বান্দরবানের পাহাড়ে বেড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস

বর্ষায় প্রাণহানির আশঙ্কা

বান্দরবানে প্রতিবছর পাহাড় ধসে অসংখ্য প্রানহানির ও আহতের ঘটনা ঘটে। বর্ষা মৌসূম আসলেই এই ধসের হার বৃদ্ধি পায়। সামান্য বৃষ্টিতে ছোট-বড় পাহাড় ধসে কেড়ে নেয় অসংখ্য মানুষের প্রাণ, দিনের পর দিন অচল থাকে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রতিবছরই পাহাড় ধসে অসংখ্য প্রানহানির ঘটনা ঘটলে ও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত মানুষের সুরক্ষার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেই কোন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

সরকারিভাবে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০০৬ সালে জেলা সদরে ৩ জন, ২০০৯ সালে লামায় শিশুসহ ১০ জন, ২০১০ সালে নাইক্ষ্যংছড়িতে ৫ জন, ২০১১ সালে রোয়াংছড়িতে দুইজন, ২০১২ সালে লামায় ২৮ জন ও নাইক্ষ্যংছড়িতে ১০ জন, ২০১৫ সালের লামায় ৪ জন, জেলা শহরের সিদ্দিকনগরে ১ জন ও বনরূপায় ২ জন এবং ২০১৭ সালে সদরের কালাঘাটার দুটি স্থানে শিশুসহ ৬জন এবং ১৭ সালের ২৩ জুলাই রুমা সড়কের দলিয়ান পাড়া এলাকায় ৫জন নিহত হয়। ১৮ সালের ২১ মে নাইক্ষংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের মনজয় পাড়ায় পাহাড় কাটতে গিয়ে মাটি চাপায় নিহত হয়েছে ৪, আহত হয়েছে ১ জন। একই বছরের ৩ জুলাই জেলা শহরের বড়ুয়াপাড়া এলাকায় ১জন নিহত হন। এসব ঘটনায় অন্তত শতাধিক আহত হন।

বান্দরবান শহরে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা হোসনেয়ারা বেগম বলেন, টানা বৃষ্টি হলেই আমরা নির্ঘুম রাত পার করি, আমরা চাই সরকারিভাবে আমাদের পূনবাসন করা হোক।

সরকারী তথ্য মতে, বান্দরবান শহরে পাহাড়ে বসবাস করা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সংখ্যা ১৪৪টি। এর মধ্যে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কে বান্দরবান অংশে ৬৫টি, মেঘলা পর্যটনের পুরনো সড়কের অংশে ৬০টি, রোয়াংছড়ি সড়কে ৭টি এবং আশপাশে অন্যান্য জায়গায় ১২টি। জেলায় অন্তত দেড় হাজার পরিবার ঝুঁকিপূর্ন বসবাস করছে। এ পরিবার গুলোকে জরুরী ভিত্তিতে সরানো না হলে বর্ষায় পাহাড় ধসে প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এত মৃত্যুর পরও জেলায় থেমে নেই পাহাড় কেটে বসতবাড়ি নির্মাণ। গত বছরের বর্ষা মৌসুম পেরিয়ে যেতে না যেতেই পাহাড় কেটে জেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক বসতবাড়ি।

বান্দরবানের লামা উপজেলার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, বৃষ্টি আসলেই মাইকিং করে আমাদের সরিয়ে নেওয়া হয়, পূর্নবাসন করা হলে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে আমরা পরিবার নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করতামনা।

পাহাড়ের ভূমি অন্যান্য সমতল ভূমির চেয়ে অনেকটা সস্তা, যার কারনে অতিদরিদ্ররা কমমূল্যে পাহাড় কিনে মাটি কেটে পাহাড়ের পাদদেশে তৈরি করছে বসত বাড়ি। তবে সরকারীভাবে তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার দীর্ঘ মেয়াদি কোন উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ বসতবাড়ি নির্মাণ বেড়েই চলছে।

জেলার সাতটি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের ঢালে অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে তুলেছে প্রায় ২৫ হাজারেরও বেশি পরিবার। এবছর পাহাড়ের ঢালে নতুন নতুন বসতি গড়ে ওঠায়,গত বছরের তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সংখ্যা আরও অনেক বেড়ে গেছে।

এদিকে গত সোমবার (২০ জুলাই) থেকে টানা বৃষ্টির কারনে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়ার কারনে বান্দরবানের লামা, নাইক্ষ্যংছড়িসহ অন্য উপজেলাগুলোতে উৎকন্ঠার মধ্যে দিন পার করছে স্থানীয়রা। অন্যদিকে আবহাওয়ার খবরে বলা হয়, বৃষ্টির এই ধারা আগামী ২৫ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

এ বিষয়ে লামা পৌরসভা মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, পৌর এলাকায় বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের উপর ঝুঁকিপুর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে সব সময় বলা হয়।

বান্দরবান মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য মতে, অপরিকল্পিত উপায়ে পাহাড় কেটে ভৌত অবকাঠামো, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট তৈরি ও গাছ কাটার কারণে পাহাড় ধস বেড়ে যাচ্ছে, ফলে অতিবৃষ্টির সময় এসব পাহাড় সহজেই ভেঙে পড়ে।

এই ব্যাপারে জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, টানা বর্ষণের কারনে ঝুঁকিপূর্ন বসবাসকারীদের আশ্রয়ের জন্য বান্দরবানের ৭টি উপজেলায় ১২৬টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়, তাদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়।

সরকারি তথ্য মতে, পাহাড় ধসে ১৭সালে ৩ হাজার ৭৫টি বাড়ি সম্পূর্ণ ৩৬ হাজার ৬৩৭টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে।।

বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শামীম হোসেন বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।

তবে স্থানীয়রা মনে করেন,পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ধসের হাত থেকে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় শুধু আশ্বাস নয়, এখনই প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিতে হবে মহাপরিকল্পনা,যাতে পাহাড় ধসের প্রানহানী থেকে রক্ষা পায় মানুষ।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।