বান্দরবানে মহাজোটের অস্তিত্ব নেই !

সামনেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, আর এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের অন্য জেলার মত সবুজ পাহাড়ে ঘেরা পার্বত্য জেলা বান্দরবানে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। নির্বাচনকে ঘিরে মহাজোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি পৃথক পৃথক ভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি খ্যাত বান্দরবান ৩০০নং আসনটি দখলে রাখতে চাই আওয়ামীলীগ, অন্যদিকে ভোট ব্যাংক না থাকলেও জোটের শরিক দল হিসাবে আসনটি দখলে নিতে চাই জাতীয় পার্টিও।
রাজনৈতিক সহাবস্থান ও সম্প্রিতির জেলা হিসাবে পরিচিত দেশের সর্বশেষ ৩০০নং আসন বান্দরবানে বাঙালীদের সাথে ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির বসবাস। ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত জেলার একমাত্র সংসদীয় আসন বান্দরবান। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এবং মার্জিত ব্যবহারের কারণে টানা ৫ম বারের মতো নির্বাচিত সংসদ সদস্য বীর বাহাদুরের কদর সর্বত্র। দীর্ঘ সময় ক্ষমতাসীন থাকার কারনে দৃশ্যমান উন্নয়নের কারনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক অর্জন রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের তৃণমুলের রাজনীতিতে দলীয় কোন্দল, বিদ্রোহী প্রার্থীর সম্ভবনা রয়েছে। তাছাড়াও জাতীয় পার্টি ইতিমধ্যে আলাদা প্রার্থী ঘোষনা করার কারনে আওয়ামী লীগকে তেমন বেকায়দায় পড়তে হবেনা। কারন বিগত পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আলাদা প্রার্থী দিলেও কোন নির্বাচনে তাদের একজন প্রার্থীও জয় লাভ করতে পারেনি।
আরো জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪দলীয় মহাজোটের ব্যানারে সারা দেশে নির্বাচনমুখি কর্মতৎপরতা চলে আসলে বান্দরবান আসনে একদিকে মহাজোটের অস্তিত্ব নেই, অন্যদিকে মহাজোটের মধ্যে আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এর রাজনীতি থাকলে তাদের অবস্থান দুই মেরুতে, তাই উভয় দলেই ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থী ঘোষনা করেছে, নেই জোট ভিত্তিক রাজনীতি।
সং¤িøষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন জোট ১৪টি দল নিয়ে গঠিত হলেও জোট প্রধান আওয়ামী লীগসহ মূলত দল রয়েছে ১৪টি দল। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ছাড়া, জাসদ (ইনু), বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টি-জেপি (মঞ্জু), তরিকত ফেডারেশন, ন্যাপ (মোজাফফর), গণতন্ত্রী পার্টি ও সাম্যবাদী দল, গণ আজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, বাসদ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র এবং জাসদ (আম্বিয়া) এসব দলের কোন রাজনৈতিক কার্যক্রম নেই। ১৪ দলভুক্ত জাতীয় পার্টির (এরশাদ) কিছুটা সক্রিয় থাকলেও তাদের তেমন ভোট ব্যাংক নেই।
আরো জানা গেছে, অপরদিকে ১৪ দলভুক্ত দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ ছাড়া,জাতীয় পার্টি সক্রিয় বা তৎপর নয়। এমনকি কেবল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোরই সাংগঠনিক ভিত বা কাঠামো খুবই শক্তিশালী এবং পুরো জেলার ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত রয়েছে তৎপরতা, এর বিপরীতে জাতীয় পার্টি অবস্থান উপজেলাগুলোতে বেশ দূর্বল।
