বান্দরবানের নারীদের অনুপ্রেরণা উৎস ফাতেমা পারুল

সভ্যতার ক্রম বিকাশের ধারার সাথে তাল মিলিয়ে আজ এই রোবটিক্স যুগ পর্যন্ত সমাজের বিবর্তন, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য এক কথায় নারীর সার্বজনীন উপস্থিতিই প্রমাণ করে। নারী- তুমিই সার্থক কারিগর, তুমিই অনুপ্রেরণা, তুমিই রহস্যের অপার বিস্ময়। দ্রোহের কবি-প্রেমে কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কথা না লিখে পারছি না নারীর মহিমাকে ব্যাখ্যা করতে, “এ পৃথিবীর যত মহান কীর্তি, অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

“নারী মানে কেনা গোলাম, নারী যেন অন্যের করুনার পাত্র” নারীর প্রতি সমাজের এমন দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে নিরলসভাবে কাজ করছেন ফাতেমা পারুল। অসহায়, দরিদ্র, পিঁছিয়ে পড়া, স্বামী পরিত্যক্ত, বিধবা, অস্বচ্ছল পরিবারের নারীদের স্বপ্ন দেখান তিনি। আর এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে নব জাগরণ মহিলা উন্নয়ন সমিতির মাধ্যমে নিরলস কাজও করে যাচ্ছেন এ নারী। সেলাই কাজ, পুতির তৈরি টিস্যু বক্স, নকশি কাঁথা, বল্ক-বাটিক ও বিভিন্ন ফুলের টপ তৈরী নারীর ভাগ্য বদলের হাতিয়ার।

ফাতেমা পারুল ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারী বান্দরবানের লামা পৌরসভার চাম্পাতলী গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হক ও মা আনোয়ারা বেগম। এক ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ১৯৯০ সালে লামা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা পাশের পর আর পড়ালেখা করার সৌভাগ্য হয়নি ফাতেমা পারুলের। ২০ বছর বয়সে পশ্চিম রাজবাড়ী আবদুল আজিজের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেন মা-বাবা। স্বামী আবদুল আজিজ বাংলাদেশ আনসার ব্যাটালিয়নের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

বর্তমানে তিনি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য। রাজনৈতিক জীবনে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের উপজেলা সভানেত্রীও বটে। ২০০১ সালে লামা পৌরসভার প্রথম নির্বাচনে অংশ গ্রহন করে ৪, ৫ ও ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হন ফাতেমা পারুল। কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর অবহেলিত নারীদের উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ আরো প্রসারিত হয়। তিনি অবহেলিত দরিদ্র নারীদের আতœ-কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারী নিজের বাড়ীর উঠানে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নব জাগরণ মহিলা উন্নয়ন সমিতি’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। মাত্র ১৫ জন নারী নিয়ে শুরু করেন সংগঠনের কার্যক্রম। বর্তমানে ১০০ জনের বেশি নারী এ সংগঠনের সদস্য।

জানা গেছে, নব জাগরণ মহিলা উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে শুরু থেকে বাল্য বিবাহ রোধ, নারী নির্যাতন, যৌতুক প্রথা, শিশু পাচার রোধে সচেতনতা মূলক সভা সেমিনার সহ জাতীয় দিবসের মধ্যে নারী দিবসসহ বিভিন্ন দিবস পালন করে আসছে। এছাড়া এলাকার অবহেলিত দরিদ্র নারীদের আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ইতিমধ্যে এই সমিতির মাধ্যমে বেশ কয়েক ধাপে ৬০০ বেকার নারীকে সেলাইসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রশিক্ষন দেয়া হয়। তাদের মধ্যে অধিকাংশ নারীই সেলাইকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে সেলাই কাজ করে এখন সংসার চালায়। স্বামীর পাশাপাশি ছেলে মেয়েদের পড়া লেখার খরচও যোগান দেন প্রশিক্ষিত এ নারীরা।

লামা পৌর এলাকার কলিঙ্গাবিলের কামাল উদ্দিনের স্ত্রী মুক্তা বেগম, কাটা পাহাড়ের মোশারফের স্ত্রী রোকসানা বেগম, চরোয়া বিলের রাশেদা বেগম, পশ্চিম রাজবাড়ীর শাহেনা বেগম উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি নারীদের কারিগরিভাবে দক্ষ করে তুলতে পাপস বুনন, অ্যামব্রয়ডারী, বাটিক, বুটিকসহ মোট ৯টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা নিজেদের দক্ষ করে এসব কাজের মাধ্যমে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন।

প্রতিভাবান এ ফাতেমা পারুলের অক্লান্ত পরিশ্রম আর মেধার সমন্বয়ে ২০০০ সালে সমিতিটি মহিলা বিষয়ক ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কর্তৃক রেজিষ্ট্রেশন লাভ করে আরো একধাপ এগিয়ে যায়। শুরুতে বাঁশের বেড়া ও ছনের ছাউনির ঘর দিয়ে সমিতির কার্যক্রম শুরু করা হয়। বহু আবেদন নিবেদনের পর ২০১২-১৩ অর্থ বছরে সরকারী ভাবে এডিবি’র অর্থায়নে একটি টিনের ছাউনি ও টিনের বেড়া ঘর নির্মান করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে কার্যক্রমের অগ্রগতি দেখে পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ একটি তিন তলা বিশিষ্ট পাঁকা ঘর নির্মাণ করে দেন।

সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধ ভাবে বসে ৩০-৩৫ জন নারী। পেশায় তারা গৃহবধূ। আর সমিতির সভানেত্রী ফাতেমা পারুল তাদেরকে বাল্য বিবাহ রোধ, নারী পাচার রোধ, নারী নির্যাতন ও যৌতুক প্রথা রোধসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর সচেতনতা বিষয়ক ধারনা দিচ্ছেন। আবার বেশ কয়েকজনকে কর্মসংস্থানমূলক বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন।

সমিতির সভানেত্রী বেগম ফাতেমা পারুল বলেন, সমিতির মাধ্যমে অবহেলিত অসহায় নারীদের প্রশিক্ষনের পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীদের উৎপাদিত পণ্যসমূহ যেন সঠিক দামে ও ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারে সেজন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ রাখি। বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক আলোচিত বিষয়ের মধ্যে একটি হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিবান, ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে এসকল অসহায় নারীদের এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি পার্বত্য মন্ত্রী বীর বাহাদুরের হাতকে আরো শক্তিশালী করার লক্ষে কাজ করছি।

এ বিষয়ে লামা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সাহেলা পারভীন বলেন, সমিতির মাধ্যমে নারীদের আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে সম্পৃক্ত করে জয়িতা ফাতেমা পারুল অনেক বড় কাজ করছেন,এ জন্য তিনি প্রশংসার দাবীদার।

লামা পৌরসভার মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, কঠোর পরিশ্রম ও তীব্র ইচ্ছাশক্তি দ্বারা ফাতেমা পারুল গ্রামের অনেক নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলছেন। এতে প্রশিক্ষিত নারীরা নিজ বাড়িতে সেলাই কাজ করে বাড়তি অর্থ উপার্জন করে পরিবারের অর্থের চাহিদা মেটাচ্ছেন। এজন্য গ্রামের সবাই তাঁকে নিয়ে এখন গর্ব করেন।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।