থানচিতে স্কুলের গা ঘেঁষে সচল অবৈধ ইটভাটা

বান্দরবান জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় মামলার আসামি ও পলাতক আওয়ামীলীগ নেতা আনিছুর রহমান সুজনের মালিকানাধীন থানচি উপজেলার হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একেবারে সন্নিকটে অবস্থিত অবৈধ ইটভাটা বন্ধ তো হয়নি, উল্টো দাপটের সঙ্গে উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের রহস্যজনক নীরবতায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

থানচিতে সরকারি স্কুল, পাহাড় ও বনাঞ্চলে ঘেরা জনবসতির মাঝখানে গড়ে ওঠা ‘এসবিএম ব্রিকস’ নামে একটি অবৈধ ইটভাটা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে বলে গত ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় এবিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী মো. মুজিবর রহমানসহ বিভিন্ন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

এসময় তারা বলেন, মামলার আসামি ও পলাতক আওয়ামীলীগ নেতা আনিছুর রহমান সুজন এক যুগের ও বেশি সময় ধরে কিভাবে এই অবৈধ ইটভাটা পরিচালনা করে আসছেন। এর ফলে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এবং পার্শ্ববর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। এই দাবির প্রেক্ষিতে সভায় ঐ ইটভাটা বন্ধ ও মালিক সুজন ও তাঁর সহযোগিদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে মামলা দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি। কিন্তু নির্দেশের ১৪ দিন অতিবাহিত হলেও বনবিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে রহস্যজনক নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এধরনের গড়িমসিতে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ইটভাটাটির মালিক আওয়ামীলীগ নেতা আনিছুর রহমান সুজনের বিরুদ্ধে সদর থানায় নাশকতার মামলা রয়েছে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম জেলায় আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে তাঁর অনুপস্থিতেও ভাটাটি পুরো দাপটে সচল রয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন-কোন শক্তির জোরে তিনি পরিবেশ আইন, প্রশাসন ও জনস্বার্থকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ইটভাটা পরিচালনা করে যাচ্ছেন?

হেডম্যানপাড়ার বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্দেশনার পরও ইটভাটাটি আগের মতোই চালু রয়েছে। প্রতিদিন কাঠ পোড়ানো হচ্ছে, ফলে আশপাশের এলাকায় মারাত্মক বায়ুদূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। এঘটনায় বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালক মোঃ রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি থানচি উপজেলায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলা সদরে ইউএনও অফিস থেকে মাত্র ৫’শ মিটার দূরে থানচি-আলীকদম সড়কের পাশে একটি ইটের ভাটা চলছে। একটি স্কুলসহ দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, একটি বৌদ্ধ বিহার ও কয়েকটি পাহাড়ি মারমা সম্প্রদায়ের গ্রাম, কাছাকাছি অবস্থিত।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো-এই অবৈধ ইটভাটাটি থানচি উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয় ছাড়াও বনবিভাগের অফিস থেকে ২’শ মিটার দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ প্রশাসনের ‘নাকের ডগায়’ প্রকাশ্যে চলছে আইনবহির্ভূত কার্যক্রম। আইন অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবসতির কাছাকাছি এলাকায় ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও বছরের পর বছর ধরে কীভাবে এই ভাটা চালু আছে-সে প্রশ্ন এখন থানচিবাসীর মুখে মুখে।

থানচির পাহাড়িদের অভিযোগ, ইটভাটার এই ধোঁয়ায় বিশেষ করে বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশু ও আশপাশের বাসিন্দারা শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। ধোঁয়া থেকে ছাড়ানো বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের, বাড়ছে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ; প্রতিবছর আশপাশের পাড়াগুলোতে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর, বনবিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন নীরব বা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়েও সন্দেহের চোঁখে দেখছেন থানচিবাসি।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবকদের অভিযোগ, হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন শ্রেণিকক্ষে পাঠে মনোযোগ দেওয়ার কথা, তখন জানালা-দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ছে ইটভাটার কালো ধোঁয়া। ক্লাস চলাকালেই অনেক শিশুর শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা ও চোখ জ্বালাপোড়া শুরু হয়। কোনো কোনো দিন ধোঁয়ার তীব্রতায় পাঠদান বন্ধ করে দিতে হয়।

NewsDetails_03

বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীরা জানান, গত দুই মাস ধরে ভাটার চুল্লি জ্বলছে। ধোঁয়া ও ঘন ঘন ট্রাক চলাচলের ধুলো ক্রমাগত দরজা-জানালা দিয়ে প্রবেশ করে। এতে তাঁদের শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে প্রচন্ড কষ্ট হয়।

থুইমং প্রু মারমা নামে এক অভিভাবক বলেন, আমাদের বাচ্চারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই ধোঁয়ার ভেতর থাকে। ছোট শরীরে এত বিষ ঢুকলে ভবিষ্যৎ কী হবে, সে প্রশ্নের জবাব কেউ দিচ্ছে না?।
হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চা শোই উ মারমা জানান, ১০-১২বছর আগে ভাটা চালু হলে তারা বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কাছে তুলে ধরেন। কিন্তু কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পাড়া ও স্কুলের পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের স্বার্থে এই ভাটা বন্ধ করা অপরিহার্য বলে জানান এই শিক্ষক।

চিকিৎসকদের মতে, প্রতিনিয়ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে শিশুদের ফুসফুসের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ ও ত্বকের রোগ ছাড়াও মানসিক ও শারীরিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

হেডম্যানপাড়ার বাসিন্দা চহ্লামং মারমাসহ কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবছর আশপাশের পাড়াগুলোতে জন্মগত ও পরবর্তী সময়ে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। তাঁদের দাবি, এই পরিস্থিতির পেছনে ইটভাটাসৃষ্ট পরিবেশ দূষণ একটি বড় কারণ।

স্থানীয় বাসিন্দা আ উং শৈই উ মারমা ও চাথোয়াই মারমাসহ একাধিক পাহাড়ি মানুষের অভিযোগ, ইটভাটাটি দুইটি ড্রাম চুল্লি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এবং মূলত পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। এর ফলে একদিকে আশপাশের পাহাড়ি বন নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে ঘন ধোঁয়ায় এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

ইটভাটার ব্যবস্থাপক মো. সরোয়ার জানান, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে মালিক আনিছুর রহমান সুজন আত্মগোপনে রয়েছেন। বর্তমানে তাঁর ছোট ভাই, জেলা কৃষকদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মেহেদীর মাধ্যমে ভাটাটি পরিচালিত হচ্ছে। তবে এ কার্যক্রমের কোনো সরকারি অনুমোদন আছে কি নাÑসে বিষয়ে নিশ্চিত নন তিনি।

এবিষয়ে জানতে আ’লীগ নেতা আনিছুর রহমান সুজন ও জেলা জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মেহেদীর সাথে একাধিকার যোগযোগ করা হলেও তাঁরা উভয় কল রিসিভ করেননি।
অর্থের অভাবে ওই অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা এবং মামলা দায়ের করা সম্ভব হচ্ছে না বলে এক বিস্ময়কর ও প্রশ্নবিদ্ধ মন্তব্য করেন বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালক মোঃ রেজাউল করিম।

বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের উত্থাপিত নানা অভিযোগের বিষয়ে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি। তিনি বলেন, অভিযোগসংক্রান্ত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরো বলেন, পরিবেশবিরোধী কর্মকান্ড বন্ধে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; এক্ষেত্রে পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মানববন্ধনসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয়দের আরো সক্রিয় ও জোরালো ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন