বেড়াল : শহুরে; বহু রে !

কুকুরের প্রভুভক্তির বিশেষ সুনাম আছে। আর বেড়ালের? আছে নির্লজ্জতার বদনাম।বেড়ালকে তাড়িয়ে দিলেও নাকি ঘর চিনে ঠিকই চলে আসে।গ্রামে-গঞ্জে এ কথার প্রচলন ঘরে ঘরে। ১২০০০ বছরের বেশি সময় ধরে গৃহপালিত থাকার ইতিহাসও ঘোঁচাতে পারে নি এ দুর্নাম। বেড়ালের আবার দুই ভাগ।শহুরে আর গ্রাম্য।শহুরে বেড়ালের হাব ভাব একটু আলাদা। কাটাবনের খাঁচা থেকে নরম তুলতুলে বিছানা… শহুরে বেড়ালরা একটু আয়েশে কাটায় তাদের মালিকদের মতই। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বিদেশী।
কিভাবে কবে তা জানি না, তবে এদের মধ্যে ফটোজেনিক হওয়ার রোগও যে ঢুকেছে,তা আমার তোলা ছবিগুলো দেখলেই বুঝবেন।
পশু-পাখি ভালবাসি;সেই শৈশব থেকেই। ছেলেবেলায় গ্রামের বাড়িতে ডাইনিং টেবিলে বিড়ালের অবাধ বিচরণ দেখে মনে করতাম, এরা পরিবারেরই কেউ। কারণ, যতই লেজ নাড়িয়ে আনুগত্য জানাক, কুকুরের এ অধিকার ছিল না। তবে, শহুরে জীবনে এসে কুকুরেরা এ প্রিভিলেজও পাচ্ছে। অবলা প্রাণীগুলো জীবনের সাথে মিশেছে গ্রামে-শহরে সবখানে। তাই তো পণ্য নির্ভর সমাজে ওদেরকেও ব্যবহার করা হচ্ছে চোখের সামনে, কিন্তু অগোচরে। প্রথম ১৯০৩ সালে ভিডিওতে বিড়ালের ইনফোগ্রাফিত ব্যবহৃত হয়; দ্যা সিক কিটেন নামের এক সাইলেন্ট মুভিতে। বেড়ালকে ওষুধ খাওয়ানোর ভিডিওটা ছিল বাচ্চাদের ঔষধ খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ার জন্য। টম এন্ড জেরির টম যে একটা বিড়াল তা মাঝে মাঝে ভুলেই যাই;এত মানবিক গুন ওর মাঝে!
আর সাম্প্রতিক সময়ের টকিং টম তো আমাদেরই আয়না।যা বলি, তা ফিরিয়ে দিয়ে বোঝায়, তোমাতে-আমাতে পার্থক্য…যৎসামান্যই। এডগার এলান পো’র দ্যা ব্ল্যাক ক্যাট গল্পটা পড়েছেন? গা শিউরে অনুভূতি তৈরি করেছিল ঐ বিড়ালই। হ্যালো কিটি স্টিকারে ছেয়ে যাওয়া কিটেনটিও একটি বিড়াল! এবার ইতিহাসে চোখ ফেরাই। বিড়ালের ঘরোয়া হওয়ার শুরুটা মিশরে। সেখানে বিড়াল ছিল আরাধনার বিষয়। বিড়ালের মমিও মিলবে বহু। বিড়াল মারলে তো সরাসরি মৃত্যুদন্ডের বিধানই ছিল! নিষিদ্ধ ছিল মিশরের বাইরে বিড়াল বিক্রিও। তবে থেমে থাকে না কিছুই। রোমান সভ্যতায় এই বিড়ালই মুক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। বিপত্তিটা বাধে মধ্যযুগে এসে। ইউরোপে এসে বিড়াল হয়ে যায় ডাইনি আর কালোজাদুর দোসর। দ্যা গ্রেট প্লেগের সময় বাধে অন্যরকম প্যাঁচ। সংক্রমনের কারণ ভেবে হত্যা করা হয় শ’য়ে শ’য়ে বিড়াল। তবে, এতে হয়েছিল হিতে-বিপরীত! কারণ,রোগ ছড়ানোর মূল কারণ ছিল ইদুঁর। আর, অসংখ্য বিড়াল মারার ফলে ইদূঁরের দৌরাত্ম্য বেড়েছিলো অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। যাই হোক, অতীতের আরাধনা থেকে হত্যা, এসব কট্টর ব্যাপার-স্যাপার থেকে বিড়াল-কাহনকে বের করা গেছে।
এখন গ্রামীন-শহুরে সমাজে সাধারন অণুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিড়াল। সেই সাথে অবলা এসব জীবের পাশে দাঁড়াচ্ছে তরুন প্রজন্ম, সোশ্যাল মিডিয়া সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। শেষে এসে শুরুর গল্প বলি। কিভাবে অন্দরমহলে এলো বাঘের মাসি? কুকুরের তো কারণ ছিল, যখন থেকে শিকার, তখন থেকেইে সঙ্গী কুকুর। বিড়ালেরও কারণ আছে। যখন থেকে শষ্য সংগ্রহ, তখন থেকেই ইঁদুর। তাই, ইঁদুর ঠেকাতে তখন থেকেই গৃহপালিত হলো বিড়াল। প্রথম দুই ছবির দু’টো বেড়ালের সঙ্গে আজ পথ চলতে দেখা।তৃতীয় ছবির বিড়ালটি নওগাঁর কোনো এক গ্রামের।গতমাসে তুলেছিলাম ছবিটা।ওরাও আমাকে চেনে না। আমিও ওদের চিনি না। হয়ত এই অচেনা পথচলাতেই লেখার অনুপ্রেরণা পেলাম। শহরে ইঁদুর কমে যাওয়াতে বিড়ারগুলো একটু অলস সময়ই পার করে। এখন তো আবার কম্পিউটারে লেগেছে যান্ত্রিক ইঁদুর; মাউস। তবে, বিশ্বের কোথাও তাতে গৃহপালিত বিড়ালের কদর কমে নি একটুও। পঞ্চাশ কোটি গৃহপালিত বিড়াল আছে এ জগতে! শেষ করবো শৈশবের এক আতঙ্ক দিয়ে। এখনও বিড়াল দেখলেই আনমনে জিজ্ঞেস করি,” শোন্ তো! ডিপথেরিয়া টা কি জিনিষ? তোরা এটা ছড়াস কিভাবে???”
লেখক: মনদীপ ঘরাই
সহকারী কমিশনার (ভূমি)
এটুআই,প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংযুক্ত।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। পাহাড়বার্তার -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য পাহাড়বার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।