বান্দরবানে ম্যালেরিয়া সংক্রমণের হার বৃদ্ধি : ৭ মাসে ৮ হাজার রোগী সনাক্ত : ৪ জনের মৃত্যু

বান্দরবান জেলায় ম্যালেরিয়া সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ৭ মাসে আট হাজার ম্যালেরিয়া রোগী সনাক্ত হয়। এর মধ্যে শিশুসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার থানচি ও আলীকদম উপজেলায় ম্যালেরিয়া রোগের সংক্রমণের হার বেশি। এতে করে দেশে ম্যালেরিয়া সংক্রমণের ১৩ জেলার মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বান্দরবান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ম্যালেরিয়া আক্রমণজনিত কারণে মৃত্যুর হার কম হলেও সংক্রমণের হার বেড়েই চলেছে। এপ্রিল মাস থেকে ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে এক জরুরী ওঠে এসেছে। তবে আগস্ট মাস থেকে কিছুটা কমে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যথাযথভাবে মশারি ব্যবহারসহ সচেতনতার অভাবেই এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনসচেতনতা।
বান্দরবান সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সার্ভিলেন্স মেডিকেল অফিসার ডা. সোহেল ফরাজি জানান, জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় বান্দরবানে সরকার, ব্র্যাক, একতা মহিলা সমিতি ও ঘরণী নামক এনজিও ম্যালেরিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। এসব সংস্থাগুলো জেলার ৭টি উপজেলায় আরডিটি ও স্লাইডের মাধ্যমে ৬৫ হাজার রোগীর রক্ত পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৮ হাজার রোগীর দেহে ম্যালেরিয়া সনাক্ত হয়। আর লামা, আলীকদম ও থানচিতে মারা যায় ৪ জন রোগী, বাকিরা চিকিৎসায় সুস্থ হয়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ম্যালেরিয়ার পেছনে রয়েছে ‘প্লাজমোডিয়াম’ নামে এক পরজীবী। আক্রান্ত লোকের রক্ত যখন শুষে নেয় স্ত্রী অ্যানোফিলিশ মশা, আর সেই মশা যখন অন্য লোককে কামড়ায়, তখন ওই পরজীবী স্থানান্তরিত হয় সুস্থ মানুষের দেহে, এভাবে ঘটে ম্যালেরিয়ার আক্রমণ। ম্যালেরিয়া যেমন প্রতিরোধসাধ্য, তেমনি নিরাময়যোগ্য। আবার যথাযথ চিকিৎসা না হলে রোগের পরিণতি হয় মারাত্মক। মানুষের মধ্যে রক্তশূন্যতা, কম ওজন নিয়ে শিশুর জন্ম, অকাল প্রসব, নবজাতকের মৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর বড় কারণ হয় ম্যালেরিয়া।
একতা মহিলা সমিতির ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীর ম্যানেজার আবুল কালাম বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য একতা মহিলা সমিতিসহ অন্য সংস্থার মাধ্যমে জেলার প্রতিটি পরিবারের পাশাপাশি পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, ছাত্রাবাস, অনাথ আশ্রমে কীটনাশক যুক্ত মশারি বিতরণ করা হয়। কীটনাশকযুক্ত মশারির মেয়াদ থাকে ৩ বছর। এজন্য প্রতি ৩ বছর পর প্রতিটি পরিবারের মাঝে কীটনাশক যুক্ত মশারি বিতরণ করা হচ্ছে। কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণের পাশাপাশি আলীকদম, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা ও রোয়াংছড়ির দুর্গম এলাকায় আইআরএস কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ হাজার ৭ শত ২৪ পরিবারের মাঝে স্প্রে করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত ৭ মাসে একতা মহিলা সমিতির মাধ্যমে ১১ হাজার ৩৯৪জন রোগীর রক্ত পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে ৬৭২ জন রোগীর দেহে ম্যালেরিয়া সনাক্ত হয়। একই ভাবে অন্য সংস্থাগুলোর রক্ষ পরীক্ষায়ও রোগীর দেহে ম্যালেরিয়া সনাক্ত হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে ম্যালেরিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ক্লিনিক স্থাপনের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া রোগী চিহ্নিত করার পর বিনা পয়সায় চিকিৎসা ও ঔষুধ প্রদান করছে বলেও জানান তিনি।
লামা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার শফিউর রহমান মজুমদার বলেন, পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন গর্ত, ডোবা, ঝোপঝাড় ও ছড়ায় পানি জমে মশার প্রজনন হয়ে থাকে। তাই সন্ধ্যা থেকেই মশারি ব্যবহার, বসত ঘরের আশপাশের ঝোপঝাড়, গর্ত, ডোবা পরিষ্কার রাখতে হবে, তবেই এ রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
এ বিষয়ে বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. অংশৈ প্রু বলেন, বর্তমান সময়ে ম্যালেরিয়া রোগ বিস্তারের জন্য পিগ পিরিয়ড। এ সময় রোগ নিরূপন এবং চিকিৎসার ব্যাপারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ম্যালেরিয়া জীবানুবাহী মশার বংশ বিস্তার ধ্বংস করতে হবে। ম্যালেরিয়া রোগ থেকে বাঁচার জন্য জনগনকে আরও বেশি বেশি সচেতন হতে হবে।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।