পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেই দেখতে চান পাহাড়ের বিশিষ্ঠ ব্যক্তিত্বরা

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং ২০১৪ সালের সংশোধিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড’ আইন অনুযায়ী একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেই চেয়ারম্যান পদে মনোয়ন দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি’র পর পর পর তিন মেয়াদে দুইজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য এই বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবার প্রত্যয়ে প্রতিমন্ত্রী পদ-মর্যাদার বোর্ড চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে বীর বাহাদুর নির্বাচনী মাঠে নামলে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরাকে ১৯ ডিসেম্বর ২০১৩ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোনীত করেন। এরপর তিনি সচিব পদে অবসর নেয়ায় ১৯ মার্চ ২০১৮ তারিখে পুনরায় তিনি সচিব মর্যাদায় তিন বছরের জন্য নিয়োগ পান। এই মার্চেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। চেয়ারম্যান পদে নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা’র দায়িত্ব পালনকালে বোর্ডে বরাদ্দ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সৃজনশীল উন্নয়ন কর্মের পাশাপাশি কাজে গতিশীলতা ফিরে এসেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে নিবেদিত ৪৫ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠান ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান পদে সরকার কাকে মনোয়ন দেবে; এই নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে নব বিক্রম ত্রিপুরার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ গত ১৮ মার্চ শেষ হলেও সরকার নতুন কাউকে এখন পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করেনি। অন্তবর্তীকালীন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান মো: নুরুল আলম নিজামী। যিনি এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পিআরএল-এ যাবেন।

রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে চেয়ারম্যান না করায় উন্নয়নে যেমনি জনসম্পৃক্ততা বেশি থাকছে না তেমনি জন আকাংখাও পূরণ হচ্ছে না। তাই পাহাড়ের শান্তি, উন্নয়ন, স্বার্থ নিশ্চিত ও প্রতিষ্ঠানটিকে জনবান্ধব করতে হলে পাহাড়ের মানুষকেই দায়িত্বে দেয়া সমীচিন।

বছরে কমপক্ষে দেড়শ কোটি টাকার বরাদ্দ পাওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড হলো দেশের অন্যতম শক্তিশালী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান। যেটি তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান এর মাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। পার্বত্য অঞ্চলের অনগ্রসর ও পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠিকে আর্থসামাজিকভাবে এগিয়ে নেয়া, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়েই এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্ষীয়াণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন,‘পার্বত্যবাসী মনে করে প্রতিষ্ঠানটিকে জনবান্ধব করতে হলে জন প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানে জন প্রতিনিধিত্ব হওয়া উচিৎ’।

শিক্ষাবিদ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন,‘মনোনীত ব্যক্তিদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নেই। পাহাড়ে সব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন দরকার। বর্তমান চেয়ারম্যানের আমলে পাহাড়ে কিছুটা হলেও দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখা গেছে। এটি অব্যাহত রাখতে যোগ্য ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান করতে হবে’।

আওয়ামীলীগ নেতা ও রাঙামাটির আইনজীবী অ্যাডভোকেট বিপ্লব চাকমা বলেন,‘জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিকদের জন্য উন্নয়ন বোর্ড। আমলারা দায়িত্বে থাকলে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীরা ঘেঁষতে পারে না। আমলাদের জনসম্পৃক্ততা নেই। তাই জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিকদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া এখন সময়ের দাবি’।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত প্রভাংশু ত্রিপুরা জানান, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠানটি ৭৫ সালে গঠনের কথা থাকলেও ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট স্বপরিবারে শহীদ হবার কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে ১৯৭৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। অথচ জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি জনপ্রতিনিধির অভাববোধ করে আসছে। যা মঙ্গলজনক নয়।’

খাগড়াছড়ি জেলা বার এসোসিয়েশনের সভাপতি এডভোকেট আশুতোষ চাকমা বলেন, জনগুরুত্বপূর্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড’ এর শীর্ষ পদে আমলা থাকায় রাজনৈতিক সরকারের দ্বারা যেভাবে জনস্বার্থ সংরক্ষণ করে উন্নয়ন হওয়ার কথা; তাও প্রতিষ্ঠানটি পুরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাতে করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পুরন হচ্ছেনা বললেই চলে।

খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. সুধীন কুমার চাকমা মনে করেন, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি’র দায়িত্ব পাওয়া যেমন জরুরী তেমনি স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়াও বাঞ্চনীয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানটিকে জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে আগামীতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে দেওয়ার দাবী জানিয়েছেন খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র নির্মলেন্দু চৌধুরী।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।