চতুর্থ শিল্প বিপ্লব : আমরা কোথায় !

বুদ্ধজ্যোতি চাকমা
দুনিয়ার হালহকিকতের যারা ন্যুনতম খরব রাখেন, বিশ্ব গ্রামে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন-বর্তমান সময়ে তাঁদের কাছে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হচ্ছে ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’। একইসঙ্গে তাঁদের এ বিপ্লবে শামিল হওয়ারও রুদ্ধশ্বাস প্রয়াস। হবেই না কেন? বিপ্লব মানে পরিবর্তন। পুরাতন ভেঙে নতুনের আবাহন। শামিল হতে না পারলেই চাপিয়ে যাবে। হয় বিপ্লবকে গ্রহন করুন, না হলে বিপ্লব আপনাকে গ্রাস করবে। বৈপ্লবিক পরিবর্তনের গর্ভে আপনি হারিয়ে যাবেন।
কী সেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ? ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, বিশুদ্ধভাবে আমি নিজেও জানি না। কী তার চরিত্র, কি রকম বৈশিষ্ঠ্য। এর সময়ের সন্ধিক্ষণের অস্থিরতা কোথায় গিয়ে থিতু হবে-সেই ঠিকানাও অনিশ্চিত। শুধু বলা হচ্ছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব-দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের ভিত্তির ওপর দাড়িয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তি জ্ঞান-নির্ভর একটি উৎপাদন সংস্কৃতি। সেখানে শ্রমিকের কায়িক শ্রম কোনো কাজে আসবে না। ডিজিটাল প্রযুক্তি জ্ঞানের উৎকর্ষে যোগ্যদের মস্তিস্কই হবে শ্রমিক।
সবার জানা,ইউরোপে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝিতে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছে। উপনিবেশিক লুটপাটে এক শ্রেণি ইউরোপিয়ের পূঁজির জোগান ও শিল্পের কাঁচামালের মজুত বেড়ে যায়। জোগান পুঁজিতে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। মজুত কাঁচামাল রূপান্তর হয় শিল্পপণ্যে। উপনিবেশগুলোতে বাজারজাত করা হয় শিল্পপণ্য।পূঞ্জীভূত সম্পদে আরো সম্পদ বাড়াতে শিল্পকারখানা, আরো আরো বাজার ও সম্পদের জন্য আরো আরো উপনিবেশ-সংক্ষেপে এ হলো শিল্প বিপ্লব।
শিল্প বিপ্লবের সময়কাল নির্ধারণকারিদের মতে,১৭৮৪ সালে বাস্পীয় ইঞ্জিন (স্টীম ইঞ্জিন) আবিস্কারে পানি ও বাস্পের শক্তি ব্যবহার শুরু হয়। এতে শিল্পের উৎপাদন ও পণ্যের বিপণন সরবরাহে নতুন মাত্রা যোগ করে। এর প্রায় একশত বছরে ১৮৭০ সালে বিদ্যুতের আবিস্কার হয়। জগত হয়ে ওঠে আলোকিত। বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা বহুমুখি করে দেয়। ১৭৮৪ থেকে ১৮৭০ সালের সময় হচ্ছে প্রথম শিল্প বিপ্লব। আর ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট এসে আবিস্কার হয় নতুন আরেক বিশ্ব। আলোকিত বিশ্ব থেকে নতুন আবিস্কৃত বিশ্ব-এ একশত বছর(১৮৭০-১৯৬৯) দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব। ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট সমগ্র বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার পর শুরু তৃতীয় শিল্প বিপ্লব। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিপ্লবের প্রযুক্তিগত বহুমাত্রিক উৎকর্ষের ভিন্নতর পরিবর্তনই আজকের চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। এতে বস্তু, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও প্রাণ বা জীব জগতের মধ্যে সম্পর্কের দুরত্ব বায়বীয় হয়ে ওঠেছে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে প্রযুক্তি মানুষের কাজ করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজের ক্ষেত্রে মানবিক ভূল শুধরে দেবে। রোবোটিক্স, ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং, ইন্টারনেট অব থিংস, জৈব প্রযুক্তি, জিন প্রকৌশল, ন্যানো প্রযুক্তি, বস্তু বিজ্ঞান ও শক্তি সঞ্চয় বা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং মানবিক শ্রমের জায়গা দখল করে নেবে। পিআই ল্যাব বাংলাদেশ লিমিটেড চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বেশ কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেছে।

