পাহাড়ে আলো ছড়াচ্ছে পাড়া কেন্দ্র

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে পাড়া কেন্দ্র
ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং নৃ-বৈচিত্রমন্ডিত প্রাকৃতিক লীলাভূমি এ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। এখানকার অধিকাংশ মানুষ দুর্গম পার্বত্য এলাকায় বসবাস করে যেখানে মৌলিক সেবাসমূহ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো তুলনামূলকভাবে দুরূহ ও কষ্টসাধ্য। এ এলাকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। সঙ্গত কারণেই এখানে মাথাপিছু আয় এবং ক্যালরী গ্রহণের হার জাতীয় হারের চেয়ে নিম্নে। স্বাস্থ্য সেবার প্রাপ্যতা, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার, নারী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়:সুবিধা বিবেচনায় তিন পার্বত্য জেলা নিচের সারিতে অবস্থান করছে। এর প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার আর্থ-সামাজিক সূচকসমূহের উন্নয়ন; বিশেষ করে মা ও শিশুর সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার এবং ইউনিসেফের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৮৩-৮৪ সালে এ্যাকশন রিসার্চ হিসাবে শুরু হওয়া এ প্রকল্পটি ১৯৮৫-১৯৯৫ মেয়াদে প্রথম পর্যায়, ১৯৯৬-২০১১ মেয়াদে দ্বিতীয় পর্যায় এবং ২০১২-২০১৭ মেয়াদে ৩য় পর্যায় বাস্তবায়ন করা হয়।

পাড়া কেন্দ্র কি:
পাড়াকেন্দ্র হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিশু, কিশোরী ও নারীদের সেবা প্রদানের একটি কেন্দ্র। এ পাড়াকেন্দ্রটি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, সাধারণত একই ধর্ম ও সম্প্রদায়ের এবং একই ভাষাভাষী ৪০-৫০ টি পরিবারকে সেবা দেয়ার জন্য পরিচালিত একটি কেন্দ্র বা স্থান। তবে ক্ষেত্রবিশেষে একাধিক সম্প্রদায় বা কম সংখ্যক পরিবারের জন্যও একটি পাড়াকেন্দ্র থাকতে পারে। প্রকল্পের সাহায্য ও পাড়াবাসির সহযোগিতায় পাড়াকেন্দ্র তৈরি হয়। পাড়াকেন্দ্র নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে পাড়াবাসীর ভূমিকাই মুখ্য।

পাড়াকেন্দ্রে সেবাসমুহ:
ক)৩-৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রাক-শৈশব যত্ন ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দান। খ) গর্ভবতী, প্রসুতি ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সেবা ও পরামর্শ দান। গ)প্রত্যক্ষ পুষ্টি কার্যক্রম।ঘ)স্বল্পব্যয়ী ও যথোপযুক্ত জীবন নির্বাহী কৌশল ও পদ্ধতির প্রদর্শন ও প্রশিক্ষণ ।
ঙ)শিশু সুরক্ষা, শিশু অধিকার ও নারীর অধিকার বিষয়ক ধারনা প্রদান ও কম্যুনিটি সদস্যদের এসব বিষয়ে আচরণগত পরিবর্তন সাধন।চ) কম্যুনিটির হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষন।ছ)কম্যুনিটি সভা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সামাজিক কাজে ব্যবহার। স্থানীয় একজন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মী কেন্দ্রটি পরিচালনা করেন। ৭ সদস্য বিশিষ্ট পাড়াকেন্দ্র পরিচালনা কমিটি পাড়াকেন্দ্রের যাবতীয় কর্মকান্ড বাস্তবায়নে সহায়তা করেন।

