যেকোনো কম্পিউটারে ঢুকতে পারবে সরকার

প্রয়োজন বোধ করলে তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো ব্যক্তি ও সংস্থার কম্পিউটারে প্রবেশ ও তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে সরকার। এক্ষেত্রে আগাম নোটিস দিতেও পারে, আবার বিনা নোটিসেও যেকোনো কম্পিউটারে ঢুকে তথ্য নিতে পারবে। এ কাজে কোনো বাধা দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে সরকার। এমনসব বিধান রেখে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।

খসড়া নিয়ে আগামী সোমবার আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রাপ্ত মতামতের ওপর ভিত্তি করে বিধিমালা চূড়ান্ত ও গেজেট জারি করা হবে। বিধিমালাটি চূড়ান্ত ও কার্যকর করা হলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন হবে বলে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব এন এম জিয়াউল আলম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে অনেক বিধিমালার কথা বলা আছে। প্রয়োজনে সেসব বিধিমালাও করা হবে। আমরা আপাতত ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি বিধিমালাটির খসড়া করেছি। সেই খসড়াটির ওপর আগামী সোমবার প্রথম আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হবে।’

২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষের আপত্তির মুখে গত বছর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে সরকার। মূলত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বিষয়গুলোকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৩২ ধারাসহ আরও কয়েকটি ধারায় বিন্যস্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ আগে ৫৭ ধারায় যা ছিল এখন নতুন আইনে তা বিভিন্ন ধারায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশাজীবীর মতো গণমাধ্যমকর্মীরাও প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকরা মানববন্ধন করেন।

গত বছর সংসদে পাস হওয়া এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনেই ডিজিটাল নিরাপত্তা বিধিমালার খসড়া করা হয়েছে। এ বিধিমালা ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি বিধিমালা নামে পরিচিত হবে। খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, এজেন্সির কার্যাবলি সম্পাদনে মহাপরিচালক অথবা তার মনোনীত কর্মকর্তা তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে প্রবেশ এবং তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। তিনি নোটিস দিয়েও যেকোনো তথ্য পরিকাঠামোতে প্রবেশ করতে পারবেন। কোনো ব্যক্তি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া এ কর্মকর্তাকে তথ্য পরিকাঠামোতে প্রবেশে বাধা দিতে পারবেন না। বাধা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এজেন্সির কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য একটি কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে খসড়া বিধিমালায়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব পদাধিকার বলে কমিটির চেয়ারম্যান হবেন। সদস্য হিসেবে থাকবেন ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালক, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, পুলিশ, র‌্যাব, এসবি, সিআইডি, পিবিআই, ডিজিএফআই, এনএসআইর প্রতিনিধি, বিটিআরসি প্রতিনিধি, বিসিসির প্রতিনিধি এবং এনটিএমসির প্রতিনিধি। ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির পরিচালক এই কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটি প্রতি দুই মাসে একবার বৈঠক করবে। এজেন্সি বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয়, বিভাগের কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট থেকে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে।

বিধিমালার অধীনে একটি ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হবে। ফরেনসিক ল্যাবের মান ও প্রতিবেদন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হতে হবে। ল্যাবের আইএসও সনদ থাকতে হবে। এই ল্যাবের দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য কম্পিউটার হ্যাকিং ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন, অক্সিজেন ফরেনসিক সার্টিফাইডসহ ইএনসিইপি সনদ থাকতে হবে। ফরেনসিক রিপোর্টে অভিযুক্ত ব্যক্তি সন্তুষ্ট না হলে, তিনি মহাপরিচালকের কাছে আবেদন করতে পারবেন। মহাপরিচালকের কাছে গ্রহণযোগ্য হলে তিনি ফরেনসিক রিপোর্ট পরীক্ষা করার জন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সির নিজস্ব ল্যাবে অথবা স্বীকৃত অন্য ল্যাব হতে বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ করতে পারবেন।

গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিরীক্ষা করার জন্য তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ক শ্রেণিতে রয়েছে রাষ্ট্রপতির দপ্তর, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। খ শ্রেণিতে জাতীয় ডাটা সেন্টার, ব্যাংক, বীমা কোম্পানি রয়েছে। গ শ্রেণিতে রয়েছে অন্যান্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। সংবাদমাধ্যম এই শ্রেণির আওতায় পড়ে।

ডিজিটাল জগতের হুমকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে জরুরি সাড়া দেওয়ার জন্য জাতীয় কম্পিউটার ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করা হবে। এই টিম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর জরুরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সাইবার বা ডিজিটাল হামলা হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। সম্ভাব্য ডিজিটাল হামলা প্রতিরোধের উদ্যোগ নেবে। এজেন্সি কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে প্রতিবেদন বা সতর্কীকরণ তথ্য প্রেরণ করতে পারবে। সংস্থাটি সব ডিজিটাল অপরাধের ঘটনার পরিসংখ্যান সংগ্রহ করবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহের কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠনের অনুমতি দেবে। সব টিম জাতীয় কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমকে ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করবে। এ তথ্য ডাটাবেইজে সংগৃহীত হবে। এসব তথ্য সব ইমার্জেন্স রেসপন্স টিম ব্যবহার করতে পারবে।

এজেন্সি বিভিন্ন লাইসেন্স দেবে। এই লাইসেন্সের জন্য ফি নির্ধারণ ও আদায় করবে। এজেন্সির নামে কোনো তফসিলি ব্যাংকে হিসাব থাকবে। মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এজেন্সির সব রেকর্ড, তথ্যভান্ডার ও অন্যান্য সম্পত্তি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পারবে। এজেন্সির যেকোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।