ভাঙ্গনে ছোট হচ্ছে লামার পৌর শহর : ১২ বছরেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি

লামায় মাতামুহুরী নদীর তীব্র ভাঙ্গনে বসতি ও ফসলি জমির বিলীনের একাংশ
মাতামুহুরী নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে ছোট হয়ে আসছে বান্দরবানের লামা পৌরসভা এলাকা। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের ভাঙ্গনেও লামা সদর, রুপসীপাড়া ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বিভিন্নস্থানের এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। ২০০২ সালে ভাঙ্গন রোধে প্রকল্প গ্রহন করা হলেও এই প্রকল্প আলোর মুখ না দেখায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ক্ষোভের শেষ নেই।
গত কয়েক বছরে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি, কবরস্থান, শশ্মান, সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসহ শতশত একর ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানেও পৌর এলাকার শত কোটি টাকার স্থাপনা ও ফসলি জমি নদী ভাঙ্গনের হুমকির মুখে রয়েছে। বিগত দিনে ক্ষতিগ্রস্থ জনসাধরণ ও লামা পৌরসভার পক্ষে এক আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গন রোধ, বন্যার কবল থেকে লামা শহর রক্ষার জন্য একাধিকবার প্রকল্প গ্রহন করে প্রাক্কলন তৈরী করে। সংশ্লিষ্টদের সাথে লবিং না থাকায় এর কোনটি অদ্যাবদি বাস্তবায়িত হয়নি। এতে করে প্রতি বছর নদী ভাঙ্গনে ক্ষতির পরিমান বেড়েই চলেছে।
আরো জানা গেছে, এ নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ করা না গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পুরো পৌরসভা এলাকা নয়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মানচিত্র পাল্টে যেতে পারে বলে অভিজ্ঞমহল আশংকা করছেন। তাই নদী ভাঙ্গন হাত থেকে রক্ষার জন্য নদী সংরক্ষন প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবী জানিয়েছেন লামা উপজেলাবাসী।
জানা যায়, লামা উপজেলাটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভৌগলিক অবস্থান ও জনসংখ্যার গুরুত্ব বিবেচনায় বান্দরবান জেলা সদরের পরেই এর স্থান। প্রতি বছর বর্ষা মৌসমে খরস্রোতা মাতামুহুরী নদী ও খালের করাল গ্রাসে দু’কূল ভেঙ্গে অধিবাসীদের সর্বশান্ত করে দেয়। নদীর ভাঙ্গনের পাশপাশি পাহাড়ি ঢলে নিমজ্জিত করে দেয় লামা শহরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। ক্ষয় ক্ষতির পরিমান দাড়ায় কোটি টাকারও বেশি। গত কয়েক বছরে অসংখ্য বাড়ি ঘর, সরকারি বেসরকারি স্থাপনা, রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভাট, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, ক্যায়াং নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
শীলেরতুয়া মার্মা পাড়ার বাসিন্দা মংপ্রæ মার্মা বলেন, পাড়ায় প্রায় ১০০টির মত পরিবার ছিল। গত কয়েক বছরের অব্যাহত মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গনে ১০টির বেশি ঘরবাড়িই বিলীন হয়ে গেছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে বাকি পরিবারসহ একটি বৌদ্ধ মন্দির বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এর মধ্যে সদ্য নির্মিত কোটি টাকা ব্যয়ে অংহ্লাপাড়া ও চাম্পাতলীস্থ ব্রীজ দুটিও ভাঙ্গনের কবলে রয়েছে। এছাড়া লামা পৌর শহরের বাজারপাড়া, উপজাতিদের শশ্মান, শীলেরতুয়া মার্মাপাড়া, লাইনঝিরি ফকিরপাড়া, হাজ্বী পাড়া, কুড়ালিয়ারটেক, স’মিল পাড়া, নয়াপাড়া, লামামুখ, রুপসীপাড়া ইউনিয়নের অংহ্লাপাড়া, উত্তর দরদরী নয়াপাড়া, মাষ্টার পাড়া, লামা সদর ইউনিয়নের মেরাখোলা, মিশনঘাট, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা বাজার, বগাইছড়ি, বনপুর বাজার এলাকার অংশসহ বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা ইতিমধ্যে গ্রাস করে নিয়েছে প্রমত্তা মাতামুহুরী। এসব স্থানে আরো শত শত পরিবার নদী ভাঙ্গন আতংকে দিন যাপন করছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এসব ঘরবাড়ি প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। নদী ভাঙ্গনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লামা বাজার পাড়া, শীলেরতুয়া মার্মা পাড়া, মেরাখোলা, বৈল্লারচর এলাকা। ইতিমধ্যে এসব গ্রামের অধিকাংশই বিলীন হয়ে গেছে।
