দূর্গম জনপদের তরুণদের আইকন আলীকদমের উনুমং

সত্তর দশকে শিক্ষার আলোর ছোঁয়া ততটা পড়েনি বান্দরবানের দূর্গম আলীকদম নামক এলাকাটিতে। তৎসময় পুরো চট্টগ্রামের মত আলীকদমের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল। হাতে গুণা দুয়েকজন সেসময় মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা করলেও তেমন শিক্ষিত ছিল না, অধিকাংশও ছিল নিরক্ষর। সেই কিশোর বয়সেই স্বপ্ন দেখতেন তিনি শিক্ষিত হবেন। নিজের চারপাশের মানুষগুলোকে শিক্ষিত ও বিদ্যালয় বিমুখ ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয় মুখি করবেন, যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ছাত্র জীবনে সবাইকে সচেতন করার পাশাপাশি অসংখ্য মার্মা ছেলেমেয়েকে বিদ্যালয় মুখি করেছেন ও বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চালু করে যুবকদের খারাপ অভ্যাস থেকে বিরত রাখতেন। তৎসময় এই দূর্গম এলাকাটিতে মার্মাদের বড় উৎসব সাংগ্রাই’র জলকেলি খেলা (পানিখেলা)ও আলীকদমে তিনিই প্রথম চালু করেছেন।

তৎকালীন ইউনিয়ন ও বর্তমান আলীকদম উপজেলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রও তিনি। আলীকদম উপজেলার মার্মা সম্প্রাদায়ের মধ্যে প্রথম পুলিশের এসআই হিসেবে ১৯৮৬ সালে নিয়োগ পেয়েছিলেন উনুমং মার্মা। আজ সেই দূর্গম উপজেলার ছেলেটি পুলিশের সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। পুরো আলীকদমে তিনি তরুণদের আইকন। যার দেখানো পথ ধরেই এই উপজেলাতে দুইজন এমবিবিএস ডাক্তার, একজন বিসিএস ক্যাডার, ৩৩ বছর পর একজন এসআই ও অসংখ্য মেডিক্যাল শিক্ষার্থী সৃষ্টি হয়েছে ও প্রতিষ্টিত হয়েছে। এখনও এই উপজেলায় অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের তার (উনুমং) গল্প শুনিয়ে উজ্জ্বিবিত করেন। চাকুরী জীবনে তার সফলতা অজস্র। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলা, চার নেতার জেল হত্যা মামলাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সহকারী হিসেবে ছিলেন। তাছাড়াও জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলা ও শীর্ষ সন্ত্রাসী বাংলা ভাইয়ের মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও ছিলেন তিনি।

উনুমং পাহাড়বার্তাকে জানান, আজকের আলীকদম আর সেদিনের আলীকদমের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন। তখন পায়ে হাটা ও নদী পথেই যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। অল্প সংখ্যক মানুষ ছিল। সবাই ছিল লেখাপড়া বিমূখ। নিজের ছোট ও সমবয়সীদের জোর করে বিদ্যালয়ে পাঠাতাম। তার জন্য অনেকে ঠাট্টা মশকরাও করত আমার কাজ দেখে। কিন্তু আমি দমে যায়নি, আমি আমার কাজ করেছি। আমার চিন্তা ছিল আমাকে মানুষ হতে হবে, তার জন্য অন্যদের মত নিজেকে খারাপ পথে চালিত করিনি। আমি যখন এসআই হলাম সবাই অবাক হয়ে গেল। এই দূর্গম এলাকা থেকে কিভাবে এসআই হলাম, কেমন করে হলাম সবাই বলাবলি করত। এরপর আলীকদমে তৎসময় বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করতে মনোযাগী হয়। আজ অসংখ্য শিক্ষিত এই উপজেলায়।

তিনি পাহাড়বার্তাকে আরও বলেন, আমার শিক্ষা জীবন ততটা সহজ ছিলনা। বাবা তৎসময় ইউনিয়ন কৃষি কর্মকর্তা ছিলেন। অল্প বেতনে আমাদের পরিবার ও আমাদের শিক্ষায় ব্যয় হত। ছাত্র জীবন অনেক কষ্টের ছিল। আমার স্কুল জীবন ও কলেজ জীবনে লামা-আলীকদমে গাড়ী ছিল না। যখন বান্দরবান কলেজে পড়তাম, তখন আলীকদম লামা, মাঝের ফাঁড়ী শিকলঘাটা হয়ে যেতে হত। কিছু পথ নৌকা ও পাহাড়ের গহীনে পায়ে হেঁটে যেতাম। আসা যাওয়ার সময় লামায় রাত্রিযাপনও করতে হত গহীন জঙ্গলের মধ্যে। তাই রাত কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটার সাথে সাথে আবার পায়ে হেঁটে বাড়ী থেকে আসা যাওয়া করতাম। এভাবেই আমাদের ছাত্রজীবন কেটেছে। পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি মাত্র সিট ছিল তখন পুলিশের এসআই পদে। আর সে বছর সেই সিটটিতে আমিই প্রথম হয়েছিলাম। কলেজ জীবনে পরিবার থেকে একশত টাকা দিত তার মধ্যে থেকে ৪০ টাকা কলেজ বেতন, ৪০ টাকা ঘরভাড়া ও ২০ টাকা দিয়ে সারা মাসের খাবার। পরে চট্টগ্র্রাম জাতীয় বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন পরিবার থেকে ৪ শত টাকা দিত তাও একসাথে দেওয়া হত না। আর এগুলো দিয়ে পড়াশুনা থাকা খাওয়া সব করতে হত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হওয়ার আগেই পুলিশের চাকুরীতে যোগদান করি। পরে চাকরীরত অবস্থায় আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করি।

উনুমং চাকুরী জীবন এসআই দিয়ে শুরু করলেও দীর্ঘদিন ওসি ও পরে পদোন্নতি পেয়ে এএসপি র‌্যাব-৪ দীর্ঘ ৫ বছর দায়িত্বরত ছিলেন। পরে সদ্য পদোন্নতি পেয়েছেন। চাকুরীজীবি বাবা মংম্যাথোয়াইয়ের ৫ ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড় সন্তান উনুমং। উনুমং এর এক ভাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও দুই ভাই, একবোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

বেসরকারী সংস্থার কর্মকর্তা উইলিয়াম মার্মা বলেন, উনি (উনুমং) শুধু মার্মা সম্প্রদায়ের নয় পুরো আলীকদম উপজেলার আইকন। আলীকদমে দুয়েক বছর ধরে অসংখ্য উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হচ্ছে কিন্তু আজ থেকে ৩৪ বছর আগে এবং প্রথম কর্মকর্তা হিসেবে নিজে প্রতিষ্টিত করেছেন। এখনও দূগর্ম পল্লীগুলোতে উনার গল্পে অনুপ্রাণিত করে সন্তানদের। আজ অসংখ্য ছাত্র বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পড়লেও আশি দশকে তিনিই প্রথম, এটি আমাদের গর্ব। কিন্তু এই পথ চলা সহজ ছিল না দূর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একটি এলাকা থেকে। বাবা অল্প বেতনের তৎকালীন ইউনিয়ন কৃষি কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।