পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায় কয়েকদিন ধরে জেঁকে বসেছে তীব্র শৈত্য প্রবাহ। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সূর্যের দেখা মিলছে অনেক দেরিতে, কখনো আবার সারাদিনই আড়ালে থাকছে। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
শীতের কুয়াশা কাটাতে অনেকে আগুন জ্বালিয়ে তার উষ্ণতায় পোহাচ্ছেন। আগুনের চারপাশে একত্র হয়ে গল্পের আড্ডা দিচ্ছেন, শীতের সকাল-বিকেলে গল্পের জটলা যেন আরও জমে উঠছে। সেই সঙ্গে পিঠাপুলি, নারিকেল-পিঠা খেতে খেতে স্থানীয়রা আড্ডায় মগ্ন। শীতের এই মুহূর্তে আগুন, গল্প ও পিঠার মিলন এক অনন্য সঙ্গম সৃষ্টি করছে।
শীতের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন পাহাড়ি এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ, দিনমজুর, কৃষক ও শিশুরা। কনকনে ঠান্ডায় কাজে যেতে পারছেন না অনেকেই। সকাল বেলায় বাজার, স্কুল-কলেজ ও সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে সময় মতো উপস্থিতি কষ্টকর হচ্ছে। গত ১ জানুয়ারি বই বিতরণে অনেক কচিকাঁচা বই নিতে আসে নি তাদের অভিভাবকদের বই গ্রহণ করতে দেখা গেছে।
শৈত্য প্রবাহের প্রভাবে কৃষিখাতেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। বোরো ধানের বীজতলা, শাকসবজি ও অন্যান্য শীতকালীন ফসল কোল্ড ইনজুরির ঝুঁকিতে পড়েছে। কৃষকরা জানান, কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া শীতের প্রভাবে মাটিরাঙ্গার হাট-বাজারেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। সকালবেলায় ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি কম। ঠান্ডার কারণে শ্রমজীবী মানুষের কাজের সময় ও আয় দুটোই কমে যাচ্ছে। শিতের দিন ছোট এ অজুহাতে অনেকে দিনমজুর কে কাজে নিচ্ছেন না গৃহস্থ।
এদিকে শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে সর্দি-কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর চাপ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মিল্টন ত্রিপুরা জানান, শৈত্যপ্রবাহের কারণে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে প্রতিদিনই শিশু ও বয়স্ক রোগীরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসছেন।

তিনি আরও বলেন, তীব্র শীত ও কুয়াশার প্রভাবে শিশু, বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ অবস্থায় শীত থেকে সুরক্ষিত থাকতে গরম কাপড় ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। শীতের প্রকোপ বাড়ায় সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি।
স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আগামী কয়েকদিন পাহাড়ি এলাকায় শীতের প্রকোপ অব্যাহত থাকতে পারে। শৈত্য প্রবাহ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অসহায় ও দুস্থ মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণের পাশাপাশি জনসাধারণকে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মাটিরাঙ্গা উপজেলা প্রশাসন, মাটিরাঙ্গা জোন, বিএনপি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে শীতে মানুষদের তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেওয়ার জন্য বারবার শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। তবুও বিশাল জনসংখ্যার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় শীতবস্ত্রের প্রাপ্যতা চাহিদার তুলনায় এখনও অপ্রতুল, এবং অনেক পরিবার শীতে পর্যাপ্ত সুরক্ষা পাচ্ছে না।
দিনমজুর আব্দুর রহিম তার দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “শীতের তীব্রতায় আমাদের হাত-পা প্রায় অবশ হয়ে যায়। সকালে ঠিকমতো কাজে বের হওয়া সম্ভব হয় না, তবুও কাজ না করলে ঘরে খাবারের জোগান হয় না। আমাদের মতো দিনমজুরদের কষ্ট, শ্রম আর দুর্দশা কোনো দিন চলতি হিসাবের মধ্যে পড়ে না। কেউ বুঝে না আমরা এই কঠিন শীতে কতোটা সংগ্রাম করছি। প্রতিদিনের জীবন একধরনের যুদ্ধের মতো শরীরের দুর্বলতা ও তীব্র ঠান্ডার মধ্যে সংসারের তাগিদ মেটাতে চলতে হয়।”
কৃষক আমির হোসেন আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “কুয়াশার তীব্রতায় আমাদের শিম ও টমেটোর ফুল ঝরে যাচ্ছে। রোদ ঠিকমতো না উঠলে ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আমরা অনেক ঋণ নিয়ে চাষ করেছি, এখন পরিস্থিতি দেখে বুঝতে পারছি না পরের করণীয় কী হবে। প্রতিদিনের পরিশ্রম, সময় ও অর্থ সবই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই শীত আমাদের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, এবং আমাদের মতো ছোট কৃষকরা এই ধরনের দুর্যোগে সহায়তার জন্য আকুল।”
স্থানীয় অটোচালক মো. রহিম বলেন, তীব্র শীত ও কুয়াশার কারণে ভোরে গাড়ি বের করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। কুয়াশায় রাস্তা স্পষ্ট দেখা যায় না, যাত্রীও আগের তুলনায় কম। শীতের মধ্যে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাতে গিয়ে শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তবুও সংসারের তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই রাস্তায় নামতে হচ্ছে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সবুজ আলী বলেন, চলমান তীব্র শৈত্যপ্রবাহ পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষক ও তাদের পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অতিরিক্ত শীত ও কুয়াশার কারণে মাঠে ফসল তোলা ব্যাহত হচ্ছে, একই সঙ্গে উৎপাদিত পণ্য বাজারে পরিবহন করাও হয়ে উঠছে জটিল। এতে কৃষি কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে এবং কৃষকরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।