লামা বাজার স’মিল পাড়ার বাসিন্দা আলী আকবর ও গৃহবধূ হোসনে আরা জানান, এক সময় ঘর থেকে নদী ছিল অনেক দূর। প্রতি বছর অব্যাহত ভাঙ্গনে এখন বসতঘরের কাছাকাছি। মনে হচ্ছে আগামী দু’এক বছরের মধ্যেই ঘরবাড়ি নদী গর্ভে বিলিন হয়ে যাবে। তাই জরুরী ভিত্তিতে নদী ভাঙ্গন রোধের ব্যবস্থা গ্রহন করা জরুরী হয়ে পড়েছে।
সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে নদীর ভাঙ্গন রোধে এলাকাবাসীর পক্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়। পি.এম’র স্পেশাল এ্যাফেয়ার্স বিভাগ থেকে সচিব পানি উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রন মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড ওই সময় একটি প্রকল্প গ্রহন করে প্রাক্কলনও তৈরি করেছিল। কিন্তু দু’যুগ সময় অতিবাহিত হতে চললেও সেই কাগজে প্রাক্কলনের এখন পর্যন্ত বাস্তবের মুখ দেখেনি এলাকাবাসী।
এছাড়া ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বান্দরবান সফরে আসলে মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গন রোধে কাজ করার জন্য ৬ কোটি টাকার বরাদ্ধ ঘোষণা করেন। লামাবাসী প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ৬ কোটি টাকার বরাদ্ধ কোথায় গেল তাও জানেনা এখন পর্যন্ত। সূত্রে প্রকাশ, পানি উন্নয়ন বোর্ড দেশের বিভিন্ন জেলায় নদী শাসন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে থাকে। অথচ বান্দরবান জেলাসহ জনবহুল লামা উপজেলার লাখ মানুষ সরকারের এ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০২ সালের ১৯ নভেম্বর লামা পৌরসভার স্বারক নং- লামা/পৌর/২০০২/৩৭০ মূলে বিস্তারিত উল্লেখ করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরাবর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লামা পৌর শহর রক্ষা বাঁধ নির্মানের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রীর নিকট একটি আবেদন জানানো হয়েছিল। তৎসময় জেলার দায়িত্ব প্রাপ্ত সরকারের মন্ত্রী তার পত্র নং- পবম/প্রতিমন্ত্রী/ডি.ও(৪)২০০২/২৭৭ তারিখ ২১ নভেম্বর ২০০২ ইং মূলে লামা পৌরসভায় বাঁধ নির্মানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লি¬ষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দিতে পানি সম্পদ মন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। এসবের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড লামা শহরকে নদী ভাঙ্গন ও বন্যার কবল থেকে রক্ষার জন্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরি করেছিলেন। কিন্তু স্থানীয়রা সেই প্রকল্পটির বাস্তব রুপ দেখেনি কোনদিন।
লামা উপজেলায় পাথরে ভরপুর, পাথর দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী ভাঙ্গন ঠেকানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। তাই উপজেলায় ভাঙ্গন ঠেকাতে নদীর দু’পাশে পাথর ঢালাই দিলে নদী ভাঙ্গন রোধ সম্ভব হবে বলে স্থানীয় অভিজ্ঞ মহল জানিয়েছেন।
মাতামুহুরী নদীর তীব্র ভাঙ্গনের সত্যতা স্বীকার করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান উপ-প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, মাতামুহুরী নদী ভাঙ্গনের বিষয়টি সরজমিন তদন্ত পুর্বক উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।