বাঁশ কোড়ল বিক্রি করে সংসার চলে যাদের
বান্দরবানের মারমা বাজার
বান্দরবানের প্রতিটি হাট-বাজারে পাওয়া যাচ্ছে পাহাড়ি জনপ্রিয় সবজি বাঁশের অঙ্কুর (বাঁশ কোড়ল)। বর্ষা মৌসুমে জুমিয়া নারীদের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠে এই পাহাড়ি সুস্বাদু সবজি বাঁশ কোড়ল। পাহাড়ের প্রাকৃতিক বন-জঙ্গল থেকে কচি বাঁশের অঙ্কুর সংগ্রহ করে বাজারে এনে বিক্রি করছেন জুমিয়া নারীরা। বর্ষাকালে বাঁশের অঙ্কুর বিক্রির মাধ্যমে সংসার চালায় পাহাড়ে বসবাসরত নৃ-গোষ্ঠীর জুমিয়া নারীরা।
জানা গেছে, বাঁশ কোড়ল (বাঁশের অঙ্কুর) হলো মূলত ছোট বা কচি বাঁশ। বাঁশের ছোট ডগার ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি পর্যন্ত বাকলের (ছোবরা) ভেতরে যে কচি অংশটি থাকে, সেটিকেই মূলত বাঁশ কোড়ল বলা হয়। যা খাওয়া হয়।
স্থানীয় পাহাড়িরা জানান, বাঁশ কোড়লের মূল খাদ্য উপাদানটি থাকে বাকল (ছোবরা) দিয়ে মোড়ানো। এই কচি বাঁশের অঙ্কুর পাহাড় থেকে সংগ্রহ করার পর এটির খোসা বা বাকল ছাড়ানো পর ভেতরের অংশটিকে স্থানীয়রা বলে বাঁশ কোড়ল।
জানা যায়, বছরের মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত এই বাঁশ অঙ্কুরের ভরা মৌসুম থাকে। অঙ্কুর মাটি হতে ৪-৬ ইঞ্চি গজিয়ে উঠলে এটি খাওয়ার উপযোগী হয়। বাঁশ পরিণত হওয়ার আগে স্থানীয় পাহাড়িরা বাঁশ গাছের গোড়া থেকে কচি অংশ সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। ৮ থেকে ১০টি অঙ্কুর একসাথে আঁটি বাঁধা হয়। প্রতি আঁটির বাঁশ কোড়লের দাম ৫০, ৬০, থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। অবশ্যই বর্ষার প্রথম যেসব বাঁশ কোড়ল বাজারের আসে সেগুলো ১২০ থেকে ১৫০টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। বর্তমানে স্বল্পমূল্যে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এ বাঁশ কোড়ল।
স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙ্গালীদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, বান্দরবান পার্বত্য জেলার পাহাড় ও বনাঞ্চলে মুলি বাঁশ, ডলু বাঁশ, মিতিঙ্গ্যা বাঁশ, ফারুয়া বাঁশ, বাজ্জে বাঁশ, কালিছুরি বাঁশসহ বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়। তবে সব বাঁশের অঙ্কুর খাওয়া যায় না। যেগুলো খাওয়া যায়, তারমধ্যে মুলি বাঁশ, ডলু বাঁশ, মিতিঙ্গ্যা বাঁশের অঙ্কুরই পাহাড়ে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় সবজি হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।
পাহাড়িরা জানান, বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ কোড়ল (অঙ্কুর) স্বাদেও ভিন্নতা রয়েছে। বাঁশ কোড়ল সবজিকে নানাভাবে রান্না করে খেয়ে থাকেন পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীরা। এরমধ্যে সিদ্ধ করে চাটনী, ছোট ছোট করে কেটে ভাজি করে, গোটা বাঁশ কোড়লের ভিতরে মাংস ঢুকিয়ে, মরিচের ভর্তা ঢুকিয়ে ফ্রাই করে ও নানা সবজির সাথে মিক্স করে নাপ্পি দিয়েও রান্না করে খেয়ে থাকেন এই জাতিস্বত্বারা। বর্তমানে এই পাহাড়ি সবজি বাঙ্গালী ও পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয় একটা খাবারে পরিণত হয়েছে।
