জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ী নারী

বান্দরবান শহরের মারমা বাজারে তরি-তরকারি বিক্রি করতে আসা এক আদিবাসী নারী
পাহাড়ের নারীদের জীবন যুদ্ধের কথা যেন না বললেই নয়। কিভাবে দিনের পর দিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে একের পর এক দূর্গম পাহাড় ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে চলে পাহাড়ের নারীরা, একটু স্বপ্ন দেখে স্বপ্নের পাহাড়ের চূড়ায় যেন আরোহনের। আর এই ধরণের কয়েক নারীর পথচলার কথা তুলে ধরেছেন পাহাড় বার্তার প্রতিবেদক কিকিউ মার্মা।
পাহাড়ের বিশেষ করে পাহাড়ী নারীরা কঠোর পরিশ্রমী ও সাহসী বলে সবাই জানে। পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন হাট-বাজারে শত শত পাহাড়ী নারীদের দেখা যায় পুরুষের পাশাপাশি তারাও বিভিন্ন পন্যসামগ্রী বিক্রি করে। সমতলের তুলনায় এই অঞ্চলের পাহাড়ী নারীরা একধাপ এগিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবানে রবিবার এবং বুধবার দুইদিন হাট-বাজার হয়ে থাকে। জীবন সংগ্রামে এই পাহাড়ী নারীরা জেলা শহরের মধ্যম পাড়া মারমা বাজারে বিভিন্ন শাকসবজি, পাহাড়ী ফলমূল, জ্বালানি কাঠ ইত্যাদি বিক্রি করতে এসে থাকে। তাঁরা তেমন কোন শিক্ষিত নয়। তাঁদের অনেকে তেমন করে শুদ্ধ বাংলাভাষা বলতে পারে না। অনেকেই কোন রকম চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ভাষা বলতে পারে, তারপরও তারা দিব্যি ক্ষুদ্র ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, আর আয় থেকে পুরুষদের পাশাপাশি পরিবারের ভরনপোষনের সহযোগী হয় আদিবাসী নারীরা।
বান্দরবান শহরের মারমা বাজারে এমনই কিছু তরি-তরকারি বিক্রি করতে আসা এক পাহাড়ী নারীর মানুসিং মার্মা (৫২) সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১০বছর আগে তার স্বামী না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তাঁর এক ছেলে দুই মেয়ে, দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ছেলেটা ঢাকা নটরডেম কলেজ থেকে এবছর এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছেলে মেয়েদের কথা চিন্তা করে তিনি আর দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি। তিনি পাহাড়বার্তাকে আরো বলেন “আমার যতই কষ্ট হোক এই ছোট ছেলেটাকে মানুষের মত মানুষ হতে হবে। যেহেতু আমার কোন লেখাপড়ার করার
বান্দরবান শহরের মারমা বাজারে তরি-তরকারি
নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে আছে দুই আদিবাসী নারী
তিনি আরো বলেন, আমি রোজ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে এই মারমা বাজারে ফুটপাতে শাকসবজি নিয়ে বসে পড়ি। হাট-বাজার ছাড়া অন্যান্য দিনে তেমন বিক্রি হয় না। কোন রকমে খেয়ে বেঁচে মাস শেষের দিকে ছোট ছেলেটার লেখাপড়ার খরচের জন্য টাকা পাঠাতাম আমি।
মানুসিং-এর পাশে বসা আরেক নারীর সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, তার জন্মস্থান বান্দরবান রুমা উপজেলার দুর্গম এলাকা হাংবখ্যইং পাড়া। বর্তমানে মধ্যম পাড়ার এক ভাড়া বাসায় থাকেন। তার স্বামী পোস্টঅফিসে পিয়নের কাজ করেন। তার এক মেয়ে তিন ছেলে। বড় মেয়েটি বান্দরবান সরকারী কলেজে ডিগ্রীতে অধ্যায়নরত। সংসারের হাল ধরতে এবং ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ যোগান দিতে তাঁর স্বামী হিমশিম খাচ্ছে। সেইসব চিন্তা করে এক বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথমে ঋণ গ্রহণ করেন। সেই অর্থ দিয়ে হাট-বাজার দিনে বিভিন্ন ধরণের কাঁচা শাকসবজি ক্রয় করে বাসায় মজুদ রাখি।
তিনি আরো বলেন, রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাসায় কাজ সেরে মধ্যম পাড়া মারমা বাজার ফুটপাতে সকাল থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বিক্রি করি।
এছাড়াও বিভিন্ন গ্রাম থেকে বিক্রি করতে ম্রাখাইনু, অংমেচিং, মেসাইচিং-এর মত অনেকে বলেন, বিশেষ করে তারা কিন্তু হাট-বাজার ছাড়া অন্যদিনে তেমন করে আসে না। সেই মধ্যমপাড়া মারমা বাজারের ফুটপাতে বসার জন্য জায়গা নিয়ে এক ধরণের প্রতিযোগিতা চলে। সবাই চায় মেইন রোডে বিক্রি করতে, কারণ কেনাবেচা যাতে ভালোভাবে হয়। দূর-দূরান্ত এলাকা থেকে অনেকে আবার সেই মধ্যরাতের চলে এসে কোন রকমে মানুষের দোকানের সামনে রাত কেটে যায়। তাদের কেউ কেউ নিজস্ব বাগান থেকে শাকসবজি নিয়ে এই হাট-বাজারে বসে। আবার অনেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিভিন্ন ধরণের কাঁচা শাকসবজি সংগ্রহ করে এই বাজারে বসে। বাজারে সেই সবজি বিক্রি করার পর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করে সন্ধ্যার দিকে বাসায় (গ্রামে) ফিরে যায়।
এভাবেই পাহাড়ের বুকে টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে এসব নারীরা। এমনই হাজার হাজার পাহাড়ী নারী আছে যারা জীবনের সকল কঠিন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আগেও চলেছে, এখনও চলছে। আর একটু স্বপ্নের জাল বুনে, কখন আসবে আর্থিক স্বচ্ছলতা, কখন সন্তানগুলো উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাড়িয়ে একটু সংসারের হাল ধরবে।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।