পাহাড় ধসে রাঙামাটিতে মৃতের সংখ্যা ৭৫ জনে : নিখোঁজ বেশ কয়েকজন, আহত শতাধিক

রাঙামাটিতে পাহাড় ধস
টানা দুদিনের বর্ষনে রাঙামাটিতে ব্যাপক পাহাড় ধসে ২ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৫ জন মানুষ নিহত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে বেশ কয়েক জন। আহত হয়েছে প্রায় শতাধিক। মঙ্গলবার রাঙামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই ও বিলাইছড়ি উপজেলায় পাহাড় ধসে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, সেনা বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আবু শাহেদ চৌধুরী ৫৮জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এটি রাঙামাটির ইতিহাসে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধ্বস। এদিকে, অনেকে মাটির নীচে চাপা পড়ে থাকায় উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, রাঙামাটি সদরে ৩৪, কাপ্তাইয়ে ১৫, কাউখালীতে ২১, বিলাইছড়িতে ৩, জুরাছড়িতে ২ জন নিহত হয়েছেন। পাহাড় ধসে রাঙমাটি সদরের শিমুলতলী, ভেদভেদি নতুন পাড়া, ভেদভেদি যুব উন্নয়ন অফিস সংলগ্ন এলাকা ও মানিকছড়ি এলাকায় অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছে। নিহতরা হলেন ভেদভেদী এলাকার মো. সোহেলের স্ত্রী রুমা আক্তার (২৫), কন্যা নুরী আক্তার (৩), নবী হোসেনের স্ত্রী হাজেরা বেগম (৪০), জীবন চাকমার স্ত্রী শেফালী চাকমা (৩০), ছেলে অমিয় চাকমা (১), সনাতন পাড়ার লিটন মল্লিকের ছেলে আয়ুশ মল্লিক (২), স্ত্রী চুমকি মল্লিখ (২২), লিটন মল্লিক (২৮), অরুপ ত্রিপুরার ছেলে মিন্টু ত্রিপুরা (৪৫) নাম পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর মেজর মাহফুজ, ক্যাপ্টেন তানভীর, কর্পোরাল আজীজ, সৈনিক শাহিন রয়েছেন।
কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার, রাইখালী, বড়্ইছড়ি ও মুরালী পাড়ায় পাহাড়ে ধসে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে লউনুচিং মার্মা (৩০)এবং শিশু মিখিই মার্মা(১২) নাম জানা গেছে।
কাউখালী উপজেলার কাশখালী, ঘিলাছড়ি, ঘাগড়া, কলমপতি ও বেতবুনিয়ায় পাহাড় ধসে ২১জন। উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া তথ্য মতে নিহতরা হলেন- উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের জুনুমাছড়া এলাকার বাসিন্দা অমর শান্তি চাকমার মেয়ে বৈশাখী চাকমা (৭), ঘাগড়া বাজার এলাকার বাসিন্দা ছৈয়দ আলীর স্ত্রী নাছিমা বেগম (৬০), নোয়াপাড়া এলাকার মৃত মঙ্গল চাকমার স্ত্রী শোভারানী চাকমা (৫৫), কাশখালী এলাকার একই পরিবারের আব্দুল রশিদের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৬০), ছেলে মো: ইসহাক (৩৫) ও মো: মনির (২৫), ঘিলাছড়ি এলাকার মাওলানা ইসহাক এর স্ত্রী হাফিজা খাতুন (৭০), একই পরিবারের দুদু মিয়ার ছেলে দবির উদ্দিন (৮০), ও দবির উদ্দিন এর স্ত্রী খোদেজা বেগম (৭০) ও বাকছড়ি এলাকার একই পরিবারের ফুলমোহন চাকমার স্ত্রী মনি মালা চাকমা (৫৫) ও মেয়ে তিশা মনি চাকমা (১১)। বেতবুনিয়া ইউনিয়নের একই পরিবারের অংচাপ্রæ মারমার ছেলে অংচিং মারমা (৫২), অংখ্যাইচিং মারমার স্ত্রী আশেমা মারমা (৩৪), মেয়ে তেমা মারমা (১২) ও ছেলে ক্যাথোয়াইচিং মারমা (৭), ফটিকছড়ি ইউনিয়নের ধুপছড়ি গ্রামের কুজাইঅং মারমার স্ত্রী লাইপ্রæ মারমা (৪০) ও কলমপতি ইউনিয়নের সুগারমিল এলাকার দুলালের স্ত্রী অজ্ঞাত (৩০)।
বিলাইছড়ি উপজেলার কেংড়াছড়িতে পাহাড় ধসে ২জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে মোঃ শহিদ(২৮) মঞ্জু মিয়ার (৩৫)নাম পাওয়া গেছে।
জুরাছড়ি উপজেলার গন্ডিছড়া পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে চিত্রামূখি চাকমা (৫০) ও বৃষ্ণমনি চাকমা (৬) নামে দুজন নিহত হয়েছে। সেখানে আহত হয়েছে আরো ৫জন।
রাঙামাটি জোনের জোন কমান্ডার লে.কর্ণেল মো, রেদোওয়ান জানান, রাঙামাটি শহর থেকে ২ কি. মি দূরে শহরের প্রবেশমুখে মানিকছড়ি রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের পাহাড় ধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে আছে- এমন খবরের ভিত্তিতে রাঙামাটি সদর জোনের সেনাবাহিনীর একটি দল উদ্ধার কাজ চালাতে যায়। দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। এসময় অকস্মাৎ নতুন করে পাহাড় ধস শুরু হলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এঘটনায় ২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৪ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও প্রায় ১২ সেনা। এ ঘটনায় আরো এক সেনা সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। নিহতরা সকলেই উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত ছিলেন বলে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে ২ সেনা কর্মকর্তা হলেন, মেজর মাহফুজ (৪৪ লং কোর্স) ও ক্যাপ্টেন তানভির (৬৪ লং কোর্স)। আহতরা সকলে মানিকছড়ি রিজিয়ন সিএমএইচে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এরা হচ্ছেন সৈনিক আজমল, মামুন, ফিরোজ, মোজাম্মেল ও সেলিম। তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা পাঠানো হয়েছে।
রাঙামাটি সিভিল সার্জন ডাঃ শহীদ তালুকদার জানান, এ পর্যন্ত রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ১৫ জনের লাশ আনা হয়েছে। ঘটনাস্থলে ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ সদস্যরা। পাহাড় ধসের কারণে সকাল থেকেই রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহা সড়ক, কাপ্তাই-চট্টগ্রাম, রাঙামাটি-রাজস্থলী-বান্দরবান, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এদিকে পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনায় গতকাল বিকেলে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোঃ মানজারুল মান্নানের সভাপতিত্বে সভায় জেলা পরিষদ, পুলিশ, সেনবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস সহ উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় থেকে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে নগদ ২০ হাজার ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার নগদ টাকা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ২০ কেজি চাল ত্রান সহায়তার দেয়া ঘোষণা দেয়া হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে জেলা প্রশাসন শহরে মাইকিং করা হয়েছে। পাহাড়ে ঢালুতে বসবাসকারীরা ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জরুরী পর্যবেক্ষন সেল খোলা হয়েছে।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।