পাড়াকেন্দ্র নেটওয়ার্ক :
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৌলসেবা নিশ্চিত করার জন্য সার্ভিস পয়েন্ট হিসেবে গড়ে উঠেছে পাড়াকেন্দ্র। বর্তমানে ৩ পার্বত্য জেলার ২৬টি উপজেলায় ৪০০০টি পাড়াকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। যা নিম্নে বর্ণনা করা হল।
একক সংখ্যা প্রকল্পের আওতাভুক্ত মন্তব্য
পাড়া ৪৭৩৪ ৩৫১৯ (৭৪.৩%) ১। প্রকল্পের আওতাবহির্ভুত পাড়া সংখ্যা ১,২১৫ টি (২৫.৭%)।
২। ৭০% পাড়াকেন্দ্র প্রত্যন্ত এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি অধ্যুষিত এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে।
ইউনিয়ন ১১৯ ১১৮
উপজেলা ২৬ ২৬
জেলা ৩ ৩
জনসংখ্যা ১৬৬৩২১৪ ৮৫৯৭৮৪ (৫৩.৭৪%)

উল্লেখযোগ্য অর্জন :

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে পাড়া কেন্দ্র

প্রাক শৈশব,প্রাক-প্রাথমিক ও মাতৃভাষা ভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা :
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে, যাদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। পাড়াকেন্দ্রে আসা শিশুদের অনেকেরই মাতৃভাষা বাংলা নয় এবং পাড়াকেন্দ্রে আসা শুরু করার সময় তাদের অনেকেরই বাংলা জ্ঞান হয় খুবই সীমিত বা একেবারেই নেই। এমন শিশুদের বেলায় যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বাংলার ব্যবহার মোটেও বাস্তবসম্মত বা শিশু বান্ধব নয়। এ প্রেক্ষিতে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাড়াকর্মীরা স্থানীয় ভাবে মাতৃভাষার ব্যবহার করে আসছেন। তবে এতদিন এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত কোন নির্দেশনা দেওয়া ছিল না। এ ঘাটতি পূরনের জন্য এবং বিভিন্ন ভাষার জ্ঞান দক্ষতা অর্জনের জন্য ২০১৪ সাল হতে পাড়াকেন্দ্রসমূহে ‘‘মাতৃভাষা-ভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা’’ প্রচলন করা হয়েছে।
৪০০০ পাড়াকেন্দ্রে ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য পার্বত্যাঞ্চলের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ভাষাগত বৈচিত্র্য বিবেচনায় রেখে একটি কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া ৫-৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জাতীয় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলাম অনুসরণ করে পাঠদান করা হচ্ছে। পাড়াকেন্দ্রে শিক্ষা লাভের পর শিশুরা নিকটস্থ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। পাড়াকেন্দ্রের মাধ্যমে এ পর্যন্ত দুই লক্ষাধিক শিশু প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।

আবাসিক বিদ্যালয় ; ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির জন্য শিক্ষা সুবিধা সম্প্রসারণ :
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড একটি বিশেষ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় এ পর্যন্ত ৪টি আবাসিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এ কর্মসূচীর অন্যতম লক্ষ্য হল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসরত দারিদ্র্য পীড়িত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের সন্তানদের আবাসিক ও অন্যান্য সুবিধাদি প্রদান করে আনুষ্ঠানিক সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার করা। আবাসিক বিদ্যালয়সমূহের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে আবাসন, খাবার, পোষাক-পরিচ্ছদ ও শিক্ষা উপকরণ ইত্যাদি সুবিধাদি প্রদান করা হয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত পৃথক পৃথক পরিচালনা কমিটি রয়েছে। প্রকল্প পরিচালক/উপজেলা নির্বাহী অফিসার এর নেতৃত্বে স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, সরকারী কর্মকর্তা, অভিভাবক প্রতিনিধি ও শিক্ষক প্রতিনিধি সমন্বয়ে এসব কমিটি গঠিত। প্রকল্প ছকের বরাদ্ধের আলোকে প্রতিবছর বিদ্যালয়সমূহের জন্য পৃথক পৃথক বাজেট প্রণয়ন করা হয়। বিদ্যালয়সমূহের আবর্তক খাতে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। সরকারী অনুদান খাত থেকে এ ব্যয় নির্বাহ করা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত অনগ্রসর সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার ও আধুনিক জীবন ধারা প্রবর্তনে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আবাসিক বিদ্যালয়সমূহ অত্যন্ত ইতিবাচক ও সুদূর প্রসারী ভূমিকা রাখছে।