পাহাড়ে মারমা ভাষায় বাঁশ কোড়লকে বলা হয় মেহ্যাং, চাকমা ভাষায় বাচ্ছুরি, ত্রিপুরা ভাষায় মেওয়া এবং তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বাচ্ছুই আর বাঙ্গালী ভাষায় বাঁশ কোড়ল।
বান্দরবানের জাদিপাড়ার বাসিন্দা গরামং মারমা বলেন, বর্ষাকালে কর্মহীন হয়ে পড়ে দরিদ্র জুমিয়া পরিবারগুলো। বর্ষায় অনেকে আয়-রোজগার ও খাদ্য সংকটে ভোগেন। এমৌসুমে দরিদ্র জুমিয়া পরিবারগুলোর আয়ের একমাত্র উৎস হয়ে উঠে পাহাড়ি বিভিন্ন সবজি ও বাঁশ কোড়ল বিক্রির অর্থ।
বান্দরবান শহরের মধ্যমপাড়াস্থ মারমা বাজারটি অনেক পুরানো আদি একটি বাজার। এই বাজার, “মগ বাজার” নামে পরিচিত স্থানীয়দের কাছে। মগবাজারে সড়কের দু’পাশে পাহাড়ি সবজির পসরা নিয়ে বসা একাধিক পাহাড়ি নারী সবজি বিক্রেতার সাথে আলাপকালে তারা জানান, সবজি বিক্রি করে তাদের সংসার চললেও কষ্ট দেখার কেউ নেই। খোলা আকাশের নিচে বসে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা বাঁশ কোড়ল ও সবজি বিক্রি অনেক কষ্টকর। শুষ্ক মৌসুমে কোনোরকম চললেও বর্ষাকালে ভোগান্তির শেষ থাকে না।
রোয়াংছড়ি উপজেলার হদাবাবুঘোনা পাড়া থেকে মগবাজারে বাঁশ কোড়ল বিক্রি করতে আসা জুমিয়া নারী উনুচিং মারমা বলেন, প্রতিদিন ভোর সকালে তিনি পাহাড়ে গিয়ে বাঁশ কোড়লসহ পাহাড়ি নানা সবজি সংগ্রহ করে দুপুর ১টার দিকে বাড়ি ফিরেন। বাড়ির অন্যান্য কাজ শেষ করে খাওয়া-দাওয়ার পর ৩টার দিকে পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা বাঁশ কোড়ল ও সবজিগুলো বাজারে নিয়ে আসেন। ৫ শত থেকে ৬শত টাকার বাঁশ কোড়লসহ সবজি বিক্রি করে তার আয় হয়। এই টাকা দিয়েই সংসার চালাচ্ছেন।
একই উপজেলা পূর্ণবাসন পাড়ার বাসিন্দা ৫৫বছর বয়সী নারী মেএশৈ মারমা নামে আরেক বিক্রেতা বলেন, বৃষ্টির সময়ে পাহাড় থেকে বাঁশ কোড়ল সংগ্রহ করা খুবই কষ্টকর। মশা, সাপসহ বিভিন্ন পোকামাকড়ের কামড় খেতে হয়। অনেক সময় দাম বেশি হলে ক্রেতারা কিনতে চান না। এতে অধিকাংশ দিন কম দামেই বিক্রি করতে হয়। যে পরিমাণ কষ্ট হয়, সে পরিমাণে আয়ও হয় না।
চিম্বুক সড়কের ৭ মাইলস্থ শ্যারণ পাড়ার বাসিন্দা কুম থার পার নামে এই বম নারী জানান, পাহাড় থেকে কচি বাঁশের অঙ্কুর সংগ্রহ করে বাসায় এনে খোসাগুলো ফেলে মূল অংশটি বের করেন। এরপর ৮ থেকে ১০টি অঙ্কুর একসাথে আঁটি বেঁধে থুরুং (ঝুরি) নিয়ে মাথায় বহণ করে হাট-বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন।

পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড গোদাপাড়ার বাসিন্দা এচিং মারমা। এই জুমিয়া নারী জানান, অভাব অনটনের সংসারে স্বামী দিনমজুর। স্বামীর যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য। তাই নিজেদের পাহাড়ে জুমচাষের পাশাপাশি পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা বাঁশ কোড়লসহ সবজি বিক্রি করে সংসারে অর্থের যোগান দিচ্ছেন। প্রতিদিন এসব সবজি বিক্রি করে ৪’শ থেকে ৫’শ টাকা আয় হয়। এ টাকায় আমার অভাব অনটন কিছুটা কমেছে।
সোমবার বিকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মগ বাজারে অধিকাংশ সবজি বিক্রেতাই পাহাড়ি নারী। এসময় মগবাজারে বাঁশ কোড়ল ও পাহাড়ি সবজি বিক্রি করতে আসা শিউলি তঞ্চঙ্গ্যা, সুচরিতা তঞ্চঙ্গ্যা ও মেচিং মারমা, জয়েন্তি ত্রিপুরাসহ অন্যান্যদের সাথে কথা হলে তাঁরা জানান, প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ১২০টি আঁটি বাঁশ কোড়ল ও পাহাড়ি সবজি বাজারে আনেন। এমৌসুমে প্রতি আঁটি ৪০ থেকে ৬০টাকা দরে বিক্রি হয়।
জানা যায়, প্রতি রবিবার ও বুধবার হাট বসে মগবাজারে। এছাড়াও বান্দরবান জেলা আলীকদম ও রুমায় সাপ্তাহিক হাটবার সোমবারে, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলাতে প্রতিদিন বাঁশ কোড়ল কিনতে পাওয়া যায়।
শহর থেকে প্রায় ১১কি:মি: দূর খানসামাপাড়ার জুমিয়া নারী হ্লাসাই উ মারমা মগ বাজারে বাঁশ কোড়ল বিক্রি করতে আসছেন। এই পাহাড়ি নারী বলেন, আমরা পাহাড়ের অনেক ভেতর থেকে এই বাঁশ কোড়ল সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতে আনি। বর্ষাকালে মোটামুটি ভালোই বাঁশ কোড়ল হয় পাহাড়ে। তবে ইদানিং নির্বিচারে বাঁশ কেটে ফেলায় এবং পাহাড়ি ভূমি কমে যাওয়ায় বাঁশ কোড়লের পরিমাণ দিন দিন কমছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের পাশাপাশি বাঙ্গালীদের কাছেও সবজি হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পাহাড়ি বাঁশ কোড়ল। এছাড়াও ভ্রমনে আসা পর্যটকদের খাবারের তালিকায়ও স্থান করে নিয়েছে সুস্বাদু এখাবার।
বর্তমানে বান্দরবান পার্বত্য জেলার শহর ও পর্যটন এরিয়াগুলোর বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয়, রেষ্টুরেন্ট, রির্সোট গুলোতেও রকমারি খাবার হিসেবে বেশ জনপ্রিয় বাঁশ কোড়ল। পর্যটকদের কাছেও এটি অন্যতম একটি আকর্ষণীয় খাবারে পরিনত হয়েছে।
এছাড়াও পাহাড়ি এই সবজি বাঁশ কোড়ল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারীরা। চট্টগ্রাম-ঢাকার বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট গুলোতেও পাওয়া যায় বাঁশ কোড়লের সুস্বাদু বিভিন্ন খাবারের রেসিপি। এছাড়াও চট্টগ্রাম-ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চাকমা, মারমা ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের যুবক-যুবতীরা বাঁশ কোড়লসহ পাহাড়ি খাবারের হোটেল-রেস্তোরাঁ দিয়েছেন।
