যাদের কারনে উ চ হ্লা ভান্তের মৃত্যু নিয়ে এতো ধুম্রজাল

বৌদ্ধ ধর্মীয় ধর্মগুরু উ চ হ্লা ভান্তের মৃত্যুর দিনক্ষন নিয়ে ব্যাপক ধুম্রজাল তৈরী করে ভান্তের পরিবারের সদস্যরা এবং তার শিষ্যরা। আর এনিয়ে বান্দরবানসহ পার্বত্য জেলার মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কেন এতো ধুম্রজালের বিস্তার, কেন একজন ধর্মীয়গুরুকে এভাবে অশ্রদ্ধা করা হলো, লাশ বান্দরবানে আনতে দেরি ? আর এ নিয়ে এস বাসু দাশ এর বিশেষ প্রতিবেদন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১০এপ্রিল) চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় উ চ হ্লা ভান্তে মারা গেলেও তান্ত্রিক ক্ষমতার বলে তিনি জীবিত হবেন, কারন তন্ত্রমন্ত্র ও ঝাড়-ফু বিদ্যা নিয়ে চলা ভান্তে তার অনুসারীদের একাংশের মাঝে এই বিষয়টি জীবিত থাকাকালে প্রবল ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার আশা ও অন্ধবিশ্বাসে তার মৃত্যুর বিষয় প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকেন।

আরো জানা গেছে, শুক্রবার (১০ এপ্রিল) স্থানীয় একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তাদের রিপোর্টে ও সংবাদকর্মীরা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হলে এই ব্যাপারে বান্দরবানের সিনিয়র রাজনীতিবীদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) লাশ এনে বান্দরবানে ধর্মীয় ভাবে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার জন্য উদ্দ্যেগ গ্রহন করলেও কার্যত তারা তা অমান্য করে মূলত গুজব আর ধুম্রজালের সৃষ্টি করে।

পাহাড়বার্তার অনুসন্ধানে জানা যায়, শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ভান্তের মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশের বিষয় কয়েকজন ব্যক্তির বাধার কারনে ভেঙ্গে যায়। আর এই ব্যক্তিরা হলেন, ভান্তের পরিবারের সদস্য ভান্তের ভাই নু চ প্রু,কাস্টম কর্মকর্তা, চ থুই প্রু কালচারাল অফিসার, ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠি সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউট ও থুই থুই প্রু এনজিওতে কর্মরত এবং তাদের দুই বোন হ্লা হ্লা চিং, কি কি প্রু । তাদের মধ্যে, খিয়ংওয়া কিয়ং রাজ বিহারের সাধারণ সম্পাদক বাচ মং মার্মা, ভান্তের ভাই নু চ প্রু কাস্টম কর্মকর্তা ও বোন হ্লা হ্লা চিং সবচেয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহন করে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ভান্তে মৃত্যুবরণ করেনি, লাইফ সাপোর্টে আছে,আর তা ভান্তের শিষ্যদের নির্দেশ প্রদান করেন প্রচারের জন্য, আরো নির্দেশ দেন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ফোন বন্ধ করতে। আর এই নির্দেশ পাওয়ার পর তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভান্তের মৃত্যুবরণ করেনি বলে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেন। আর তাদের সাথে মিলে একই কাজটি করেন সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বান্দরবানের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক ডা: অং চালু।

তিনি গত শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাত ৭টা ৩১ মিনিটে পাহাড়বার্তা’র ফোনে মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার না করে ভান্তের লাইফ সাপোর্টে আছেন বলে ভান্তের ম্যানেজার শিবু নাথ বলেন, আমাদের কিছু শত্রু আছে, তারাই ভান্তেকে নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে। ভান্তে এখনও লাইফ সাপোর্টে আছেন। গত শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে পাহাড়বার্তাকে বান্দরবান পরিবার পরিকল্পণা বিভাগের উপ-পরিচালক অংচালু জানান, আমরা আগামী কাল (শনিবার) পর্যন্ত পর্যবেক্ষন করে লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসবো। কিন্তু সেদিন সিদ্ধান্ত হয়নি।

গত শনিবার (১১ এপ্রিল) রাত ৮ টা ১৫ মিনিটে ভান্তের লাইফ সাপোর্টে থাকার বিষয়ে উ চ হ্লা ভান্তের ম্যানেজার শিবু নাথ ফোনে বলেন, “ শ্রীমৎ উ পঞঞা জোত মহাথের এখনও লাইফ সাপোর্টে আছে, ৭২ ঘন্টা অতিক্রম হওয়ার পর ভান্তের শারীরিক পরিস্থিতি জানা যাবে ”। তিনি আরো বলেন, আগামী সোমবার সকাল ১০টায় লাইফ সাপোর্টের সময় শেষ হবে। কিন্তু সেই লাইফ সাপোর্ট সোমবার (১৩ এপ্রিল) খুলে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ঘোষনা করা হয়। এসময় ভান্তের লাশে পচন ধরে বলে জানায় হাসপাতাল সূত্র। অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বান্দরবানের সিভিল সার্জন অং সুই প্রু পাহাড়বার্তাকে বলেন, ভান্তে করোনায় মারা যাননি, যেদিন নিয়ে গেছে (শুক্রবার,১০ এপ্রিল) সেদিন মারা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ম্যাক্স হাসপাতালের একজন ডাক্তার পাহাড়বার্তাকে জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গত শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ভান্তেকে মৃত ঘোষনা করে লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য ভান্তের স্বজনদের বললেও তারা তা মানতে রাজি না হয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উপর চাপ প্রয়োগ করে ভান্তের স্বজন ও শিষ্যরা। এসময় তারা বিভিন্ন বিদেশী দূতাবাস ও সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে তদবির করে। আরো জানান, ভান্তের শিষ্যরা যত টাকা প্রয়োজন তা দিয়ে এই ধরণের একটি ম্যাক্স হাসপাতাল তৈরী করে দেবে বলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শাসান। অন্যদিকে মৃত্যুর বিষয়টি প্রকাশ না করতে শাসানোর পাশাপাশি হাসপাতালটি নজরদারীতে রাখেন শিষ্যদের দিয়ে।

এদিকে গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) ভান্তের নিজের মাতৃভূমি বান্দরবানে লাশ না এনে চট্টগ্রামের রাউজানের খৈয়াখালি বৌদ্ধ বিহারে লাশ নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তারা বান্দরবানের বৌদ্ধ অনুসারী শীর্ষ নেতাদের গোপন করে। আর এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভের দেখা যায় মার্মা সম্প্রদায়ের মধ্যে।

বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন,ভান্তের লাশ কখন আনা হবে, কারা নিয়ে আসবে তা এখনও তাদের কেউ আমাদের জানায়নি।

একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ধর্মীয়গুরুর মৃত্যু নিয়ে এতো ধুম্রজাল কেন এই ব্যাপারে উ চ হ্লা ভান্তের ভাই থুই থুই প্রু এর সাথে আজ শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ফোনে যোগাযোগ করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, অন্যদিকে আরেক ভাই চ থুই প্রু ও ভান্তের ম্যানেজার শিবু নাথের সাথে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেনি।

আরো প্রতিবেদন পড়তে চোখ রাখুন পাহাড়বার্তা’য়।

আরও পড়ুন
Loading...