বড়ুয়া না মারমাগ্রী বিতর্ক : দেশের বৌদ্ধ অনুসারী বড়ুয়াদের মধ্যে বাড়ছে উত্তেজনা

দেশের বৌদ্ধ অনুসারী বড়ুয়া সম্প্রদায়
আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকে আমাদের নামের শেষে বড়ুয়া পদবী ব্যবহার করে আসছি, আজ সুকৌশলে দেশের বড়ুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন তৈরী করার জন্য “বড়ুয়া” পদবী বাদ দিয়ে মারমাগ্রী পদবি ব্যবহার করতে বাধ্য করছে, যাতে বড়ুয়াদের কৃষ্টি,কালচার, সামাজিকতা ধংস হয়ে যায়। কথাগুলো বলছিলেন, বান্দরবানের শহরের বড়ুয়া সম্প্রদায়ের অসিম বড়ুয়া।
সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানের রামজাদি এবং ধাতু জাদী (স্বর্ণ মন্দির) মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীমৎ উ পঞ্ঞা জোত মহাথের (উছালা ভান্তে) বড়ুয়া শীর্ষদের মারমাগ্রী পদবী ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন। এর ফলে এই ধর্মীয় গুরুর অনেক ভক্ত বড়ুয়া’র পরিবর্তে মারমাগ্রী পদবী ব্যবহার শুরু করলে বড়ুয়া’দের শীর্ষ ধর্মীয় গুরু ড. এফ দীপংকর ভান্তে ও উছালা ভান্তের ভক্তদের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। আর এই কারনে বৌদ্ধ ধর্মীয় দুই নেতার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিরোধ এতোটা প্রকাশ্যে যে, যেকোন সময় বড় ধরণের সংঘাতের আশংখা করছে দেশের বৌদ্ধ অনুসারীরা।
বান্দরবান সরকারী মহিলা কলেজের প্রভাষক অজয় বড়ুয়া পাহাড়বার্তাকে বলেন, আমাদের জাতি সত্বা বিলুপ্ত করার জন্য এটা করা হচ্ছে, এটা কোন ভাবেই কাম্য নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মারমাগ্রী হল একটি জাতির নাম। বার্মার ১৩৭ টি স্বীকৃত জাতিগোষ্টীর মধ্যে মারমাগ্রী একটি এবং যে সাতটি জাতি নিয়ে মিয়ানমারের আরাকানের রাখাইন সম্প্রদায় গঠিত তার একটিও হল এই মারমাগ্রী জাতি। আর আভিধানিক অর্থ- মারমা+ গ্রী=মারমাগ্রী। গ্রী মানে হল বড়। মারমাগ্রী মানে মারমাদের বড় ভাই। মূলত মিয়ানমারকে অনুকরণ করে বাংলাদেশে বড়ুয়াদের পদবী পরিবর্তনের নির্দেশ দেন বলে মনে করছে বড়ুয়া সম্প্রদায়ের শীর্ষ নেতারা।
রাঙামাটির আসামবস্তি বুদ্ধাংকুর বিহারের সভাপতি ডা: সুপ্রিয় বড়ুয়া পাহাড়বার্তাকে জানান,বড়ুয়া পদবী পরিবর্তনের ফলে সামাজিক বিভাজনের কারনে দ্বন্ধ-সংঘাত বাড়বে। তিনি আরো বলেন, সরকার যে বৌদ্ধ পারিবারিক আইন করছে সেটিও বাধার সন্মুখিন হবে।
আরো জানা যায়, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মগধ সম্রাজ্যের অন্তর্গত বৈশালীর বর্জি বংশীয় এক ক্ষত্রিয় রাজপুত্র তার বহু সংখ্যক অনুচর নিয়ে মগধ হইতে পালিয়ে বৌদ্ধ রাজার আশ্রয়ে পগাঁর পথে আসাম, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা,নোয়াখালিতে বসবাস শুরু করে। মগধের বর্জিবংশ সম্ভুত ‘বর্জি’ শব্দ হইতে ‘বড়ুয়া’ শব্দের উৎপত্তি।
বাংলাদেশ বুডিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দ প্রিয় পাহাড়বার্তাকে বলেন, আড়াইহাজার বছরের ইতিহাস নষ্ট করে আমাদের পদবী পরিবর্তনের কারনে আমরা সামাজিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবো। তিনি আরো বলেন,এক ঘরের এক ভাই বড়ুয়া লিখলে, আরেক ভাই মারমাগ্রী লিখলে সম্পত্তি বন্ঠনে আইনি জটিলতা তৈরী হবে।
আরো জানা গেছে, বাংলাদেশে বসবাসরত প্রায় ৭ লক্ষ বৌদ্ধ অনুসারী বড়ুয়া সম্প্রদায়ের উল্ল্যোখযোগ অংশ চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারে বসবাস করে আসলেও তারা নামের শেষ অংশে “বড়ুয়া” পদবী ব্যবহার করেন। সম্প্রতিক সময়ে বড়ুয়া পদবীর পরিবর্তে তাদের সুকৌশলে মারমাগ্রী ব্যবহারে বাধ্য করছে বলে মনে করছে সম্প্রদায়টি। যার ফলে সমাজে অস্থিরতার পাশাপাশি ব্যাপক সংঘাতের আশংখা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একদিকে শ্রীমৎ উ পঞ্ঞা জোত মহাথের (উছালা ভান্তে), অন্যদিকে বড়ুয়া সম্প্রদায়ের শীর্ষ ধর্মীয় গুরু ও নেতাদের মধ্যে মতভেদের কারনে একে অন্যের ধর্মীয় মতবাদ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচারে লিপ্ত হওয়ায় সাধারণ বৌদ্ধ অনুসারীদের অনেককেই ক্ষুদ্ধ করছে।
এই ব্যাপারে প্রতিবেদক শ্রীমৎ উ পঞ্ঞা জোত মহাথের (উছালা ভান্তে) এর সাথে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে বৌদ্ধ অনুসারী চিন্তাবীদ ও ধর্মীয় গুরুরা মনে করেন, এই ব্যাপারে দ্রুত সুষ্ঠ সমাধান না হলে দেশে বড় ধরণের আন্দোলনের পাশাপাশি, দেশের সম্প্রদায়গুলো থেকে বিলীন হতে পারে বড়ুয়া নামের সম্প্রদায়টি।

আরও পড়ুন
Loading...