শহরের মগবাজারস্থ মধ্যমপাড়ায় পিরিতি হোটেলের স্বত্বাধিকারী মমতাজ উদ্দিন বলেন, পাহাড়িদের পাশাপাশি বাঙ্গালীদের মধ্যে বাঁশ কোড়ল খাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে পর্যটকদের কাছে এর ডিমান্ড বেশি। রেস্টুরেন্টে এলে তারা বাঁশ কোড়ল খোঁজেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের কাছে বাঁশ কোড়লসহ পাহাড়ি খাবারের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু মধ্যমপাড়ায় পাহাড়ি য্বুক-যুবতীরা অর্ধশতাধিক রেস্তোরাঁ গড়ে তুলেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা অং থোয়াই চিং মারমা বলেন, মুলি বাঁশ, ডলু, মিতিঙ্গ্যা, ফারুয়া, বাজ্জে, কালিছুরি বাঁশসহ বেশ কয়েক প্রজাতির বাঁশ কোড়ল পাওয়া যায় বান্দরবানে। বিভিন্ন জাতের বাঁশ কোড়লের স্বাদেও ভিন্নতা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, মারমা, চাকমা, ত্রিপুরাসহ বান্দরবানের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে বাঁশ কোড়ল খাওয়ার নিজস্ব রেসিপির অভাব নেই। সবজি হিসেবে তরকারি বা ভাজি এবং শুঁটকি দিয়ে খাওয়া হয় বাঁশ কোড়ল। এসব ছাড়াও স্যুপ, মুন্ডি, মাংস দিয়ে রান্না ও ভাজি করে খাওয়া যায় এটি।
স্থানীয় অনেক পাহাড়ি বাসিন্দা জানান, এখন বিভিন্ন পাহাড়ি রেস্তোরাঁয় রকমারি খাবার হিসেবে বাঁশ কোড়ল সবার কাছে প্রিয় খাবার হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বান্দরবানে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছেও এটি পছন্দের খাবার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। শুধু তাই নয়। পাহাড়ের বাঁশ কোড়ল ব্যাপারীরা বাহিরের জেলাগুলোতে নিয়ে যাচ্ছে। এখন ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও কিনতে পাওয়া যায়। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রামে অনেক পাহাড়ি যুবক-যুবতী পাহাড়ি রেস্তোরাঁ গড়ে তুলেছে। এগুলোতে পাওয়া যায় বাঁশ কোড়লসহ পাহাড়ি সুস্বাদু বিভিন্ন খাবার।
বান্দরবান শহরের বাজার চৌধুরী হ্লাথোয়াই হ্রী মার্মা জানান, বছরের মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত পাহাড়ের বাজারগুলোতে বাঁশ কোড়ল বেশি পাওয়া যায়। মূলত বর্ষাকালে যখন মাটি নরম থাকে, তখন বাঁশগুলো বাড়তে শুরু করে এবং ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি লম্বা হওয়ার পরই খাওয়ার উপযোগী হয়ে যায়। তখন পাহাড়ের বাঁশ বাগানগুলো থেকে এ সবজি সংগ্রহ করে বাজারগুলোতে বিক্রি করতে নিয়ে আসেন পাহাড়িরা।
তিনি জানান, মুলি বাঁশ কোড়ল সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু হওয়ায় বাজারগুলোতে এর চাহিদা এবং দাম বেশি। মুলি বাঁশ কোড়ল আকারে চিকন ও যথেষ্ট লম্বা হওয়ায় এটি প্রায় এক ফুট থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত লম্বা হলেও এটি খাওয়া যায়। মুলি বাঁশের কোড়লের আরেকটি বড় গুণ হচ্ছে এটি দিয়ে অনেকগুলো রেসিপি তৈরি করা যায়। পাহাড়ি এলাকায় যেসব বাঁশ কোড়ল দেখা যায়, তার প্রতিটি প্রজাতিই প্রায় খাওয়ার যোগ্য অর্থাৎ কোনটি বিষাক্ত নয়।



