বান্দরবানে বড়শি প্রতিযোগিতার আড়ালে হারেছের জমজমাট ক্যাসিনো !

বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলার কেয়াজুপাড়ায় বড়শি প্রতিযোগিতার আড়ালে জমজমাট ক্যাসিনো চালিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন হারেছ । আর এই অর্থ হাতিয়ে নিতে শুধু বান্দরবান নয়, পুরো চট্টগ্রামে বিস্তার করেছেন নেটওয়ার্কের বিস্তার করেছেন হারেছ কোম্পানি।

সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বড়শি প্রতিযোগিতার অনুমতি নিয়ে আয়োজন করছে বড়শি প্রতিযোগীতার নামে জুয়া। প্রতিযোগীতার নামে পুরষ্কারের প্রলোভনে নি:স্ব হচ্ছে শত শত মৎস শিকারী। শুধু বান্দরবান নয়, বর্তমানে দেশের নানা স্থানে আয়োজন করা হচ্ছে কথিত বড়শি প্রতিযোগিতা। আজ এই উপজেলায়, তো কাল অন্য উপজেলায়। পরশু এই জেলায় হলে, পরদিন আরেক জেলায়। স্থান পাল্টালেও মূল আয়োজক প্রায় একই থাকছে। খালি চোখে পুকুর বা দিঘীর মালিককে প্রতিযোগিতার আয়োজক হিসেবে দেখা গেলেও নেপথ্যে রয়েছে একটি শক্তিশালী চক্র; যারা দেশজুঁড়ে কথিত বড়শি প্রতিযোগিতা আয়োজন করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

কথিত বড়শি প্রতিযোগিতার টিকিট পাওয়া যাচ্ছে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলীর ডিটি রোডের খালেক ও মালেক বড়শি বিতান, আসলাম বড়শি বিতান ও ফোরস্টার বড়শি বিতান, আগ্রাবাদের শাহ আমানত বড়শি বিতান, বকশির হাটের আলেক শাহ বড়শি বিতান, সাতকানিয়ার কেরানিহাটের জামাল বড়শি বিতান, লোহাগাড়ার আমিরাবাদের শাহপীর বড়শি বিতান ও কুমিল্লায় মিজানুর রহমান নামের একজনসহ নানাজনের কাছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতার টিকিট পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর মালিকদের নিয়েই উক্ত চক্রটি গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ।

বড়শি দিয়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতার একটি বড় স্পট হচ্ছে, বান্দরবানের লামা উপজেলার কেয়াজুপাড়া এলাকার হারেছ লেক। পাহাড় কেটে তৈরি করা হয় এই লেকটি। সেখানে কথিত বড়শি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে টিকিটের মূল্য হিসেবে আদায় করা হয় ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। যদিও হারেছ লেকে তেমন মাছ নেই। প্রতিযোগিতার আগে বাইরে থেকে ৫০-৬০টি মাছ এনে বিশাল লেকে ফেলা হয়। যার কারণে ছিপ ফেলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে একটি মাছও পাননি এমন অনেক মৎস্য শিকারীও আছেন।

প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী যিনি সবচেয়ে বড় মাছ বড়শি দিয়ে ধরতে পারবেন তাকে প্রথম পুরস্কার হিসেবে ৮ লাখ টাকা তুলে দেয়া হয়। দ্বিতীয় পুরস্কার চার লাখ টাকা, তৃতীয় পুরস্কার দুই লাখ টাকা, চতুর্থ পুরস্কার এক লাখ টাকা দেয়া হয়। পঞ্চম পুরস্কার ৮০ হাজার, ৬ষ্ঠ পুরস্কার ৭৫ হাজার, ৭ম পুরস্কার ৭০ হাজার, ৮ম পুরস্কার ৬৮ হাজার, ৯ম পুরস্কার ৬৭ হাজার, ১০ম পুরস্কার ৬৬ হাজার ও ১১তম পুরস্কার হিসেবে ৬৫ হাজার টাকা দেয়া হয়।

হারেছ লেকে গত ২৫ অক্টোবর ৯৫ আসনের টিকিট বিক্রি করা হয়। প্রতিটি টিকিটের দাম ছিল ৩৫ হাজার টাকা। সে হিসেবে মোট টিকিট বিক্রি হয়েছে ৩৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সেদিন পুরস্কার দেয়া হয় ১৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা। বাকি ১৮ লাখ ১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। গত ১ নভেম্বরও ৯৫ আসনের টিকিট ৩৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করে একইভাবে ১৮ লাখ ১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়।

এরপর ৮ নভেম্বর প্রতিটি ৩৫ হাজার টাকা করে ১০৬টি আসনের টিকিট বিক্রি করা হয় ৩৭ লাখ ১০ হাজার টাকায়। সেদিন ১৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকার পুরস্কার দেয়া হয়। বাকি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।

হারেছ লেকে ২২ নভেম্বর ৯৫ আসনের জন্য টিকিট বিক্রি থেকে আসে ৩৮ লাখ টাকা। প্রতিটি টিকিটের দাম ছিল ৪০ হাজার টাকা। সেদিন পুরস্কার দেয়া হয় ১৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। বাকি ২০ লাখ ৪৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আয়োজকরা।

২৯ নভেম্বর প্রতিটি টিকিট বিক্রি করা হয় ৪৫ হাজার টাকায়। সেদিন ৯৫টি টিকিট বিক্রি থেকে আসে ৪২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আর পুরস্কার দেয়া হয় ১৯ লাখ ২৪ হাজার টাকার। সে হিসেবে ২৩ লাখ ৫১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।

সর্বশেষ গত ৬ ডিসেম্বর হারেছ লেকে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকায় প্রতিটি টিকিট বিক্রি করা হয়। ৯৫ আসনের টিকিট বিক্রি করে আয়োজকরা আয় করেছে ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। সেদিন পুরস্কার দেয়া হয় ১৫ লাখ ৭০ হাজার টাকার। বাকি ১৯ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আয়োজকরা।

মৎস্য শিকারী সুরজ আলী বলেন, বড়শি দিয়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা হল এক ধরনের জুয়া খেলা। এর চেয়ে বড় জুয়া আর নেই। হারেছ লেকে টিকিটের দাম পড়ে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। দেশের কিছু জায়গায় লাখ টাকায়ও টিকিট কিনতে হয়। এই জুয়াই অনেকে ফকির হচ্ছে।

এরপর লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নূর-এ-জান্নাত রুমি’র বলেন, হারেছ লেকে মাছ ধরা বন্ধের জন্য এই মাত্র ডিসি স্যারের নির্দেশনা পেয়েছি। সেখানে মাছ ধরা বন্ধের জন্য লামা থানার ওসি সাহেবকে আমি বলেছি।

এ ব্যাপারে লামার হারেছ লেকের কথিত মালিক হারেছের যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হারেছ লেকে মৎস্য শিকারে যাওয়া লোকজনদের জানানো হয়, মাছ শিকারের জন্য বান্দরবানের জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি নেয়া হয়েছে, কাজেই এখানে কোনো ধরনের সমস্যা নেই।

এ বিষয়ে রোববার বিকেলে বান্দরবান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জুয়া খেলার জন্য আমি কিভাবে অনুমোদন দেব? অনুমোদন যদি দিয়ে থাকি মাছ ধরার জন্য দিয়েছি, মাছ তো ধরতেই পারে। অনুমোদন দিয়েছি কিনা সেটা খোঁজ নিয়ে পরে জানাতে পারবো।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।