থানচি’র মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে হবে

ঞ্যোহলা মং
বান্দরবানের থানচি সম্পর্কে লিখতে আমার ভাল লাগে। চাকুরি করতে গিয়ে অনেকটা সময় বান্দরবানে কাটিয়েছি। রুমা উপজেলায় পোষ্টিং পেয়েছি। থানচি উপজেলায় অনেক অনেক বার গিয়েছি। ফলে এই দুটি উপজেলা সম্পর্কে আমার আলাদা টান কাজ করে।
চাকুরি জীবনে নানাভাবে উপলব্দি করেছি আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের এই প্রত্যন্ত উপজেলা সম্পর্কে অনেকের কোন ধারনাই কাজ করে না। আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের লোকজনদের দোষ দিতে চাই না। কেননা খোদ পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসকারী অনেক বছর ধরে কাজ করা এনজিও কর্মীরাও এই দুটি উপজেলা সম্পর্কে সঠিকভাবে উপলব্দি করতে পারেন না। কাজ করতে গিয়ে নানাভাবে বাঁধাগ্রস্থ হয়েছি নিজেদের লাইন ম্যানেজারের নিকট।
বান্দরবান সদরে সবে পোষ্টিং নিয়ে গিয়েছিলাম ২০০৩ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকে। মাস যেতে না যেতে হেড অফিস থেকে নির্বাহী পরিচালকের অনুরোধ থানচি উপজেলায় গিয়ে ডায়রিয়ার ব্যাপকতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরী করে পাঠাতে হবে। আমি এর আগে কোনদিন ঐ উপজেলায় যায়নি। সেই সময়ে থানচি উপজেলায় সংস্থাটির কোন কার্যক্রমও ছিল না। ফোনে পরিচালক এইটুকু বললেন রাংলাইদা’র সংগঠনে একটি গাড়ি আছে ভাড়া করে নিতে যেতে পারি।
ভাবলাম প্রথম চাকুরি, কতসময় লাগবে, কিছুই জানি না। গাড়ি না নিয়ে লাইনের গাড়ীতে গেলে ঐ উপজেলার লোকজনদের সাথে পরিচিত হতে পারবো আর নিজের মতো করে সময় নিয়ে কাজও করতে পারবো। বিকট শব্দে চলা চাঁদের গাড়ীতে ঠেলাঠেলি করে কোন রকমে একটু জায়গা করে নিয়ে জীবন নগর পেরিয়ে পৌঁচ্ছলাম বলিপাড়ায়। তার পর নৌকার জন্য বসে থাকতে থাকতে উপজেলায় পৌঁছেছিলাম যখন প্রায় অন্ধকার। গিয়ে দেখি ভয়াবহ অবস্থা চারিদিকে ডায়রিয়ার রোগী। সাথে বৃষ্টি আর বন্যা। দুদিন সেখানে থেকে একটি প্রতিবেদন তৈরী করে পাঠালাম। মাস শেষে ভ্রমণ ভাতার সাথে আমার উক্ত ভ্রমণের খরচ বাবদও যুক্ত করে ফেরত পাওয়ার লক্ষ্যে বান্দরবান অফিসের হিসাবরক্ষকের মাধ্যমে জমা দিই (হেড অফিসে নিয়ে যাওয়ার আগে তিনি নিজের মত করে যাচাই করে তবেই হেড অফিসে নিয়ে যেতেন)। প্রায় দুমাস পরে হেড অফিস থেকে ডেকে পাঠানো হলো এতো টাকা খরচ হলো কেন? তখন প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন এক মার্বেল আকৃতির, অফিসের অতি বিশ্বস্ত, পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ এক বুদ্ধিমান কর্মী।
দেখা হতেই ব্যবস্থাপকের প্রথম ডায়লক ‘চাকুরিতে ঢুকতে না ঢুকতে শুরু করে দিলে’ তারপর প্রশ্নউত্তর পর্ব
তার প্রথম প্রশ্ন- নৌকার এত ভাড়া কেন? বুঝালাম।
দ্বিতীয় প্রশ্ন- পানি বোতলের এত দাম কেন? বুঝালাম।
তৃতীয় প্রশ্ন- পেপারের (পত্রিকা) বিল এত কেন? বললাম।
কিন্তু কোন কাজ হলো না। দুই একটি পাড়া যেতে নৌকা ভাড়া করেছিলাম। যার নৌকা নিয়েছিলাম তার নাম ঠিকানা সব দিয়েছিলাম গেঠে কোন কাজ দেয়নি। তার প্রশ্ন নৌকা নিতে হবে কেন? নৌকা ভাড়া’ইবা এত হবে কেন? সেই সময়ে জীবন নগরের কাজ হচ্ছিল এবং রাস্তা ভেঙ্গে যাওয়াই কিছুুদিন ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। বন্যা হওয়াতে নৌকা যোগে ব্যবসায়ীরাও মালামাল আনা নেয়া করতে পারছিল না। দোকানে বোতলজাত পানির দাম দ্বিগুণ করে রাখছিল। বড় বোতলের পানিও পাচ্ছিলাম না। সব দোকানে ছোট ছোট বোতল তাই দুদিনে বেশ কয়েকটি বোতল কিনেছিলাম। আর সেই সময়ে বান্দরবান সদর থেকে একটি দৈনিক প্রত্রিকা প্রকাশিত হতো। ডায়রিয়া সম্পর্কিত তথ্য পেতে তাদের অফিস থেকে এক মাসের পেপার সংগ্রহ করেছিলাম যার দাম ছিল ৩ গুন ৩০ সমান সমান ৯০ টাকা (পেপারের দাম কমও হতে পারে, তবে তিন টাকার বেশী নয়) ।
