বান্দরবানে আদিবাসী শিশুদের ধর্মান্তরিতের চেষ্টায় মৌলবাদী চক্র : ৭ বছরে ৭২ শিশু উদ্ধার

আদিবাসী শিশু
বান্দরবানে গরীব আদিবাসী পরিবারের শিশুদের উন্নত জীবনের হাতছানি আর উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসায় নিয়ে ক্ষোধ অভিবাবকদের অগোচরে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। গত ৭ বছরের এই ধরণের প্রলোভনের শিকার অন্তত ৭২ শিশুকে উদ্ধার করে পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বান্দরবানে কিছু আদিবাসী পরিবারের যুবককে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে আর্থিক সহায়তা দিয়ে বান্দরবানের ৭টি উপজেলা থেকে গরীব আদিবাসী পরিবারের খ্রীষ্টান ও বৌদ্ধ অনুসারী শিশুদের সংগ্রহ করে ঢাকা বিভিন্ন মাদ্রাসায় পরিবারের অগোচরে ভর্তি করানো হচ্ছে। ফলে একসময় তারা আরবী শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি ধর্মান্তরিত হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাতে জেলা শহরের একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে চার আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করে পুলিশ। চার শিশুকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার অভিযোগে বান্দরবানের বাসস্টেশন এলাকার বাসিন্দা আবু বকর ওরফে মংশৈ প্রু ত্রিপুরা এবং মো:হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধারকৃত শিশু নুসিং উ মার্মা, মেসিং প্রু মার্মা, মং থুইহ্লা মার্মা, মাসিং শৈ মার্মার বয়স ৯ থেকে ১৩ বছর। তারা জেলার রোয়াংছড়ির বেতছড়া এলাকার বৈদ্যপাড়া, হেডম্যানপাড়া এবং বেতছড়ামুখ পাড়ার বাসিন্দা। উদ্ধারকৃত শিশুরা উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ১ম থেকে ৫ম শ্রেণীতে পড়ালেখা করে।
রাজধানী ঢাকাতে ভাল বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করানোর প্রলোভন দেখিয়ে অভিভাবকদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদেরকে গ্রাম থেকে বান্দরবান শহরে নিয়ে আসা হয়। শিশুদের ঢাকা নিয়ে যাওয়ার আগে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করা হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় শিশুদের উদ্ধার ও এই দুই যুবককে গ্রেফতার করা হয়।
আদিবাসী শিশু
এসময় ঘটনায় জড়িত রাঙ্গামাটি জেলার রাজস্থলীর বাসিন্দা সুমন খেয়াং নামে একজন পালিয়ে যাই, তবে ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনায় সদর থানায় মানবপাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এই ব্যাপারে পাচার হতে যাওয়া শিশুর অভিবাবক রোয়াংছড়ির হেডম্যানপাড়ার বাসিন্দা অং থোয়াই চিং মার্মা বলেন, ঢাকায় ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর কথা বলে আমাদের কাছ থেকে আমাদের শিশুদের নিয়ে আসা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১৩ জানুয়ারি জেলা শহরের অতিথি বোডিং থেকে বৌদ্ধ অনুসারী ৩৩ আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। এসময় বান্দরবানের গর্ডেন ত্রিপুরা ওরফে রুবেল, ঢাকার দারুল এহসান মাদ্রাসার ছাত্র আবু হোরাইয়া এবং শ্যামলী এলাকার আবদুল গণিকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা শিশুদের জেলার থানচি উপজেলার বলিপাড়া এলাকা থেকে আনা হয়। শিশুদের ঢাকায় ধানমন্ডি আদর্শ মদিনা স্কুলে ভর্তির কথা বলে নিয়ে আসে।
আরো জানা গেছে, ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারী শহরের হাবিব আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ১৬ শিশুকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় পাচার কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে মোহন ত্রিপুরা নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। ১৬ শিশুকে শহরের হাফেজঘোনার বাংলাদেশ ট্রাইবাল অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাপ্টিস্ট চার্চে ভর্তি করার কথা বলে বোর্ডিংয়ে রাখা হয় কিন্তু হাফেজঘোনা এলাকায় এ ধরনের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় ধারণা করা হয় ঢাকায় কোন মাদ্রাসায় পাচারের শিশুদের নিয়ে আসা হয়।
এই ব্যাপারে মানবাধিকার কমিশন বান্দরবান সদর উপজেলা শাখার সভাপতি অং চ মং বলেন, এই ব্যাপারে হেডম্যান কারবারীদের মাধ্যমে প্রত্যান্ত এলাকায় প্রচার চালাতে হবে, অভিবাবকরা সচেতন হলে আদিবাসী শিশু পাচার ও ধর্মান্তকরণ কমে আসবে।
আদিবাসী শিশু
২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি পুলিশ ও র‌্যাব ২১ আদিবাসী শিশুকে ঢাকার সবুজবাগের আবুজর গিফারি মাদ্রাসা ও মসজিদ কমপ্লেক্স এবং দাওয়া বাংলাদেশ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ধার করে। সেখানে তাদের ধর্মান্তরিত করে নতুন নাম দেওয়া হয়েছিল। পরে তাদের বৌদ্ধ অনুসারী অভিভাবকের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।
২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড় থেকে ১৯ ত্রিপুরা শিশুকে পিরোজপুরের এফ করিম আমিন মাদ্রাসায় পাচারকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি ছাত্রকর্মীরা ছয়জনকে উদ্ধার করে। রাজধানীর ফকিরাপুলের শ্যামলী বাসের কাউন্টার থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। এসময় বিনয় ত্রিপুরাকে আটক করে, তার ব্যাগ তল্লাশী করে পিরোজপুরের এফ করিম আমিন মাদ্রাসার কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেছে। সেসময় বিনয় বলেন, মাদ্রাসার জৈনক রেজোয়ান শিশুগুলো আনতে উদ্ভুদ্ধ করে। আরো বাকি ১৩টি শিশু ঢাকায় আসার পথে চট্টগ্রামে বাস থেকে নেমে পালিয়ে যায়।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় বলেন, শিশুদের ঢাকায় ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করানো প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্য জেলা শহর নিয়ে আসা হয়।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।