খালেদার বিএনপিতে উপেক্ষিত জিয়ার আদর্শ

Banp১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাত ধরে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে এখন তারই দেখানো পথ উপেক্ষা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর লগ্নেও দলীয় ও সাংগঠনিক কাঠামোয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি থিতু হতে পারেনি। দলীয় চেয়ারম্যানের ওপর ন্যস্ত রয়েছে সাংগঠনিক সব সিদ্ধান্তের অধিকার। পাশাপাশি দলীয় নেতৃত্ব ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্ধারণে নির্বাচনের কোনও বালাই নেই। তবে দায়িত্বশীল সিনিয়র নেতারা বলছেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে এসেছে। একধারে ক্ষমতাসীন, বিরোধী দল এমনকি সংসদ নির্বাচনের বাইরে থেকেও রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছে।
সম্প্রতি বিএনপির নির্বাহী কমিটি গঠন, স্থায়ী কমিটি ও উপদেষ্টা কাউন্সিল মনোনয়ন এবং বিভিন্ন জেলা কমিটির নাম ঢাকা থেকে ঘোষণার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের নির্বাচনি আদর্শকে মানা হয়নি। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দেশে গণতন্ত্র নেই বলে সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়, সেটি স্বয়ং বিএনপির বিরুদ্ধেও করা যায় অনায়াসেই।
নতুন নির্বাচিত একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপিতেই গণতন্ত্র অবরুদ্ধ। বিগত কয়েক বছরে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করতে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ সংকট ছিল প্রচণ্ড। দলের কোনও স্তরের কমিটিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা ছিল না। স্থায়ী কমিটির একজন প্রবীণ সদস্য মনে করেন, জিয়াউর রহমান তার শাসনামলে যিনি মন্ত্রী হতেন তাকে দলে পদ দেননি।আবার যিনি দলে পদ পেয়েছেন তাকে মন্ত্রিত্ব না দেওয়া, সংসদ সদস্যকে বড় পদ না দেওয়াসহ নানান সুষ্ঠু প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন।
যেমন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী মহাসচিব পদ গ্রহণ করায় মন্ত্রীত্ব বঞ্চিত হয়েছিলেন। আজকের দিনে এটি কল্পনাও করা যায় না।
বিএনপির নতুন কমিটির আরেক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, সম্মেলন ছাড়া কমিটি করার চল জিয়াউর রহমানের সময় ছিল না। রাতের অন্ধকারে কমিটি দেওয়া হয় কী ছাত্রদলে, কী যুবদলে। সবখানে ইচ্ছাকৃত কোন্দল তৈরি করা হয়। বিএনপির এই নেতার প্রশ্ন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির শ্রমিক সংগঠন, ছাত্রদল, যুবদলসহ সবগুলো সংগঠন সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে কাজ করতে সক্ষম হয়েছে কিনা এই প্রশ্ন করার সময় এসেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘নানা কারণে সম্মেলন বা সমাবেশ করে কমিটি ঘোষণা সম্ভব হয় না। এটা বাস্তব। আগামীতেও হবে। বিগত দিনেও এই চর্চা ছিল। কিন্তু বিএনপির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তিনটি। একটি হচ্ছে, গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সফলতা অর্জন করেছে। এই সফলতার কাছে এগুলো কোনও বড় বাধা নয়। দুই. বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত শক্তি। তিন. জিয়াউর রহমানের যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, এখন তো সব দলই এই পথেই আছে। দেশে-বিদেশে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে অবস্থান সমুন্নত করেছে বিএনপি।’ সাবেক এই স্পিকার আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা, সেটি আওয়ামী লীগ যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক, দেশবাসী কিন্তু জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দলটির অকুণ্ঠ অবস্থান, এ সম্পর্কে অবগত।’
এ ব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘তার দল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। এই দলটি ৫ বার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়েছে বিএনপির হাত ধরে। মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেছে বিএনপি। আজকে যে দেশের সুন্দর অর্থনীতি এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব বিএনপির। এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও গণতন্ত্রের যে লড়াই, সেটি চালিয়ে যাবে বলেই অঙ্গীকার করবে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিএনপির নেতা, কেন্দ্রীয় ভাইস-চেয়ারম্যান হারুন আল রশিদ মনে করেন, ‘বিএনপিতে যেটুকু গণতন্ত্র চর্চা থাকার কথা সেটির উপস্থিতি শতভাগ না থাকলেও বেশিরভাগ আছে। তবে বিগত ৮ বছর ধরে সরকারের কঠোর আচরণের মুখে পড়ে স্বাভাবিক সাংগঠনিক চর্চা ব্যাহত হয়েছে। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক আচরণ সরকার বিএনপির সঙ্গে করেনি।’
ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘দেশে গণতন্ত্রের যে পরিস্থিতি; খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা, লাখ লাখ নেতাকর্মী আটক হচ্ছেন-বের হচ্ছেন। একটা নির্মম পরিস্থিতি দিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। আর দেশে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, মৌলিক অধিকারবঞ্চিত মানুষ, এসব পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেটি নির্ধারণই হবে এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কাজ।’
ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এজমল হোসেন পাইলট মনে করেন, ‘বিএনপির এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে, সংগঠন গোছানো।’
বিএনপির ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, দল প্রতিষ্ঠার আগে ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান তার ‘সামরিক শাসন’কে ‘বেসামরিক’ করার উদ্দেশ্যে শুরু করেন ১৯ দফা কর্মসূচি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টায় রমনা রেস্তোরাঁয় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র যাত্রা শুরু করেন। সংবাদ সম্মেলনে নতুন দলের আহ্বায়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রথমে ১৮ জন সদস্যের নাম ঘোষণা করেন। পরে সেবছরের ১৯ সেপ্টেম্বর ওই ১৮ জনসহ ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। যদিও, বিএনপি গঠন করার আগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে আরেকটি দল তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সভাপতি করে গঠিত হয়েছিল। ২৮ আগস্ট ১৯৭৮ সালে নতুন দল গঠন করার লক্ষ্যে জাগদলের বর্ধিত সভায় ওই দলটি বিলুপ্ত ঘোষণা হয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি আগামী বৃহস্পতিবার বিকালে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। খবর-বাংলাট্রিবিউন এর।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।