বর্ষাবাস কেন?

ছবি : জ্যোতিসারা ভিক্ষু।
আষাঢ়ী পূূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূণিমা পর্যন্ত তিন মাসকে বৌদ্ধরা বর্ষাবাস হিসেবে পালন করে থাকেন। বলা যায় বর্ষাঋতু উদ্যাপন করেন। শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিনে শুরু হওয়া বর্ষাব্রত শেষ হয় শুভ আশ্বিনী পূর্ণিমা বা প্রবারণা পূর্ণিমার মাধ্যমে। রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্মের এক সপ্তাহ পরে তাঁর মাতৃদেবী অর্থাৎ বুদ্ধমাতা স্বর্গবাসী হয়েছিলেন। তখন সিদ্ধার্থকে পুত্র স্নেহের লালন পালন করেন বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমী। কথিত আছে মহাপ্রজাপতি গৌতমী কর্তৃক লালিত পালিত হয়েছিলেন বলে তথাগত বুদ্ধ গৌতম বুদ্ধ নামে সমধিক খ্যাত। পরে তিনি ঘটনা প্রবাহে কালক্রমে পারমী অনুসারে বুদ্ধত্ব লাভ করেন ৩৫ বছর বয়সে।

বুদ্ধমাতা মহামায়া মৃত্যুর পরে তাবতিংস স্বর্গে জন্ম নিয়েছিলেন। প্রত্যেক সম্যক সম্বুদ্ধ গণের মাতা সন্তান জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যে স্বর্গবাসী হয়ে থাকেন। কারণ বুদ্ধ মাতার গর্ভে দ্বিতীয় কোন সন্তান আসতে পারে না। মূলত বোধিসত্ত্বের মাতৃগর্ভে প্রতিসিদ্ধ গ্রহণ, সিদ্ধাথের গৃহত্যাগ এবং সর্বপ্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তনের ঘটনাবলী আষাঢ়ী পূর্ণিমাকে তাৎপর্য মণ্ডিত করে তুলেছে। রাজকুমার সিদ্ধার্থ এই দিনে সংসার ত্যাগ করেন। সাধনালব্দ জ্ঞান প্রথম আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিনে প্রচার করেন।

গৃহত্যাগঃ কপিলাবস্তুর শাক্যবংশীয় রাজা শুদ্ধোধনের ঔরষে এবং রাজরাণী মহামায়ার গর্ভে জন্ম হয়েছিলেন রাজকুমার সিদ্ধার্থের। তিনি ছিলেন তাদের অনেক সাধন, ভজন, ও আরাধনার সন্তান। রাজপরিবারে ভোগ বিলাসের কোন কমতি না থাকলেও ছিল পিতৃ বুকের হাহাকার এবং মাতৃ হৃদয়ের “মা’ ডাকের শূন্যতা। পরবর্তীতে সেই শূন্যতা পূরণ হল পারমী পূর্ণ সিদ্ধার্থ নামের শিশুটির জন্মের মাধ্যমে। রাজকীয় অতিশয্যে বড় হতে লাগলেন কুমার সিদ্ধার্থ। ভোগ বিলাসের মাঝে বেড়ে উঠলেন, অথচ ভোগ বিলাসের লালসা তাঁকে স্পর্শ করতে পারল না। উনিশ বছর বয়সে মোহের বাঁধনে বাঁধা হলেন, অর্থাৎ সংসারে আবদ্ধ করা হল। কিন্তু সংসারিক বাঁধন তাঁর ত্যাগ শক্তি দিয়ে তিনি বেড়িয়ে এলেন সংসার নামক মোহের খোলস থেকে। ঊনত্রিশ বছর বয়সে তিনি সারথি ছন্দক সহ অশ্ব কন্টকের পিঠে চড়ে সংসার ত্যাগ করলেন। সেই দিন ছিল শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমার জ্যোৎস্না স্নাত রাত।