এতে ম্যানেজার খুশি হতে পারেননি। কেন এত পেপার কিনেছিলাম। প্রতিবেদন প্রণয়ন সম্পর্কিত আমি সর্বমোট ৮৩০ টাকা বিল দিয়েছিলাম তার মধ্যে ম্যানেজার নিজেই দাম ঠিক করে আমাকে দিলেন ৩৩০ টাকার মতো। সেইদিন অপমানে লজ্জায় হেড অফিস থেকে শুধু চাকুরির প্রয়োজনে বান্দবানের উদ্দেশ্যে আবার রওনা করেছিলাম।
আমার এখনও মনে পড়লে ভাবি সেদিন যদি ইডি’র (executive director) কথায় গাড়ি নিয়ে যেতাম আর কাজের প্রয়োজনে একদিন বেশী থাকতাম। সেই গাড়ীর বিল নিয়ে তিনি কি বলতেন। তিনি যদি কেটেই দিতেন আমি কিভাবে সেই সময়ে ঐ গাড়ীর বিল মেটাতাম। সেইদিনের প্রশ্নসব আর নানা উপদেশবাণী এখনও ভুলিনি। সেদিন চাকুরি ছাড়তে না পারাতা জীবনের সবচেয়ে বড় একটি ব্যর্থতা।
তবে সেইদিনের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব চিত্র বুঝতে অনেকখানি সাহায্য করেছে। তাই আমি প্রায় প্রতিটি লেখায় এই দুটি উপজেলার কথা বলি (দেখুন ‘চাই ব্যতিক্রমী শীতবস্ত্র বিতরন’ দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম, ২৮ নভেম্বর ১৬ ও Pahar24.com ,২৭ নভেম্বর ১৬ এবং ‘শীত আসছে’ প্রথম আলো, ২০ ডিসেম্বর ২০১৩)। সেইদিন প্রথম থানচি ভ্রমণের প্রতিবেদনে কি কি লিখেছিলাম ঠিক মনে নেই তবে একটি ঘটনা এখনও ভুলিনি তাহলো রুমবই ম্রো যার নামেই পাড়াটি তিনিসহ পরিবারের সকলে এই সাধারণ ডায়রিয়ায় মারা যান। ফলে পুরো একটি ঘর খালি হয়ে যায়।
এই দুটি উপজেলায় এখন সরাসরি গাড়ি যাচ্ছে। হয়ত এরিমধ্যে উপজেলায় কিছু নতুন নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেখানকার মানুষের জীবনমানের খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। কেননা এখনও আমাদের সরকারিও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মীদের মাঝে এই দুটি উপজেলাকে সেইভাবে উপলব্দি করতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই। তাইতো এখনও থানছিতে সময়ে সময়ে খাদ্য সংকট হয়। গেল বছর খাদ্য সংকট দেখা দিলে সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক দলের নেতাদেরকে নানাভাবে অস্বীকার করার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। এখানে এখনও সন্তান প্রসব করতে না পেরে মা ও শিশুর করুণ মৃত্যু ঘটে। যা আমরা আজও প্রত্যক্ষ করে চলেছি। আমাদের তথাকথিত মন মানসিকতার পরিবর্তন আর পার্বত্য দূর্গমতার সত্যিকারের উপবব্দিই পারে থানচির ন্যায় উপজেলাবাসীদের মুখে হাসি ফুটাতে।
তথ্যসূত্র:

ক) থানচিতে খাদ্য সংকট সর্ম্পকিত প্রতিবেদন দেখুন সমকাল (২৬ মে, ২০১৬), বিবিসি বাংলা (২৬ মে, ২০১৬), ভোরের কাগজ (২৭মে, ২০১৬), বণিক র্বাতা (০২ জুন, ২০১৬)।
খ) থানচিতে চিকিংসা সেবা না পেয়ে প্রসূতির মৃত্যু সর্ম্পকিত প্রতিবেদন দেখুন CHTTimes24.com (২৬ নভেম্বর ২০১৬)।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও UN Indigenous Fellow। ইমেইল: [email protected]

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। পাহাড়বার্তার -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য পাহাড়বার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আরও পড়ুন
2 মন্তব্য
  1. Mong Hai Nu Marma বলেছেন

    Hasi kivhabe futaben????

  2. Khaymong Marma বলেছেন

    Onek din por dekha pelam fb dadake…….

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।