফ্লাইওভার, সেতু তৈরি হচ্ছে—এগুলো সব ভুল কথাবার্তা। এসব বিষয়গুলোকে জটিল করে ফেলেছে। এসবে দেশের সাধারণ জনগণের কোনো উপকার হবে না। মধ্যবিত্ত বা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে হলে দরকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যাপক হারে বিদ্যুতায়ন, কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধি। যদি এসব করা সম্ভব হয় তাহলে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান বাড়বে। সাধারণ মানুষের উপকার হবে। ’

মধ্যবিত্তদের জন্য আইন কতটুকু সহায়ক—এমন প্রশ্নের উত্তরে নেহাল করিম বলেন, ‘আমাদের দেশে আইন-কানুন বিশেষ ব্যক্তির জন্য। মধ্যবিত্ত বা সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের আইনি ঝামেলায় যেতে চায় না, কারণ আমাদের দেশে আইনি সহায়তা পাওয়া একটা অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। সহায়তার জন্য গেলে উল্টো তাদেরকে নানা ধরনের হয়রানির স্বীকার হতে হয়। এই ভয়ে কারো সঙ্গে কোনো অন্যায় হলেও তারা সব সহ্য করে নেয়। ’ নেহাল করিম বলেন, ‘বর্তমানে ঐশীকে নিয়ে অনেক হইচই হচ্ছে, কিন্তু এই দেশেই তনু, ত্বকী, সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে কোনো কথা শোনা যায় না। এ দেশে বিশেষ বিশেষ লোক সুবিধা পেয়ে থাকে। এই যে আপন জুয়েলার্সের দোকান তল্লাশি চালানো হলো, এটাও একটা বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে। কারণ বাংলাদেশে কোনো জুয়েলার্সই সাধু নয়, তবে কেন শুধু আপন জুয়েলার্সকে পথে বসানো হবে। সব জুয়েলার্সেই তাহলে তল্লাশি চালানো দরকার। আসলে এই দেশ হলো ধনী ও লুটেরাদের দেশ। সবাই নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে আইন ব্যবহার করছে। ’

রাজনীতিবিদরা মধ্যবিত্তদের কেমন চোখে দেখে?—নেহাল করিম বলেন, ‘আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা মধ্যবিত্তদের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করে। বর্তমানে কোনো আদর্শ রাজনীতিবিদ নেই, যাকে অনুসরণ করা যায়। সব রাজনীতিবিদই মধ্যবিত্তদের জিম্মি করে রাজনীতি করে তাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। ’

মধ্যবিত্তদের জন্য বাজেট কতটুকু সহায়ক?—এমন প্রশ্নের জবাবে নেহাল করিম বলেন, ‘বাজেট মধ্যবিত্তের জন্য করা হয়নি। এটা উচ্চবিত্তদের সহায়ক বাজেট। এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে। মধ্যবিত্তদের ওপর ভ্যাটের বোঝা চাপানো হয়েছে। প্রতিবছর বাজেটের পরিমাণ বেড়েই যাচ্ছে, কিন্তু মধ্যবিত্তদের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। সবাই মুখ বুঝে সহ্য করছে। ’

মধ্যবিত্তদের বর্তমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? নেহাল করিম বলেন, ‘সব মিলিয়ে বর্তমানে মধ্যবিত্তের অবস্থা খুবই নাজুক। এই শ্রেণির মানুষ পেটে-ভাতে টিকে আছে। তবে এ অবস্থা থেকে বের হয়ে টিকে থাকতে হলে সমাজে পরিবর্তন প্রয়োজন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার দেশের কোনো অবস্থাতেই প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। আর এসব বিষয় তখনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যখন দেশে একজন চরিত্রবান শাসক আসবে। ’ সূত্র: কালেরকণ্ঠ

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।