চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি মহাশ্মশানে পরিণত হয়েছে : সন্তু লারমা

অস্থায়ী শহীদ মিনার ও এম এন লারমার প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করছে জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা
সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন চায় না, তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করতে চায়। সেজন্য আজ জুম্ম জনগণের জীবন এক নিরাপত্তাহীন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় বিরাজ করছে। পার্বত্য চুক্তির পর ২০ বছর অতিক্রান্ত হলেও চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ একটি মহা শ্মশানে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির রাঙামাটি জেলা কমিটির উদ্যোগে জুম্ম জনগণের মহান নেতা জাতীয় সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী ও শোক দিবস উপলক্ষ্যে শুক্রবার রাঙামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এক স্মরণ সভায় এসব কথা বলেন জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা।
‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী সকল কার্যক্রম প্রতিরোধ করুন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে অধিকতর আন্দোলন সংগঠিত করুন’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির রাঙামাটি জেলা কমিটির উদ্যোগে জুম্ম জনগণের মহান নেতা জাতীয় সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী ও শোক দিবস উপলক্ষ্যে শুক্রবার রাঙামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এক স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়।
জনসংহতি সমিতির রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি সুবর্ণ চাকমার সভাপতিত্বে স্মরণ সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান, জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গৌতম কুমার চাকমা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, জনসংহতি সমিতির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক কল্পনা চাকমা, বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী রঞ্জিত দেওয়ান।
স্মরন সভায় জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষর চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বলেন, ১০ই নভেম্বর ’৮৩-তে এমএন লারমাসহ অনেককে নৃশংস হত্যা ছিল একটি রাজনৈতিক হত্যাকান্ড। এই হত্যাকান্ডের পেছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র জড়িত ছিল। জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে ধ্বংস করার হীন উদ্দেশ্যে বিভেদপন্থী চার কুচক্রী দ্বারা সেই হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল। মহান নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চেয়েছিল সেই কুচক্রী মহল। সেই বিভেদপন্থী, সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এখনো সক্রিয় রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য তারা বর্তমানে উঠে পড়ে রয়েছে। সেজন্যই আজকে স্মরনসভায় বক্তাদের বক্তব্যে সেসব সুবিধাবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সতর্ক হওয়ার ও তাদের প্রতিরোধ করার হওয়ার কথা উঠে এসেছে। জুম্ম সমাজে যারা সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল, সরকার-শাসকগোষ্ঠীর লেজুড় হয়ে নিজেদের স্বার্থ পরিপূরণে সবসময় যারা সচেষ্ট রয়েছে তাদের সম্পর্কে আজকের স্মরণসভা আমাদেরকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে তাদের ব্যাপারে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে, আরও সংগ্রামী হতে হবে।
সন্তু লারমা আরো বলেন, আজকে যারা এই লড়াই-সংগ্রামকে গলা টিপে হত্যা করতে চাচ্ছেন এবং আমাদের জুম্ম সমাজের সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল যারা রয়েছে তাদের প্রতিরোধ ও প্রতিবিধান করা সবচেয়ে জরুরী হয়ে পড়েছে বলে আমি মনে করি। আজকে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদন করেছে। কিন্তু সেই চুক্তি বাস্তবায়িত হতে পারছে না এবং সরকার বাস্তবায়ন করছে না। এখানে ষোলো আনা সরকারের অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। বাংলাদেশ জন্মলাভ করেছে ৪৬ বছর হয়েছে। আজকে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমাদের নিরাপত্তাহীন, অনিশ্চিত জীবন নিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। এ জীবন আমরা মেনে নিতে চাই না এবং আমরা মেনে নিতে প্রস্তুত নই।
এদিকে,স্মরণ সভার পূর্বে সকাল ৮টায় রাজবাড়িস্থ জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে প্রভাতফেরি শুরু হয়ে প্রভাতফেরিটি শহরের বনরূপা প্রদক্ষিণ করে শিল্পকলা একাডেমিতে এসে শেষ হয়। এরপর শুরু হয় অস্থায়ী শহীদ মিনার ও এম এন লারমার প্রতিকৃতিতে সারিবদ্ধভাবে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গের পুষ্পমাল্য অর্পণ। পুষ্পমাল্য শেষে শুরু হয় স্মরণ সভা।
জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গৌতম কুমার চাকমা বলেন, এম এন লারমা ছিলেন মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি ক্ষমতা গুণ, শিক্ষা গ্রহণের গুণ, পরিবর্তন হওয়ার গুণ-এর কথা বলেছিলেন।
এছাড়া এম এন লারমা মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী লেখক ফোরামের উদ্যোগে বিকাল ৪টায় আয়োজন করা হয় কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান। পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী লেখক ফোরামের সভাপতি শিশির চাকমার স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে প্রায় ৩০ জন কবি কবিতা পাঠ করেন।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।