পার্বত্য জেলায় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত বান্দরবান আসন ধরে রাখতে মরিয়া আওয়ামী লীগ। ইতিমধ্যে দলের সহযোগী সংগঠনগুলো প্রচারণার জন্য পৃথক পৃথক ভাবে কমিটি করে যাচ্ছেন ভোটারদের দূয়ারে। দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে প্রসন্ন কান্তি তংচঙ্গ্যা থাকার সম্ভবনা থাকলেও বান্দরবান আসনে আওয়ামী লীগ থেকে টানা ৫বার নির্বাচিত বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি’র দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষনা করা নাহলে অনেকটা নিশ্চিত এবারও তিনিই আওয়ামী লীগের প্রার্থী। আর তার সাথে মূল প্রতিদ্বন্ধিতা হবে বিএনপির প্রার্থীর সাথে। অন্যদিকে জেলার রাজনীতির মাঠের গুঞ্জন আর সমিকরণ নিয়ে এখন থেকেই কখনও সরব, কখনও নিরবে নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনীতি জমে উঠেছে, সম্ভব্য প্রার্থীরা হয়ে উঠেছেন তৎপর।
সূত্রে জানা যায়, ৩০০ নং আসনের মোট ভোটার সংখ্যা: ২ লক্ষ ৪০ হাজার ৬৫০জন। মহিলা: ১লক্ষ ১৪ হাজার ৬৯৩। পুরুষ: ১লক্ষ ২৫ হাজার ৯৫৭জন। মোট জনসংখ্যা ৪ লক্ষ,৪ হাজার ৯৩জন। জেলার আয়তন : ৪হাজার ৪শ ৭৯ দশমিক ০১। নির্বাচনী আসনের আয়তন: ৪হাজার ৪শ ৭৯ দশমিক ০১।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে দলের বহিষ্কৃত সাবেক জেলা সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তংচঙ্গ্যা প্রতিদ্বন্ধিতা করে ৩৩ হাজার ভোট পান। রাজনীতির মাঠে ক্লিন ইমেজের কারনে বীর বাহাদুর টানা পঞ্চমবারের মতো তাঁর ধারাবাহিক বিজয় অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হন। কেন্দ্রিয় আওয়ামী লীগের তিনবার নির্বাচিত সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর এরপর থেকেই রাজনীতির মাঠে আরো সময় দিয়ে, শহর থেকে দূর্গম এলাকায় নজর কাড়া উন্নয়ন, জনগনের আরো কাছে গিয়ে নিজেকে আরো জনপ্রিয় হিসাবে জানান দেন। আর এই জনপ্রিয়তাকেই পুঁজি করে ৬ষ্ট বারের মতো নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসতে পারেন আওয়ামী লীগের একমাত্র প্রার্থী বীর বাহাদুর। আর এবারও দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন, আওয়ামীলীগের বহিষ্কৃত সাবেক জেলা সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তংচঙ্গ্যা।
এই ব্যাপারে আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাবেক জেলা সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তংচঙ্গ্যা বলেন, আমি দলীয় সভানেত্রী ও দল থেকে মনোনয়ন চাইবো। যদি মনোনয়ন না দেয়, সমস্যা নেই, দল থেকে অন্য যে কাউকে মনোনয়ন দিলে সেক্ষেত্রে দলের প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করবো।
এদিকে সংগঠন বিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মনগড়া সিন্ধান্ত নিয়ে দলীয় সুনাম ক্ষুন্ন করায় ২০১৩ সালের ২রা ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তংচঙ্গ্যাকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন। ২০১৫ সালের জুন মাসে জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে হামলার অভিযোগে দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক কাজি মুজিবুর রহমানসহ ২২ নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রসন্ন-মুজিব দুইজন দুই মেরুর বাসিন্দা হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহন করলেও গত বছরের ৯ ডিসেম্বর কক্সবাজারের একটি হোটেলে বহিষ্কৃত প্রসন্ন কান্তি তংচঙ্গ্যা ও কাজি মুজিবুর রহমান বৈঠক করেন এবং বীর বাহাদুরের বিরুদ্ধে প্রার্থী দাড় করানোর জন্য প্রস্তুতি নেন,যা এখনও অব্যাহত আছে।
জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক লক্ষী পদ দাশ বলেন, প্রসন্ন, মুজিব দলে থাকা অবস্থায় আমরা একটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জয়ী হতে পারিনি। তাদের বহিষ্কারের পর ৩৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ২৯টিতে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়,২টি পৌরসভায় জয়ী হয়েছে, তাদের যদি কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হয় তাহলেও বীর বাহাদুরের আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে কোন প্রভাব পড়বেনা।
এদিকে দলের বিরুদ্ধে ও দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র রুখে দিতে গত ২৬জুলাই বান্দরবান শহরের অরুণ সারকী টাউন হলে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় তৃনমূলের দাবীর প্রেক্ষিতে সর্ব সম্মতি ক্রমে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং বিগত সময়ের মতো আগামী নির্বাচনেও যেকোন মূল্যে দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করা হবে বলে ঘোষনা করা হয়।
দলটির নেতাকর্মীরা বীর বাহাদুরের ক্লিন ইমেজ, রুমা সাঙ্গু সেতু নির্মান,থানচি সাঙ্গু সেতু নির্মান ও থানচি উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহসহ স্থানীয়দের স্বপ্নের শত শত উন্নয়ন কাজগুলো এলাকার হোম টু হোম দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মকান্ড জনগনের সামনে তুলে ধরে এখন থেকেই নির্বাচনে নিজেদের ঘাঁটি অক্ষুন্ন রাখতে কাজ করে যাচ্ছে।
বান্দরবান জেলা আওয়ামীলীগের সহ- সভাপতি একে এম জাহাঙ্গীর বলেন, জাতীয় পার্টির প্রভাব নেই, দলে কোন সংকট নেই, অতীতে দলের সাথে বেইমানী করে অনেকে প্রার্থী হলেও তারা পারেনি, তারা সাকসেস হয়নি। সামনেও কেউ নির্বাচনে দাড়ালে হবেনা এবং নির্বাচনে বীর বাহাদুর এই নির্বাচিত হবেন।
এদিকে গত ১অক্টোবর বান্দরবান জেলা জাতীয় পার্টির (এরশাদ) দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন শহরের উজানী পাড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলনে এসময় বান্দরবান ৩০০নং আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর হিসাবে ক্যশৈ অং মারমা এর নাম ঘোষনা করা হয়।
এ উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টি চট্টগাম মহানগর ও প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি সভাপতি আলহাজ্ব মো: সোলায়মান আলম শেঠ, জাতীয় পার্টি নির্বাহী সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর সাধারন সম্পাদক এয়াকুব হোসেন, চট্টগ্রাম মহানগর সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম আবছার উদ্দিন রনিসহ জেলা ও উপজেলা নেতৃবৃন্দরা। সভায় মো: সোলায়মান আলম শেঠ ৩০০নং আসন থেকে এবার বান্দরবান জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি ক্যশৈ অং মারমাকে দলের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।
জাতীয় পার্টি (এরশাদ) বান্দরবান জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শওকত জামান মিশু বলেন, আমাদের জেলা সভাপতিকে আমরা প্রার্থী হিসাবে ঘোষনা দিয়েছি, আমাদের অবস্থান বান্দরবানে অনেক উন্নত হয়েছে, আমরা যদি একক ভাবে নির্বাচন করি তাহলে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবো।
তবে স্থানীয়রা মনে করেন,বান্দরবানের রাজনীতিতে জোট মহাজোটের প্রভাব না থাকলেও ভোটের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব রাখে আঞ্চলিক দলগুলো। তবে মূল লড়ায় হবে আওয়ামীলীগ ও বিএনপির মধ্যে। যারাই আঞ্চলিক দলগুলোর ভোটব্যাংক নিজেদের আয়ত্তে নিতে পারবে তারাই শেষ হাসি হাসবে। তবে নির্বাচনে শেষ হাসি কে হাসবে,তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচন পর্যন্ত।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।