দীঘিনালায় প্রকাশ্যে পাহাড় কাটার ধুম

দায়সারা প্রশাসন

পৃথিবীর লোহ দণ্ড বলা হয় পাহাড়কে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় যার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।এর ওপর ভর করেই প্রকৃতি তার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। অথচ এক শ্রেণির ভূমিদস্যুরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে সেই পাহাড়গুলোকে সাবাড় করছে।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে অসংখ্য পাহাড় রয়েছে। তবে সেসব পাহাড়গুলোতেও পড়েছে ভূমি খোকোদের থাবা।নিজস্ব ফায়দা লুটতে পাহাড়ের মাটি কেটে বিক্রি, বনের কাঠ পাচারের জন্য রাস্তা নির্মাণ, আবাস্থল গড়ে তোলাসহ নানা স্বার্থে এসব পাহাড়গুলোকে নির্বিচারে বিলীন করে দিচ্ছে।

সকাল থেকে রাত সমান তালে চলে পাহাড় কাটার কাজ। তবে বেশিরভাগ সময়ে নিঝুম রাতে চলে বনাঞ্চলের আবৃতে ঘেরা পাহাড় কাটার ধুম। বিগত কয়েক বছরে এ অঞ্চলের প্রায় অর্ধেকের চেয়ে বেশি পাহাড় ও টিলা কেটে সমতল করা হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মাঝে চাপা ক্ষোভ থাকলেও প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতেও পারছেন না। প্রভাবশালী মহলটি ক্ষমতার দাপট ও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাতের আধাঁরে পাহাড়ের মাটি কেটে সাবাড় করে ফেলছে। ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকি মুখে পড়েছে।

সরেজমিন উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে মাটি কেটে করা হয়েছে সমতল। পাশেই অস্থিত হারানোর পাহাড়ের ক্ষত চিহ্ন। কোথাও কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে সমতল করা জায়গায় স্থানীয় এক শ্রেণির বাসিন্দারা ঘর নির্মাণের কাজে ব্যস্ত। যেন পাহাড় কাটার উৎসবে নেমেছে তারা। সে সঙ্গে পাহাড়ের চূড়ায় থাকা বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিধন করে ফেলছে। প্রকৃতির বুকে মানুষের এমন থাকায় জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাহাড়ের মাটি কাটার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে অধ্যাধুনিক ভেকু মেশিন ও পেলোডার। যার মাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে পাহাড়ের মাটিগুলোকে কেটে ফেলা হচ্ছে। মাটি কেটে সেগুলোকে টাক্টরে করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। আবার অনেকেই গর্ত বা জমি ভরাট করে ঘর বাড়ি নির্মাণ করছে।

স্থানীয় সচেতন মহল জানান, যেভাবে নির্বিচারে ও অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে তা জনজীবনে হুমকি স্বরূপ। পাহাড়ের তলে কিংবা পাহাড়ে যেসব বাড়িঘর রযেছে ভারী বর্ষণে যেকোনো মুহূর্তে ধসে যেতে পারে। এতে ব্যাপক প্রাণহানির আশংকাও রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, পাহাড় কাটা বেআইনি কিনা তা আমাদের জানা নেই। এ বিষয়ে কেউ আমাদের অবহিত করেনি। অনেকেই পাহাড় কেটে বাড়িঘর নির্মাণ করেছে। বিনা বাঁধায় মাইলের পর মাইল পাহাড় সাবাড় করা হয়েছে। পাহাড় কাটার বিষয়ে আমাদের যথাযথ জ্ঞান না থাকায় আমরা আমাদের পারিবারিক প্রয়োজনে পাহাড় অংশ কাটা শুরু করলেও এখন তা বন্ধ করে দিয়েছি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইলিয়াছ বলেন, আমাদের বাপ-দাদা আমল থেকে দেখে আসছি এ পাহাড়গুলো। শত শত বছরের এ পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে আমরা বড় হয়েছি। অথচ একটি ভূমিদস্যু মহল এ পাহাড়গুলো অবাধে কেটে ফেলছে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের জায়গাগুলো অনেক উঁচুতে। সেখানে বৃষ্টিপাতের পানিগুলো আমাদের দেশে প্রবেশ করলে পাহাড়ের কারণে ড্রেনগুলো দিয়ে সরে যেত। এখন পাহাড়গুলো কেটে ফেলায় ভারত থেকে বৃষ্টির পানি সহজে প্রবেশ করে আমাদের নিচু এলাকা প্লাবিত করছে। এতে আমাদের ফসলি জমিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যা আর্থিকভাবে অনেক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে এলাকার আবদুর রহমান, নজরুল ইসলাম ছাড়াও প্রভাবশালী একটি চক্র এতে জড়িত থাকায় সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলছেন না। চক্রটি অবৈধভাবে গভীর রাতে ভেকু মেশিনের মাধ্যমে পাহাড়ের মাটি কেটে নিয়ে অন্যত্র বিক্রি করছে।

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা রমিজ উদ্দীন বলেন, আমার নামে বীর নিবাস বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। আর এ বীর নিবাস নির্মাণের জন্য আবদুর রহমানকে ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা দিয়ে পেলোডারের মাধ্যমে মাটি সমান করি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুর রহমান বলেন, ঘর নির্মাণের জন্য এক-দেড় ফুট মাটি কাটা যায়। এটা তেমন কিছু না।

সম্প্রতি পাহাড় কাটার বিষয়ে দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ আরাফাতুল আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান,পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ একটি বেআইনি কাজ। এটি কোনোভাবে গ্রহণ যোগ্য নয়। আমরা খবর পেয়েছি একটি চক্র গভীর রাতে পাহাড়ের মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা অভিযান চালালে উপস্থিতি টের পেয়ে ওই মহলটি পালিয়ে যায়। সার্বক্ষণিক বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে। যারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।