ধর্মচত্র প্রবর্তননঃ গৃহ ত্যাগের পর রাজ নন্দন সিদ্ধার্থ সাধনায় নিমগ্ন হলেন। শুরু হল দুঃখ মুক্তির অদম্য প্রচেষ্টা। ছয় বছর কঠোর সাধনার বলে অবশেষে তিনি অবর্তীণ হলেন কঠিন যাত্রায়। খুঁজে পেলেন মুক্তির পথের ঠিকানা। মানুষ কেন জন্ম-মৃত্যুর কবলে পড়ে, কে কোথায় যায়, কোথা হতে আসে, ইত্যাদি রহস্যময়তার সমাধান পেলেন। বুদ্ধত্ব লাভের পর প্রথমে তিনি চিন্তা করেছিলেন যে, তিনি ধর্ম প্রচার করবেন না। কারণ সাধারণ তৃষ্ণাতুর মানুষেরা এই তৃষ্ণাক্ষয়ী নৈর্বাণিক ধর্ম বুঝবে না। কিন্তু দেব-ব্রক্ষার অনুরোধে স্বর্গ-মর্ত্য সবার কল্যাণে ধর্ম প্রচার করার চিন্তা মনে স্থান দিলেন। অবশেষে বুদ্ধ সারনাথে সর্বপ্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন করলেন। এটার প্রাচীন নাম ঋষিপতন মৃগদায়। ঋষিগণ গন্ধমাধব পর্বত থেকে আকাশ পথে এসে সেখানে অবতরণ করতেন। ঋষিদের পতন স্থান বলে সারনাথের অপর নাম ছিল ঋষিপতন। হত্যা করার জন্য আনীত মৃগদের সেখানে ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে ইহার আরেক নাম মৃগদায় অর্থাৎ মৃগবন। প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কীয় বিষয়ের জন্য সারনাথ সু-প্রসিদ্ধ। অশোক স্তুপের পূর্ব পাশে যে মন্দিরের চিহ্ন বিরাজমান, এটিই ধর্মচক্র প্রবর্তন স্থান। প্রত্যেক সম্যক সম্বুদ্ধগণের এই স্থানই প্রথম ধর্ম প্রচার স্থান। এই স্থান অপরিবর্তনীয়। প্রথম ধর্মদেশনায় আঠার কোটি দেব-ব্রহ্মা জ্ঞান লাভ করেছিলেন। মানুষের মধ্যে একজন মাত্র জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন যার নাম কৌন্ডিন্য। সেদিন ছিল শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা। শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিনে বুদ্ধের জীবনে আরেকটি অলোকিক ঘটনা ঘটেছিল। সেই নান্দনিক ঘটনাটি হল বুদ্ধের ঋদ্ধি প্রদর্শন ও স্বর্গারোহন।