১. অনলাইনে একটি মগের বিজ্ঞাপণ। মগে কফি, চিনি দিলে এমনিতেই মিশে যাবে। বেঁচে যাচ্ছে চামচ, মিক্সার কেনার খরচ ও সময়। এটিই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব।
২. ইন্টার অব থিংস আপনার চিন্তার সব দায়িত্ব নেবে। আপনার বাসার আসবাব, ফ্রিজসহ স্মার্টফোনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। স্মার্টফোন বলে দেবে আসবাব কখন রং দেওয়ার সময়, ফ্রিজে মাছ, মাংস ও সবজি নেই, বিদ্যুতের বিল কখন ও কত টাকা দিকে হবে-এসব আর আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।
৩. রোবোটিক্স গার্ড আপনার বাসায় নিখুঁত ভাবে নিরাপত্তা দেবে। মানব নিরাপত্তা প্রহরির ক্লান্তি আসা, ঘুমিয়ে পড়া, গাফলতি ও অসাবধানতার কোনো সমস্যা হবে না।
৪. সমস্ত শিল্প কারখানা স্বয়ংক্রিয় চালনা বা অটোমেশন পদ্ধতিতে চলবে। সেখানে উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্ববধান সবকিছু নিজে নিজে হয়ে যাবে।
৫. সাইবার বাজারের নিয়ন্ত্রণে যাবে সমস্ত বিপণন ব্যবস্থা। বিপণিকেন্দ্র, কারখানা, সেবা বিপণন-সবকিছু চলে যাবে কতিপয়ের হাতে। সেই কতিপয়রা নির্ভরশীল হবে সাইবার বাজারিদের কাছে। যেমন-পরিবহন সেবা বিপণনকারি “উবার”। উবারের একটি যানবাহনও নেই। কিন্তু সমস্ত সেবা বিপণন দখল করছে তারা। এ রকম বহু উদারহরণ দেওয়া যায়।

►পার্বত্য অঞ্চলে সাবইবার বাজারের সম্ভাবনা:
তিন পার্বত্য জেলায় পর্যটন খাতে উবারের মতো একটি প্রতিষ্ঠান হতে পারে। সমস্ত পর্যটন আবাসন, পরিবহন, পথ-প্রদর্শক (গাইড) ও রেষ্টুরেন্ট খাত একিভূত করে উদ্যোক্তা ও পর্যটকদের কাছে সেবা বিপণন করা সম্ভব। উৎপাদিত ফলের ক্ষেত্রেও একইভাবে করা যায়। এ ছাড়া আরো অনেক খাতে বিপণন বাজারে সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পর্যটন ও ফলের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হবে। এভাবেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে অংশিদার হওয়ার সুযোগ আহরণের দরজা খুলে ঢুকতে হবে।

►চতুর্থ বিপ্লবে সংকট এবং আমরা কোথায়:
চতুর্থ বিপ্লবে প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষে শাসন-প্রশাসন ও উৎপাদন ব্যবস্থা এবং মানুষের মনন কাঠামো ও সামাজিক সম্পর্ক ও মূল্যবোধ বদলে যেতে পারে। মানুষ ভোরে বিশ্বের খবর জেনে নেয়। কিন্তু পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশিকে চেনে না। অথবা খবর নেওয়ার প্রয়োজনবোধও করে না। এটি হচ্ছে- ডিজিটাল সংস্কৃতি।
বিশ্বের সমস্ত সম্পদ, উৎপাদন ও বাজার কতিপয়ের দখলে যাবে। সংকোচিত হবে কর্মসংস্থান। সম্পদ, আয় বৈষম্য ও বেকারত্ব বেড়ে বহুমাত্রিক সংকট ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বান্দরবান তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সময়ে পিছিয়ে পড়া মানুষ এসব মোকাবেলায় প্রস্তুত বলা মুস্কিল। মোকাবেলা করতে দরকার শিক্ষা। পরিমাণগত শিক্ষা নয়, গুণগত ও প্রযুক্তি জ্ঞানের শিক্ষা। গুণগত শিক্ষার জন্য দরকার গুণগত উন্নয়ন বা টেকসই উন্নয়ন। যে উন্নয়ন প্রাকৃতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশও প্রতিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত নয়, সুরক্ষা করে। ক্ষমতাহীন মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সুদৃঢ় হবে। যা শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও নিরাপদ।
শুধুমাত্র টিকে থাকার প্রশ্ন যেখানে জড়িত, সেখানে টেকসই আর্থ-সামাজিক বিকাশের সুযোগ নেই। শিক্ষাকেন্দ্রিক টেকসই বা গুণগত উন্নয়নে নিরাপদ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে মানুষও টেকসই বিকাশে উদ্যোগি হবে। টেকসই বিকাশ মানে গুণগতমানসম্পন্ন শিক্ষা, স্থায়ীত্বশীল উদ্যোগ। গুণগত শিক্ষা তথ্য-মহাসড়ক হয়ে মানুষকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে সংযুক্ত করবে। এখন দরকার প্রচলিত পরিমাণগত উন্নয়নকে গুণগত বা টেকসই উন্নয়নে রূপান্তর। সেখানেই আমাদের ভবিষ্যত ঠিকানা খুঁজে পাবো।

আরও পড়ুন
Loading...