বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নির্যাতন

বান্দরবানের রোয়াংছড়ির তারাছা ইউনিয়নের তালুকদার পাড়ার আদিবাসীদের ছবি।
বান্দরবানের রোয়াংছড়ির তারাছা ইউনিয়নের তালুকদার পাড়ার আদিবাসীদের ছবি।

ঘর এখনও তালাবদ্ধ, ঘরে কেউ নেই কেন, পাড়াবাসীর কাছে জানতে চাইলেই ঘরের পেছন থেকে বেরিয়ে আসে ৭০ বছর বয়সি উ ¤্রা চিং মার্মা। সাংবাদিক পরিচয় দিতে মারমা ভাষাভাষী এই বৃদ্ধ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সান্তনা দিতেই আধো বাংলায় বলেন, সেদিন সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীদের নির্যাতনে সবাই পালিয়ে যায়, আমি বৃদ্ধ মানুষ পালাতে পরিনি তাই ঘরে থেকে যায়। কথাগুলো বলছিলেন বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের তালুকদার পাড়ার এই আদিবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,গত ৫ জুলাই সন্ধ্যায় চাঁদাবাজির অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে পাহাড়ের দুই শসস্ত্র গ্রুপের ১০ জন। এক পর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতির কারনে সন্ত্রাসীরা স্থানীয়দের দায়ী করে ক্ষুদ্ধ হয়ে নির্যাতন ও দফায় দফায় হত্যার হুমকি দেয়। ফলে হুমকির মুখে এলাকা ছেড়ে বান্দরবান শহরে আশ্রয় নেয় ৫০টি আদিবাসী পরিবারে দুই শতাধিক মানুষ। এঘটনায় পুলিশ অস্ত্রসহ সন্ত্রাসী বিমল চাকমাকে আটক করে এবং তিনটি মামলা দায়ের করে।
সোমবার তাদের নিজ এলাকায় ফিরিয়ে নিতে প্রশাসনের কর্মকর্তারা রোয়াংছড়ির তালুকদার পাড়া বৌদ্ধ বিহারে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক দীলিপ কুমার বণিক, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন। সভায় সন্ত্রাসীদের ভয়ে আতঙ্কে থাকা স্থানীয় আদিবাসীরা তাদের নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপনের দাবী জানান, তুলে ধরেন বছরের পর বছর ধরে চলে আসা নির্মম নির্যাতন ও শোষনের বর্ণনা।
এলাকার কারবারী মং পু মার্মা জানায়, সন্ত্রাসীরা আমাদের হুমকি দেওয়ায় পালিয়ে যায়, এখন নিরাপত্তা দেওয়ায় ফিরে এসেছি, সেনা ক্যাম্প না দিলে আবার আক্রমন করবে।
জেলা শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে একশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এলাকাটিতে ৭০টি আদিবাসী পরিবার বসবাস করে আসছে। একে ৪৭ রাইফেলসহ ভারী অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত শসস্ত্র গ্রুপ পাড়াটিতে অবস্থান নিয়ে জোর পূর্বক আদিবাসীদের ঘরেই খেয়ে রাত যাপন করত। জুম চাষ ও মিশ্র ফলচাষ করা আদিবাসী পরিবারগুলো থেকে জোর করে অর্থ আদায় ছিল নিত্য ব্যাপার। তাদের কথার অবাধ্য হলেই নেমে আসতে চরম নির্যাতন।
স্থানীয় মং গিলা মার্মা বলেন, প্রশাসন বলেছে পাড়ায় ফিরে যাও আমরা ফিরে এসেছি, নিরাপত্তা না পেলে আমাদের ফের এখান থেকে চলে যেতে হবে।
স্থানীয়রা জানায়, শসস্ত্র বিভিন্ন গ্রুপের খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজী ও প্রান নাশের হুমকির কারনে দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কে দিন অতিবাহিত করে আসছে তারা। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা না হলে সামনে আরো বড় ঘটনা ঘটতে পারে। পাড়াটির পাশের অরণ্যে ঘেরা পাহাড়েই নাকি অবাধ চলাচল শসস্ত্র গ্রুপটির, পাড়াবাসির গতিবিধি লক্ষ্য করার পাশাপাশি ফোনে হত্যার হুমকি প্রদান করছে।
পাড়ার বাসিন্দা সা থোয়াই চিং মার্মা জানান, তারা (জেএসএস) আমাদের টার্গেট করেছে, কখন কাকে গুলি করে মেরে ফেলে সেই আতঙ্কে রাত পার করি।
সরজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে, চারজনের পুলিশের একটি দল বেত ছড়া ক্যাম্প থেকে এসে টহল দিচ্ছে, অন্যদিকে ১০ জনের সেনা সদস্যরা পাড়াটির স্কুলে অস্থায়ী ক্যাম্প বসিয়ে আদিবাসীদের নিরাপত্তা দিচ্ছে। পালিয়ে যাওয়া ৫০ পরিবারের মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত ফিরেছে ৩০টি পরিবার। এলাকাটিতে নৌ পথের যাতায়ত একমাত্র মাধ্যম, নিরাপত্তা বাহিনীর নিজস্ব নৌযান না থাকায় বড় ঘটনা ঘটলে বাড়তি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যোগ দেবার যে সময় লাগবে সেই সময়ে অপরাধীরা চলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, তারা যাতে সাহস নিয়ে থাকতে পারে , তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা অগ্রধিকার দিয়েছে।
১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বরের সম্পদিত পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) এর দাবী অনুসারে পাহাড়ে সেনা ক্যাম্পের পরিধি কমিয়ে আনে সরকার। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জেলায় জেএসএস তাদের প্রতিদ্বন্ধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী তথা ক্ষোধ আদিবাসী সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন চালিয়ে খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনা সংঘটিত করে। এসব ঘটনায় জেলায় ফের সেনা ক্যাম্প স্থাপন ও র‌্যাবের ইউনিট স্থাপনের দাবী জানিয়েছে আওয়ামীলীগ তথা বিভিন্ন এলাকার নির্যাতিত আদিবাসীরা।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দীলিপ কুমার বণিক বলেন, এখানে স্থায়ী সেনা ক্যাম্প বসানো যায় কিনা তা আমরা চিন্তা করে ব্যবস্থা নিব।
উল্লেখ্য, গত ১৩ জুন একই উপজেলার জামছড়ি এলাকা থেকে সদর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ নেতা মং পু মার্মাকে শসস্ত্র সন্ত্রাসীরা অপহরণ করলেও একমাসেও তার কোন খোঁজ মেলেনি, একের পর এক ঘটনা ঘটনায় জেলার আদিবাসীদের মধ্যে চরম আতংক ছড়িয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন
Loading...