যমক ঋদ্ধি প্রদর্শন ও তাবতিংস স্বর্গে গমনঃ বুদ্ধের সময়ে আরো ছয় জন শাস্তার কথা দেখা যায়। তাঁরা হলেন, পূরণ কশ্যপ, মক্খলি গোশাল, অজিত কেশকম্বল, পকুধ কচ্চায়ন, নির্গ্রন্থনাথ পুত্র, ও সঞ্জয় বেলট্ঠ। তাঁরা নিজ নিজ মতবাদ প্রচার করতেন। তাঁদেরও অনেক অনুসারী ছিলেন। কিন্তু কেউ সত্য জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন না। তারা তৃষ্ণামুক্ত বিমুক্ত পুরুষও ছিলেন না। তাঁদের খানিকটা ঋদ্ধি জ্ঞান ছিল। তাই তাঁরা এবং তাদের শিষ্য-প্রশিষ্যরা বেশি আস্ফালন করতেন। বুদ্ধের অনুসারীদের কটাক্ষ করতেন। বুদ্ধগণ এর ধর্মতা হল বিনাকারণে ঋদ্ধি প্রদর্শন না করা। বুদ্ধ অকারণে ঋদ্ধি প্রদর্শন করে কাউকে প্রলোভিত না করার জন্য শিষ্যদের উপদেশ দিতেন। তাই বুদ্ধের ঋদ্ধিবলের অসাধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে প্রথম প্রথম অনেকের ধারণা ছিল না। কোশলরাজ প্রসেনজিত বুদ্ধ ও তীর্থিকদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান আয়োজন করলেন। আগে থেকে ঘোষনা করা হল যে শ্রাবস্তীতে বুদ্ধ ও তীর্থিকদের মধ্যে ঋদ্ধি প্রদর্শন প্রতিযোগিতা হবে। বিশাল মন্ডপ সু-সজ্জিত করা হল। পূর্ব থেকে ঘোষণা দেওয়ায় অসংখ্য মানুষের সমাগম হল। তীর্থিকরা যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে নিজ নিজ ঋদ্ধি ক্ষমতা প্রদর্শন করলেন। বুদ্ধ একটু বিলম্বে গেলেন। ততক্ষনে তাঁরা অনেকে অনেক ধরণের মন্তব্য করে বসলেন। সবার দৃষ্টি বুদ্ধ আসার পথের দিকে স্থির হয়ে রইলেন। বুদ্ধের জন্য সু-সজ্জিত আসনে বুদ্ধ কিভাবে আরোহন করলেন তা কেউ দেখেন নি। বুদ্ধের প্রথম ঋদ্ধি দেখে সবাই মুগ্ধ হলেন। তার পর শুরু করলেন যমক ঋদ্ধি প্রদর্শন একদিকে আলোর রশ্মি আরেকদিকে অন্ধকার, একদিকে আগুন আরেকদিকে পানি এভাবে জোড়া জোড়া বহুধরনের ঋদ্ধি প্রদর্শন করলেন। উপস্থিত সবাই বুদ্ধের অভাবনীয় ঋদ্ধি প্রতিহার্য্য দেখে মুগ্ধ হলেন। বেশির ভাগ মানুষ বুদ্ধ ভক্ত হয়ে পড়লেন। মূলত বুদ্ধ এসব কারণে বিনা প্রয়োজনে ঋদ্ধি প্রদর্শন করতেন না। সম্যক সম্বুদ্ধের ঋদ্ধি আর পৃথগজনের ঋদ্ধি এর মধ্যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ আছে। এদিকে উপস্থিত দর্শকবৃন্দ তীর্থিকদের ধিক্কার দেওয়া শুরু করলেন। নানা ভাবে বঞ্চনা করলেন। তীর্থিক পূরণ কশ্যপ ক্ষোভ আর অপমানে জলে ডুব দিয়ে আত্নহত্যা করলেন এবং অবীচি নরকে গমন করলেন। শ্রাবস্তীর গন্ডাম্র বৃক্ষমূলে যমক ঋদ্ধি প্রতিহার্য প্রদর্শন করে বুদ্ধ আকাশ মার্গে অদৃশ্য হয়ে তাবতিংস স্বর্গে গমন করলেন। সেখানে দেবরাজের পান্ডু-কম্বল সিংহাসনে বর্ষাবাস অধিষ্ঠান করেন। সেটি ছিল বুদ্ধের সপ্তম বর্ষাবাস। স্বর্গে তিনমাস ব্যাপী মাতৃদেবীকে অভিধর্ম দেশনা করে তাঁকে ধর্মজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করে মাতৃ কর্তব্য প্রতিপালন করেন। কথিত আছে মাতৃদেবীকে কেন্দ্র করে তিন মাস অবধি অভিধর্ম দেশনার মাধ্যমে আশি কোটি দেব-ব্রহ্মার ধর্মচক্ষু উৎপন্ন করেছিলেন। বুদ্ধের দেবলোক গমন মাতা এবং দেবব্রহ্মাদের জন্য মুক্তির ঠিকানা এনে দিয়েছিলেন। এই জন্য তিনমাস পরে বুদ্ধ মর্ত্যলোকে অবতরণের সময় দেবতারা বুদ্ধের প্রতি কৃতজ্ঞা প্রকাশ স্বরূপ এক অদ্ভুদ কান্ড করেছিলেন। বিভিন্ন ধরণের হৃদয়ছোঁয়া ঘটনাবলির কারণে আষাঢ়ী পূর্ণিমা একটি অনন্য পূর্ণিমা তিথির নাম। বৌদ্ধদের জন্য আষাঢ়ী পূর্ণিমা পূণ্যের সুভাসী বারতা নিয়ে হাজির হয়।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই তিনমাস ভিক্ষুসংঘের পাশাপাশি বৌদ্ধ উপাসক-উপাসিকারাও বর্ষাবাস পালন করে থাকেন। এই সময়ে তারা প্রতি উপোসথ দিবসে অষ্টশীল গ্রহণ, দানকর্ম, ভাবনাকার্য সহ ইত্যাদি পূণ্যকর্মের মাধ্যমে বর্ষাবাস পালন করে থাকেন। এই সময়ে পূজনীয় ভিক্ষুসংঘরা তথ্য বহুল অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মদেশনা উপাসক উপাসিকাদের দান করেন। পাপকর্ম থেকে বিরত থাকার জন্য সাধারণ গৃহীরা সাধ্যমত চেষ্ঠা করেন। প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকেন। এমনকি এই তিন মাসের মধ্যে সামাজিক অনুষ্ঠান বিয়ের অনুষ্ঠানও হয় না। ভিক্ষুসংঘরাও বর্ষাবাস চলাকালীন সময়ে কেউ বিহারের বাইরে থাকতে পারেন না। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে থাকার নিয়ম থাকলেও এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরে আসতে হয়। এই এক সপ্তাহের জন্য বর্ষাব্রত জায়গা ছেড়ে যেতে হলেও অধিস্থান করে যেতে হয়।

আবার এই এক সপ্তাহের মধ্যে বর্ষাব্রত জায়গাতে ফিরে আসতে না পারলেও ভিক্ষুদের বর্ষাবাস (ওয়া) নষ্ট হয় না। অন্য ভিক্ষুদের মত বর্ষাবাস (ওয়া) পাওয়া যায়। কারণ বর্ষাবাস হচ্ছে ভিক্ষুদের আয়ু। তাই আয়ু নষ্ট হওয়ার কোন কারণ থাকে না। তবে কঠিন চীবর দানের সময় কঠিন চীবরটি গ্রহণ করতে পারবে না। কঠিন চীবর ব্যতীত (আরাইং) চীবরগুলো গ্রহণ করতে পারবে।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারো আগামী শনিবার থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষাব্রত শুরু হতে যাচ্ছে। এবার আমার ৬ষ্ঠতম অধিস্থান হবে। এই বর্ষাব্রতের শুরুতে সবার মঙ্গল কামনা করছি।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক।

লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত ।

আরও পড়ুন
1 মন্তব্য
  1. Shwe Hla বলেছেন

    ???

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।