তীব্র খাদ্য সংকটে থাকে বান্দরবানসহ ৩ জেলা, মাঝারি সংকটে রাঙামাটি, খাগড়াছড়িসহ ১১ জেলা

%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9cখাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে দেশ। তা সত্ত্বেও খাদ্য সংকটে রয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ। দুই দফায় দেশের ২৮টি জেলার তথ্য বিশ্লেষণ করে ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) দেখিয়েছে, তীব্র খাদ্য সংকটে থাকা জেলা রয়েছে বান্দরবানসহ তিনটি। আর মাঝারি মাত্রার খাদ্য সংকটে রয়েছে রাঙামাটি,খাগড়াছড়িসহ ১১টি জেলা।
আইপিসি একটি প্রটোকল, যাদের অন্যতম কাজ দীর্ঘমেয়াদি ও চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শ্রেণিবিভাজন করা। প্রথম দফায় ২০১৪ সালে ১৮টি জেলার তথ্য বিশ্লেষণ করে আইপিসি। প্রথম দফার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে কুড়িগ্রাম জেলা। আর মাঝারি মাত্রায় খাদ্য সংকটে থাকা জেলার সংখ্যা সাতটি। দ্বিতীয় দফায় তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় ২০১৫ সালের নভেম্বরে। এ দফায় ১০টি জেলায় সমীক্ষা চালিয়ে দুটি জেলা সুনামগঞ্জ ও বান্দরবানে তীব্র খাদ্য সংকট থাকার তথ্য পায় আইপিসি। মাঝারি মাত্রায় খাদ্য সংকটে থাকার তথ্য পাওয়া যায় চারটি জেলার।
তীব্র খাদ্য সংকট বোঝানো হয়েছে লেভেল-৪-এর মাধ্যমে। মাঝারি মাত্রার খাদ্য সংকট বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে লেভেল-৩। দুই দফা তথ্য বিশ্লেষণ করে আইপিসি দেখিয়েছে, তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ ও বান্দরবান জেলা। আর মাঝারি মাত্রায় খাদ্য সংকটে রয়েছে বাগেরহাট, বরগুনা, গাইবান্ধা, জামালপুর, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলা। কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন না হলে বিশ্লেষণের ফলাফল তিন থেকে পাঁচ বছর কার্যকর থাকবে বলে উল্লেখ করেছে আইপিসি। সেই সঙ্গে এসব জেলার ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে তারা।
খাদ্য সংকটের অঞ্চলভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, হাওড় অঞ্চলে হওয়ায় কিছু জেলা পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে পারছে না। পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না পাহাড়ি অঞ্চলেও। কিছু জেলায় আবার শস্যের বহুমুখিতা কম। নদীভাঙন, খরা ও বন্যার কারণেও শস্যের আবাদ ব্যাহত হচ্ছে কিছু জেলায়।
ধারাবাহিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বিশ্লেষণে আইপিসির সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সোলিদারিদাদ বাংলাদেশ। সংস্থাটির কান্ট্রি ম্যানেজার সেলিম রেজা হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, হাওড় অঞ্চলের জেলাগুলোয় একদিকে বন্যা, অন্যদিকে শস্য বহুমুখীকরণের অভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে না। উন্নত প্রযুক্তির অভাব ও শ্রম ব্যয়ের কারণে পাহাড়ি অঞ্চলে ফল উৎপাদনের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কিছু অঞ্চলের মানুষ ধান আবাদে বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল। কিন্তু সম্প্রতি ধান আবাদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে শস্যটির মাধ্যমে কৃষক তেমন আয় বাড়াতে পারছেন না। ফলে এসব জেলায় খাদ্য সংকট তীব্র হচ্ছে।
তীব্র খাদ্য সংকটে থাকা জেলাগুলোর একটি তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীবিধৌত কুড়িগ্রাম। নদীভাঙন ও বন্যায় প্রায়ই ব্যাহত হয় জেলার কৃষি কর্মকাণ্ড। এতে তীব্র খাদ্য সংকটে থাকতে হয় জেলার অধিকাংশ মানুষকে। আইপিসির হিসাবে, কুড়িগ্রামের ১৫ লাখ ১৭ মানুষের মধ্যে ৭০ শতাংশই খাদ্য সংকটে থাকে। এর মধ্যে তীব্র বা চতুর্থ মাত্রার (লেভেল-৪) খাদ্য সংকটে থাকে ২০ শতাংশ মানুষ। তৃতীয় বা লেভেল-৩ মাত্রার খাদ্য সংকটে থাকে জেলার ২৫ শতাংশ মানুষ। আর দ্বিতীয় মাত্রার খাদ্য সংকটে থাকে ২৫ শতাংশ মানুষ।
সর্বোচ্চ মাত্রায় বা তীব্র খাদ্য সংকটে থাকা আরেক জেলা হাওড় অঞ্চলের সুনামগঞ্জ। আইপিসির তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় ১৮ লাখ ৩৭ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে ৭০ শতাংশই খাদ্য সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে ২০ শতাংশ মানুষ। তৃতীয় মাত্রার (লেভেল-৩) খাদ্য সংকটে রয়েছে জেলার ২০ শতাংশ মানুষ। আর জেলার ৩০ শতাংশ মানুষ রয়েছে দ্বিতীয় মাত্রার খাদ্য সংকটে।
