মাটিরাঙ্গায় শসার বাম্পার ফলন : রমজানের বাজারে হাসছে কৃষকের স্বপ্ন

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সাজ সাজ রব। সবুজ পাতার ফাঁকে হলুদ ফুল আর মাচায় ঝুলন্ত সতেজ শসা কৃষকের চোখেমুখে ফুটিয়ে তুলেছে তৃপ্তির হাসি। মূলত পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে এবার উপজেলায় শসার ব্যাপক আবাদ হয়েছে, আর বর্তমান বাজারদর দেখে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন বুনছেন স্থানীয় কৃষকরা।

​উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০ হেক্টর জমিতে শসার চাষ হয়েছিল, যেখান থেকে প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন উৎপাদন পাওয়া গিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সমপরিমাণ জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। তবে আধুনিক পদ্ধতি ও উন্নত জাত ব্যবহারের ফলে এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫০ মেট্রিক টন। উৎপাদন বৃদ্ধির এই ইতিবাচক ধারা স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করেছে।

​চড়পাড়া এলাকার পরিশ্রমী কৃষক আব্দুর রব এবারও তার ২২ শতক জমিতে শসার আবাদ করেছেন। তার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, মাচায় থোকায় থোকায় ঝুলছে কাঞ্চন, গ্রিণ বিউটি ও সাবিরা গোল্ডের মতো উন্নত জাতের শসা।

​বিনিয়োগ: জমি প্রস্তুত, বীজ, সার ও সেচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। ​আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রায় ১ লক্ষ টাকার শসা বিক্রির আশা করছেন তিনি।

​চড়পাড়ার কৃষক আব্দুর রব বলেন, “এবার আমি অনলাইন থেকে উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ করে শসার চাষ করেছি। কাঞ্চন, গ্রীণ বিউটি, সাবিরা ও সাবিরা গোল্ড জাতের বীজ ব্যবহার করেছি। শুরুতে একটু শঙ্কা ছিল অনলাইন থেকে বীজ নেওয়ায় ফলন কেমন হবে তা নিয়ে ভাবনা ছিল। কিন্তু গাছ বড় হওয়ার পর দেখলাম, লতা খুব ভালোভাবে বেড়েছে, ফুলও প্রচুর এসেছে। এখন গাছে থোকায় থোকায় শসা ধরেছে।

NewsDetails_03

তিনি আরও বলেন, জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে সার, সেচ ও পরিচর্যায় যথেষ্ট যত্ন নিয়েছি। কৃষি অফিসের পরামর্শও অনুসরণ করেছি। আল্লাহর রহমতে গাছের অবস্থা এখন খুবই ভালো। বাজারেও বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে শসা বিক্রি করছি।

গোমতী এলাকার কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “এ বছর আমি ৩০ শতক জমিতে শসার আবাদ করেছি। শুরুতে কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল, তবে সময়মতো সেচের কারণে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে। এখন গাছে প্রচুর ফুল ও ফল এসেছে। প্রতিদিনই ক্ষেত থেকে শসা তুলছি।” তিনি আরও বলেন, “রমজান মাসে শসার চাহিদা বেশি থাকায় বাজারদরও ভালো পাচ্ছি। বর্তমানে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে খরচ ওঠার পাশাপাশি কিছু লাভের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।”

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, “এ বছর শসার আবাদ ও ফলন দুটোই আশানুরূপ হয়েছে। আমরা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি এবং চাষের শুরু থেকে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত সার্বিক পরামর্শ দিচ্ছি।” তিনি জানান, “উন্নত জাতের চারা নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, সময়মতো সেচ এবং রোগবালাই দমনে সচেতন থাকায় ফলন ভালো হয়েছে।

রমজানে ইফতারের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হওয়ায় শসার চাহিদা থাকে তুঙ্গে জানিয়ে ​মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, শসা বর্তমানে এই অঞ্চলের একটি অত্যন্ত লাভজনক ফসল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। তিনি বলেন, ​”আমরা কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও উন্নত জাত ব্যবহারে উৎসাহিত করছি। রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারে শসার বাড়তি চাহিদা থাকায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, যা সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।”

​সবুজ লতা আর হলুদ ফুলের মায়াবী হাতছানি কেবল প্রকৃতি নয়, বরং মাটিরাঙ্গার কৃষকদের ভাগ্য বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে এবার শসার বাম্পার ফলনে কৃষকের ঘরে উঠবে কাঙ্ক্ষিত অর্থ, আর রমজানের বাজারও থাকবে সতেজ শসায় ভরপুর।

আরও পড়ুন