পাহাড়ের জনপ্রিয় খাবার মহ্ই

Bandarban-9পার্বত্য জেলার মারমা আদিবাসীদের একটি জনপ্রিয় সুস্বাদু খাবারের নাম মহ্ই। যাকে বাঙালীরা বাঁশ কোড়ল বললেও ত্রিপুরা সম্প্রদায় বলে মেওয়া, অন্যদিকে চাকমা ভাষায় একে বলা হয় বাচ্ছুরি। মূলত বাঁশের গোড়ার কচি নরম অংশকে বলা হয় মহ্ই বা বাঁশকোড়ল।
পার্বত্যাঞ্চলের প্রায় সব স্থানেই মেলে এ সবজি। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে এটি এখন জনপ্রিয় একটি খাবারের নাম। বছরের মে-আগষ্ট মাস পর্যন্ত এ সবজির ভরা মৌসুম বলা যায়। এ অঞ্চলে মুলি বাঁশ, ডলু বাঁশ, মিতিঙ্গ্যা বাঁশ, ফারুয়া বাঁশ, বাজ্জে বাঁশ, কালিছুরি বাঁশসহ বেশ কয়েক প্রজাতির বাঁশকোড়ল পাওয়া যায়। বর্ষার শুরুতে বৃষ্টির পানিতে মাটি নরম হলে এটি বাড়তে শুরু করে। মাটি হতে ৪-৫ ইঞ্চি গজিয়ে উঠলে এটি খাওয়ার উপযোগি হয়।
বিভিন্ন জাতের বাশঁকোড়ল স্বাদে ভিন্ন। তবে মুলি বাঁশকোড়ল সবচেয়ে সুস্বাদু বলে বেশ নামডাক রয়েছে। সবার কাছে এটি অত্যাধিক জনপ্রিয় বলে বাজারে এর চাহিদা ও দামও কিছুটা বেশি। বর্ষার শুরুতেই বাঁশকোড়ল বাজারে আসে। প্রত্যাহিক বিকেলে বান্দরবান জেলা শহরের মার্মা বাজারে আদিবাসী ব্যবসায়ীরা বাঁশকোড়ল নিয়ে আসে বিক্রির উদ্দেশ্যে। এসময় বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠির ক্রেতারা ভিড় জমান এ জনপ্রিয় সবজি কেনার উদ্দেশ্যে। প্রতি কেজি বাঁশকোড়ল পাওয়া যায় ৮০-১০০ টাকার মধ্যে। তবে চাহিদা অনুযায়ী এ সবজির দাম কম বেশি হয়ে থাকে।
এদিকে পারিবারিক খাবারের চাহিদা মিটিয়ে স্থানীয় হোটেল রেষ্টুরেন্টগুলোতেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে এ সবজি। পার্বত্যাঞ্চলে ঘুরতে আসা পর্যটকদেরও আকর্ষণ থাকে বাঁশ কোড়লের প্রতি। এ সবজি বিক্রি করে সাবলম্বী হচ্ছে পাহাড়ের বিভিন্ন দূর্গম পল্লীর বহু মানুষ। দূর দূরান্ত থেকে মাথায় থ্রুং বেধে বাজারে আনা বাঁশ কোড়লের পসরা সাজিয়ে বসে আদিবাসী নারীরা।
মার্মা বাজারে বাঁশকোড়ল বিক্রি করতে আসা আদিবাসী নারী মলি প্রু মার্মা জানান, প্রাকৃতিক কারণে বাঁশের মড়কে উজাড় হয়ে যাচ্ছে বাঁশবন, ফলে চাহিদার তুলনায় বাঁশ কোড়ল এখন অপ্রতুল। ধীরে ধীরে জনপ্রিয় এ সবজির উৎপাদন কমে যাচ্ছে। সরকারি ভাবে বাঁশবন রক্ষণাবেক্ষন করা গেলে এটি রক্ষা করা সম্ভব। অন্যথায় একসময় পার্বত্যাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাবে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ।
বান্দরবান সদরের ছাইংগ্যা, ডলুপাড়া, বাঘমারা, হানসামা পাড়া, তালুকদার পাড়া থেকে বাঁশকোড়ল বিক্রি করতে আসা শান্তি রাণী চাকমা, প্রভাতি তঞ্চঙ্গ্যাসহ কয়েকজন আদিবাসী ব্যবসায়ী জানান, তারা প্রতি হাটবারে বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রায় ২শ আটি বাঁশকোড়ল বাজারে নিয়ে আসেন। প্রতি আটি ৮০-১০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়, এ সবজি বিক্রির উপার্জিত অর্থ দিয়েই সংসার চলে। তিনি আরো জানান, আগে বাড়ির আশ পাশেই এ সবজি পাওয়া যেত এখন এ সবজি জোগাড় করতে দূর্গম পাহাড়ে যেতে হয়, যা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
Bandarban-8স্থানীয় আদিবাসী গবেষক সিংইয়ং ম্রো জানান, বান্দরবানে কয়েক প্রজাতির মূল্যবান বাঁশ জন্মায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ডলু, কাতি, মিতিঙ্গা, মুলি, কালী ও ছোটিয়া। মূলত বছরের জুন-আগস্ট মাসে বর্ষা মৌসুমে বাঁশের বংশ বৃদ্ধি হয়। এসময় পাহাড়ের গায়ে মাটি ভেদ করে উঠতে শুরু করে কোড়ল। এসময় পাহাড়িরা এটি সংগ্রহ করে বাজারজাত করতে শুরু করে।
স্যুপ, মুন্ডি, মাংস দিয়ে রান্না ও ভাজি করে খাওয়া যায় সুস্বাদু এ সবজি। প্রত্যেক হাটবারে অনেক বড় পরিসরে বিক্রি হয় এ বাঁশকোড়ল। তবে দিন দিন এর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিবছর বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলায় কোটি টাকার বাঁশ উৎপাদন কমে যাচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এ কারণে স¤প্রতি পার্বত্যাঞ্চলে পর্যাপ্ত বাঁশ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাঁশবন রক্ষণাবেক্ষনের স্বার্থে জুন-আগষ্ট পর্যন্ত বাঁশকোড়ল আহরণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন বিভাগ।
বান্দরবান মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহবুবুল ইসলাম জানান, পাহাড়ে গাছপালা কমে যাওয়ায় পানির স্তর অনেকটা নিচে নেমে গেছে, যার ফলে সব পাহাড়ে বাঁশ উৎপাদন তেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তাছাড়া অপরিকল্পিত জুম চাষ, নির্বিচারে মাটি ও পাথর উত্তোলনের ফলে ঝিড়ি-ঝরনা শুকিয়ে যাওয়া সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে ধীরে ধীরে বাঁশ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।
তাই পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়ে প্রাকৃতিক ভাবে জন্মানো এ বাঁশ সংরক্ষণে সরকারি ভাবে উদ্যোগ নেওয়া না হলে খুব অল্প সময়েই বাঁশবন উজাড় হওয়ার আশঙ্কা বলে জানান এ কর্মকর্তা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা পার্বত্য এলাকায় উৎপাদিত এই বাঁশকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহারের সুষ্ট প্রয়োগের ফলে এই সম্পদ এলাকার অর্থনৈতিক পরিবর্তনে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।