পাহাড়ের বর্ষবরণে ঘিলা খেলা

দীর্ঘদিন পরে পাহাড়ে লেগেছে আনন্দের ধুম। পাহাড়ের বসবাসরত ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই, চাকমাদের বিঝু ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু উৎসবে মুখরিত পাহাড়ের জনপদ। পাহাড়ের এই ৪ সম্প্রদায়ের মানুষের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান এটি। এই বিঝু/বিষুকে তিনটি নামে অভিহিত করা হয়। ফুল বিষু, মূল বিষু (চৈত্র সংক্রান্তির শেষ দুদিন) ও গুজ্জা-পূজ্যা দিন বা নতুন বছর।

বিষু উৎসবকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে তঞ্চঙ্গ্যাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও প্রাচীন খেলা “ঘিলা খেলা”। ঘিলা তঞ্চঙ্গ্যাদের মতে একটি পবিত্র ফল। এটি একটি জঙ্গলি লতায় জন্মানো এক প্রকার সীম জাতীয় লতার বীজ। যার বিজ্ঞানী নাম Entada Rheedii, Family: Fabaceae. Entada Rheedii সাধারণত আফ্রিকান ড্রিম হার্ব বা snuff box sea bean নামে এবং জ্যামাইকার Cacoon Vine হিসেবে পরিচিত।

তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, ঘিলার লতায় ফুল থেকে বীজ (গোটা) জন্মালেও এর ফুল পবিত্র দেবংশি (স্বর্গীয়) বস্তু হওয়ায় সাধারণ মানুষ ঘিলা ফুলের দেখা পান না। শুধু যাঁরা মহামানব হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন তারা এ ফুলের দেখা পান।

ফুলের পরিবর্তে ঘিলাকে পবিত্র হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। পাহাড়ের অনেকে ঘরের দরজায় ঘিলা ঝুলিয়ে রাখেন। তাদের বিশ্বাস, বাড়ির দরজায় ঘিলা ঝুলিয়ে রাখলে অপদেবতা থেকে মুক্ত থাকা যায়। ঘিলাখেলা তঞ্চঙ্গ্যাদের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি খেলা। নারী-পুরুষ উভয়েই এই খেলায় অংশ নেন।

বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা ঘিলা খেলা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট উদযাপন কমিটি ২০১৯ এর সদস্য সচিব উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ঘিলা খেলা তঞ্চঙ্গ্যাদের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি খেলা। ২০০৯ সাল থেকে তঞ্চঙ্গ্যাদের ঘিলা খেলা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছে। ২০১৯ সালে পরে করোনা মহামারীর কারণে এই গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট বন্ধ রয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই আগামী বছর থেকে টুর্নামেন্ট শুরু হবে।

তিনি আরো জানান, গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট বন্ধ থাকলে এই বছরে এলাকা ভিত্তিক আন্ত ঘরোয়া ঘিলা খেলা আয়োজন চলছে পাড়ায় পাড়ায়। তবে, ১৪ এপ্রিল তঞ্চঙ্গ্যাদের র ্যালি আয়োজন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্ট ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সিনিয়র সভাপতি আনন্দ তঞ্চঙ্গ্যা জানান, পাহাড়ের এই উৎসব মুখর দিনে তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা তাদের ব্যবহৃত অলংকার কানে রাজ্জু ও ঝুংকা, কবজিতে বাঘোর, কুচিখাড়ু, বাহুতে তাজজুর, গলায় চন্দ্রহার, হাঁসুলী, সিকছড়া প্রভৃতি ব্যবহার করে থাকেন। এসব অলংকার পরে যুবতী নারীরা ঘিলাখেলায় মেতে উঠেন বিষু উৎসবে।

তিনি আরো জানান, বিষু উপলক্ষে ঘিলা খেলা ব্যতীত নারেং খেলা, কুমভাঙা খেলা, শামুক খেলা, চাঁড়া খেলা, গয়াং খেলা, কুমির খেলা, দু দু খেলা, ভূত খেলা, বুইজ্জ্যাবুড়ি খেলাসহ ইত্যাদি খেলার আয়োজন করা হয় পাড়ায় পাড়ায়।

বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্ট ফোরাম এর সভাপতি অনিক তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, বাংলাদেশে বসবাসরত পাহাড়ের একটি সম্প্রদায়ের নাম “তঞ্চঙ্গ্যা”। দীর্ঘদিন ধরে সামগ্রিকভাবে ঘিলা খেলা আয়োজন করা হলেও গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট এই বছর করোনা মহামারীর কারণে পিছিয়ে রয়েছে। তবে আগামী বছর শুরু হবে।

উল্লেখ যে, বাংলাদেশে বসবাসরত তঞ্চঙ্গ্যাদের মোট ১২টি গোষ্টী আছে, এদেরকে বলা হয় গছা। এদের নাম- মো গছা, কার্বুয়া গছা, ধন্যা গছা, মংলা গছা, মলং গছা, লাং গছা., অঙ্য গছা, লাপোস্যা গছা, ওয়া গছা, তাশ্বী গছা ও মুলিমা গছা। এদের ভিতর ৭টি গছা ( মো গছা, কার্বুয়া গছা, ধন্যা গছা, মংলা গছা, মলং গছা, লাং গছা., অঙ্য গছা) বাংলাদেশে বাস করে। অবশিষ্ট ৫টি গছা একসময় বাংলাদেশে ছিল, পরে আরাকানে চলে যায়।

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের মানুষজন। এই ৩ পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙ্গুনিয়ার রইস্যাবিলি, সাদিক্যাবিলি, বাঁশবুনিয়া, হারকিলা বিলি কাউখালী উপজেলার বেতছড়ি, বগাপাড়া, মিতিঙ্গ্যাছড়ি, ঘাগড়া, কাপ্তাই উপজেলার বরইছড়ি দেবতাছড়ি, সাপছড়ি, হাতিমারা, ওয়াগ্গা, বটতলী, ঘাগড়া বাজার হতে বারঘোনিয়া, মানিকছড়ি এলাকা, রাজভিলা ও রমতিয়া বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি, আলীকদম, রুমা, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়ও রয়েছে তঞ্চঙ্গ্যাদের বসবাস। রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলায় রয়েছে বিপুলসংখ্যক তঞ্চঙ্গ্যা।

পার্বত্য জেলা ব্যতীতও কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার তেলখোলা, মোছারখোলা, মাদারবনিয়া টেকনাফ উপজেলার উয়েখোলা, লম্বাঘোনা, হরিখোলাসহ কয়েকটি এলাকায় তঞ্চঙ্গ্যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করলেও বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে এলাকা ভেদে তারা একত্রিত হয়ে ঘিলা খেলাসহ নানা আচার অনুষ্ঠানে মেতে উঠেন।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।