রক্তস্বল্পতা ; এক নিরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম:
আইসিডিপি প্রকল্পের উদ্দীষ্ট জনগোষ্ঠির শিশু, কিশোরী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা’দের মধ্যে রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে একটি বিশেষ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কর্মসূচীর আওতায় উদ্দীষ্ট জনগোষ্ঠির গর্ভবতী মহিলাদের পূর্ণ গর্ভকালে প্রতিদিন ১টি আয়রন বড়ি, বুকের দুধ দানকারী মা’ দের প্রসবের ৩ মাস পর্যন্ত প্রতিদিন ১টি আয়রন বড়ি, নববিবাহিতা মাহিলাদের গর্ভবর্তী হওয়া পর্যন্ত সপ্তাহে ২টি আয়রন বড়ি এবং ১৩-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের সপ্তাহে ২টি আয়রন বড়ি সেবনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়াও কিশোরীদের ৬ মাস অন্তর ১টি কৃমি নাশক টেবলেট খাওয়ানো হয়। অন্যদিকে ৬-২৩ মাস বয়সী শিশুদের ১ গ্রাম ওজনের ভিটামিন মিনারেল পাউডার দৈনন্দিন খাবারের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে। প্রতিদিন একটি শিশুর শরীরে যে পরিমাণ আয়রন দরকার ভিটামিন মিনারেল পাউডার সে পরিমাণ আয়রন শিশুর শরীরে সরবরাহ করে থাকে।

আয়রন বড়ি ও ভিটামিন মিনারেল পাউডার সেবনের পাশাপাশি আয়রন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা ব্যবহার, খাবার আগে, পায়খানা থেকে এসে ও বাচ্চাদের শৌচকর্ম শেষে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, জুতা/স্যান্ডেল ব্যবহার, মশারী ব্যবহার, ম্যালেরিয়ার দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ, ৬ মাস পর্যন্ত শিশুদের শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো এবং ৬ মাস পূর্ণ হলে পরিপুরক খাদ্য প্রদান, ডায়রিয়া হলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে উদ্ধুদ্ধ করা হচ্ছে।

কম্যুনিটি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়ন:
এলসিবিসিই কর্মসূচীর আওতায় পার্বত্য জেলাসমূহের জেলা, উপজেলা ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঘওখএ অংশগ্রহণমূলক উর্ধ্বমুখী পরিকল্পনা পরিবীক্ষণ, বিকেন্দ্রীকরণ এবং উন্নয়নের উপর প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের পাড়াকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটি, ওয়ার্ড সমন্বয় কমিটি, ইউনিয়ন সমন্বয় কমিটি , উপজেলা সমন্বয় কমিটি, জেলা সমন্বয় কমিটি শিশুদের অবস্থা/প্রতিবন্ধকতা বিশ্লেষনে লেবেল থ্রী মনিটরিং ব্যবহার ও জেলা পর্যায়ে শিশুদের জন্য পরিকল্পনা ও পরিবীক্ষণ বিষয় সমুহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের ৫১ জন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার ৯ জন কর্মকর্তাকে এনআইএলজির আগারগাঁওস্থ এনআইএলজি ভবনে তিন দিন ব্যাপী প্রশিক্ষন প্রদান করা হয়েছে। তিন জেলায় পৃথক পৃথকভাবে সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের সাথে এনআইএলজির তত্ত¡াবধানে কর্মশালা সম্পন্ন করা হয়েছে।

উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য আইসিডিপি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে উপজেলা ও ইউনিয়ন প্রশিক্ষণ মড্যুল তৈরী করা হয়েছে। উক্ত মড্যুলের আলোকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।

সুচিতা ; জীবনের জন্য:
আইসিডিপি, প্রকল্পভুক্ত পরিবারের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। এ কর্মসূচীর উদ্দেশ্য হলো বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য উপযুক্ততা অনুসারে পানীয় জলের উৎস স্থাপন, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য অভ্যাসের মান উন্নয়ন, আচরনের স্থায়ী পরিবর্তন ঘটানো এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা।

কর্মসূচীর আওতায় ৪০০০ পাড়াকেন্দ্রে পাড়া এ্যাকশন প্ল্যান তৈরী করা হয়েছে। এটি নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি এবং পরিবেশের উন্নয়নের জন্য পাড়াবাসী কর্তৃক গৃহীত কাজ কর্ম করার পদ্ধতি। বাস্তবায়নের পাশাপাশি তা মনিটর করার বিষয়টিও পাড়া এ্যাকশন প্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাড়া এ্যাকশন প্ল্যানের মাধ্যমে কর্মসূচীর সাথে উপকারভোগী জনগনের অংশীদারিত্ব, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদব্যবহার এবং জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টি করা হয়।

এ কর্মসূচীর অধীনে পাড়াকর্মী, সিনিয়র পাড়াকমী ও পিসিএমসি সদস্যদের প্রশিক্ষণ, কম্যুনিটির চাহিদা অনুসারে পানীয় জলের উৎস স্থাপন, অতি দরিদ্রদের স্যানিটেশন সুবিধা উন্নয়নের জন্য স্বল্প মূল্যের লেট্রিন সরবরাহ, নলকুপ কেয়ার টেকার প্রশিক্ষন, পরীক্ষামূলক ইকোলেট্রিন স্থাপন, পাড়াকেন্দ্রে হ্যান্ড ওয়াশিং স্টেশন স্থাপন ইত্যাদি কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে পাড়া কেন্দ্র

শিশু সুরক্ষা ; একটি অবশ্য পালনীয় কর্মোদ্যোগ:
শিশুর জন্ম নিবন্ধন একটি অতি আবশ্যকীয় কর্মকান্ড। পাড়াকর্মীগন তার আওতাভুক্ত পরিবার সমুহের ১৮ বছরের নীচের সকল শিশুর জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করতে কাজ করছে। পাড়াকেন্দ্রের ৩-৬ বছর বয়সী শিশুদের ৯২ শতাংশ এবং অনুর্ধ ১৮ বছর বয়সী শিশুদের ৭৮ শতাংশের জন্ম ইতোমধ্যে নিবন্ধিত হয়েছে। এছাড়াও কিশোর-কিশোরীদের দলগঠন, জীবন দক্ষতা শিক্ষা, বৃত্তি প্রদান, খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পাড়াকেন্দ্রে আয়োজন করা হয়। এ পর্যন্ত ১৫৪০টি কিশোর-কিশোরী দলগঠন করা হয়েছে; ৮৫ জন দলনেতাকে জীবন দক্ষতা উন্নয়ন মূলক শিক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং ২৩৭ জন কিশোর-কিশোরীকে উদ্ভাবনী কর্মকান্ডের সহায়তাকল্পে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে।

উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ :
শিশুর শারীরিক শাস্তি নিরোধ, বাল্য বিবাহ রোধ, শিশু শ্রম বন্ধ, স্বাস্থ্য সম্মত অভ্যাস গড়ে তোলা, শিশু ও নারী অধিকার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য পাড়াকেন্দ্রে নানা ধরনের যোগাযোগ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নিয়মিত উঠান বৈঠক আয়োজন, পাড়াকর্মী কর্তৃক পরিবার পরিদর্শন, সচেতনতামূলক সিনেমা, নাটক ও লোকসঙ্গীতের অনুষ্ঠান আয়োজন করা। এছাড়া ও পাড়াকেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সদস্যবৃন্দ, স্থানীয় ধর্মীয় গুরু ও ঐহিত্যবাহী নেতাদের কম্যুনিটি উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পাশাপাশি শিশু ও নারীর অধিকার বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপন ও স্থানীয় ভাষায় বিভিন্ন ওঊঈ উপকরণ তৈরী এবং বেতারের মাধ্যমে বার্তা প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে পার্বত্য জীবন ধারা :
সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কর্মকান্ড বাস্তবায়নের ফলে প্রকল্পভুক্ত এলাকায় জনগনের সামাজিক সূচকসমূহের ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেমন- গর্ভবতী মহিলাদের টিকা গ্রহণ হার ২৭ শতাংশ থেকে ৭৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, প্রসূতি মায়ের ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ হার ১ শতাংশ থেকে ৯৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, কিশোরী ও স্তন্যদানকারী মা’দের আয়রন বড়ি সেবন হার শূণ্য থেকে ৯৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার ২৩ শতাংশ থেকে ৫৯ শতাংশ এবং বিশুদ্ধ পানি পান ৩০% থেকে ৭৪% উন্নীত হয়েছে। এছাড়াও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হার ২২ শতাংশ থেকে ৯৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং জন্ম নিবন্ধন হার ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তি হার জাতীয় হারের তুলনায় ১৩.৩৩ শতাংশ বেশী। পার্বত্যাঞ্চলে ১৪০টি কম্যুনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামীন জনগোষ্ঠীর এক তৃতীয়াংশের আয়রন সাপ্লিমেন্টেশান করা হচ্ছে। বাকী দুই তৃতীয়াংশ আইসিডিপির পাড়াকেন্দ্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।৪৪০০ জনের একটি প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী তৈরী করা হয়েছে যারা সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা পালনে সক্ষম। এদের ৯৫% মহিলা।কম্যুনিটির চাহিদার ভিত্তিতে প্রত্যেক পাড়ার জন্য নারী ও শিশুর উন্নয়নে একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়ন করা হচ্ছে।পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও পার্বত্য জেলা পরিষদে অংশীদায়িত্ব প্রকল্প বাস্তবায়নে গতিশীলতা বৃদ্ধি করেছে এবং প্রকল্পের স্থায়ীত্ব অর্জনের লক্ষ্যে দৃঢ় পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। পাড়ার অধিবাসীগন পাড়াকেন্দ্র ব্যবস্থাপনার জন্য সহায়ক তহবিল গঠন করেছে। শিশু ও নারী উন্নয়নে স্থানীয় সম্পদ সমাবেশ একটি আশাপ্রদ ঘটনা।
এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন পকল্পের প্রোগ্রাম অফিসার মো: জসিম উদ্দিন বলেন, সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প পার্বত্যবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে মূল্যবান অবদান রেখেছে। জন্ম নিবন্ধন, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতি উন্নয়ন, পানি ও পয়: ব্যবস্থার উন্নয়ন ও শিক্ষা ক্ষেত্রে পার্বত্যাঞ্চলে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যন তরুন কান্তি ঘোষ বলেন, সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রেখেছে। তিনি বলেন,এ প্রকল্পের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, শিশু শিক্ষা, পুষ্টি, পানি ও পয়:ব্যবস্থা ও হাইজিন অভ্যাস গড়ে উঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বর্তমানে বোর্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে সোশ্যাল সিকিউরিটি সার্ভিস সিএইচটি নামে একটি প্রকল্প আগামী সাড়ে তিন বছর মেয়াদে কাজ করার জন্য হাতে নেয়া হয়েছে।তিনি জানান এ প্রকল্পটি উন্নয়ন বোর্ড এবং ইউনিসেফ এর যৌথ উদ্যেগে পরিচালনা করা হবে।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।