তীব্র খাদ্য সংকটে থাকা আরেক জেলা পার্বত্যাঞ্চলের বান্দরবান। আইপিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জেলার ৩ লাখ ১ হাজার মানুষের মধ্যে খাদ্য সংকটে রয়েছে ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে ২০ শতাংশ মানুষ। তৃতীয় ও দ্বিতীয় মাত্রার খাদ্য সংকটে রয়েছে জেলার ২২ ও ২৮ শতাংশ মানুষ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান তিনটি খাদ্যশস্য— আমন, বোরো ও আলু উৎপাদনে পিছিয়ে আছে এসব জেলা। ২০১৫-১৬ অর্থবছর দেশে মোট বোরো চাল উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৮৯ লাখ টন, আমন ১ কোটি ৩৪ লাখ টন ও আলু ৯৪ লাখ ৭৪ হাজার টন। বান্দরবানে বোরো উৎপাদন হয় ১৫ হাজার ৩১১, আমন ২৩ হাজার ৭৬৬ ও আলু ৩ হাজার ৬৫৯ টন। এছাড়া সুনামগঞ্জে গত অর্থবছর বোরো উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৮৫ হাজার, আমন ১ লাখ ৯ হাজার ও আলু ৮ হাজার ৫৯৪ টন। আর কুড়িগ্রামে ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৪ লাখ ১৯ হাজার টন বোরো, ২ লাখ ৪৩ হাজার আমন ও ১ লাখ ৫৩ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়।
আইপিসির তথ্য বিশ্লেষণে জাতীয় টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপের (টিডব্লিউজি) নেতৃত্বে ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক। যোগাযোগ করা হলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আতাউর রহমান বলেন, দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কোনো অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদনে কমতি থাকলে উদ্বৃত্ত অঞ্চল থেকে সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে। সারা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বাড়ানো ছাড়াও বিভিন্ন সময় দরিদ্রদের জন্য সহায়ক কর্মসূচি দেয়া হচ্ছে। এসব জেলায় উৎপাদন বাড়াতেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিরন্তরভাবে কাজ চলছে।
মাঝারি মাত্রায় (লেভেল-৩) খাদ্য সংকটে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে আছে হাওড় অঞ্চলের আরেক জেলা নেত্রকোনা। আইপিসির বিশ্লেষণ বলছে, জেলার ১৫ লাখ ৪৩ হাজার মানুষের মধ্যে ৬৫ শতাংশই খাদ্য সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রার সংকটে রয়েছে ১৫ শতাংশ মানুষ। এছাড়া তৃতীয় মাত্রার খাদ্য সংকটে রয়েছে ২০ ও দ্বিতীয় মাত্রার ৩০ শতাংশ মানুষ।
দেশের তিন পার্বত্য জেলার একটি খাগড়াছড়ি। আইপিসির হিসাবে, জেলার ৪ লাখ ২৩ হাজার মানুষের মধ্যে ৬৫ শতাংশ খাদ্য সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ চতুর্থ মাত্রার খাদ্য সংকটে রয়েছে জেলার ১০ শতাংশ মানুষ। এছাড়া তৃতীয় মাত্রার খাদ্য সংকটে রয়েছে ২০ ও দ্বিতীয় মাত্রার ৩৫ শতাংশ। এছাড়া রাঙ্গামাটির চার লাখ মানুষের মধ্যে ৬৩ শতাংশ খাদ্য সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে জেলার ৬ শতাংশ মানুষ। এছাড়া তৃতীয় মাত্রার খাদ্য সংকটে রয়েছে ২২ ও দ্বিতীয় মাত্রায় ৩৫ শতাংশ। হবিগঞ্জের ১৪ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মধ্যে ৬৫ শতাংশ খাদ্য সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে ১০, তৃতীয় মাত্রার ২০ ও দ্বিতীয় মাত্রার ৩৫ শতাংশ মানুষ।
আইপিসির হিসাবে, জামালপুরে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে ৭০ শতাংশ মানুষ খাদ্য সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে ৯, তৃতীয় মাত্রার ২০ শতাংশ মানুষ। জেলার ৩৩ শতাংশ মানুষ রয়েছে দ্বিতীয় মাত্রার খাদ্য সংকটে। এছাড়া সিরাজগঞ্জে ২০ লাখ ২৭ হাজার মানুষের মধ্যে খাদ্য সংকটে রয়েছে ৬৩ শতাংশ। এর মধ্যে তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে ১২, তৃতীয় মাত্রার ২০ ও দ্বিতীয় মাত্রার ৩০ শতাংশ।
খাদ্য সংকটে থাকা অন্যান্য জেলার মধ্যে পটুয়াখালীতে ১২, বরগুনায় ৫, পিরোজপুরে ৭, বাগেরহাটে ৮ ও গাইবান্ধায় ১৫ শতাংশ মানুষ রয়েছে লেভেল-৪-এ। লেভেল-৩-এ আছে এসব জেলার যথাক্রমে ১৫, ১৫, ১৮, ১৮ ও ২৫ শতাংশ মানুষ।
এ বিষয়ে হাওড় ভূমিপুত্র আন্দোলনের উদ্যোক্তা ও সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টারের জ্যেষ্ঠ কারিগরি কর্মকর্তা নিয়াজউদ্দীন পাশা বলেন, বন্যাপ্রবণ এলাকার কারণে হাওড় অঞ্চলে খাদ্যশস্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার এসব এলাকায় শিল্প কর্মসংস্থানেরও কোনো সুযোগ নেই। মিঠা পানির প্রাপ্তি থাকলেও সেখানে মাছ উৎপাদনের কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারছে না এসব অঞ্চলের মানুষ। বন্যাসহিষ্ণু কার্যকর ধানের জাত সম্প্রসারণ, মিঠা পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার, শস্য বহুমুখীকরণ ও দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে খাদ্য সংকট আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। খবর-বণিক বার্তা

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।