রুমার ফাঁকিবাজ যে শিক্ষককে বিরক্ত করতে নেই !

রুমার পাইন্দু ইউনিয়নের চান্দা হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চৌধুরী অমর বড়ুয়া
মাসে চার-পাঁচ দিন আসেন প্রধান শিক্ষক, কোনো মাসে ১০দিন। এভাবে সকালে এসে বিকালে চলে যান। তিনি যখনই বিদ্যালয়ে যান, তখনই অনুপস্থিতির দিনগুলো একসাথে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দিয়ে নেন। বিদ্যালয়ে নিয়মিত অনুপস্থিতির ব্যাপারে কেউ বললে তুমুল বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন সবার সাথে। অভিযোগ দিলেও তাঁর বিরুদ্ধে কিছুই হবে না, এমন হুঙ্কার, ক্ষমতা ও প্রভাব দেখিয়ে দেন এসএমসি‘র সভাপতিকেও। এতে এসএমসি‘র সভাপতি ও অভিভাবকেরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। টানা অনুপস্থিতির কারণে নিয়মিত পাঠ গ্রহন থেকে বঞ্চিত বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা, এইসব অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বান্দরবানের রুমায় পাইন্দু ইউনিয়নের চান্দা হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চৌধুরী অমর বড়ুয়া‘র চলমান দায়িত্ব পালনের চিত্র এটি।
গত শনিবার(১৬ ফেব্রুয়ারি) বিকাল দুইটায় ৪৮ মিনিটে এ প্রতিবেদক দ্বিতীয়বার সরেজমিনে গিয়ে চান্দা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছান। টিন সেডের তৈরি বিদ্যালয়টি তখনই বন্ধ ছিল। একটু গিয়ে দেখতে পান বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী মার্বেল খেলছিল। ঠিক ঘড়ির কাটায় তখন ৩টা ১মিনিট। তারা জানায় আজ (শনিবার) স্কুল বন্ধ। এর কারণ কেউ বলতে পারেনি।
একটু সামনে গিয়ে অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলার সময় উপস্থিত হন- বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি (এসএমসি)‘র সভাপতি মংপাই খয় মারমা(৫১)। তিনি শনিবার প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিতির কথা নিশ্চিত করে বলেন, প্রধান শিক্ষক তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, শনিবার হতে সোমবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত সরকারি ছুটি আছে। তাই মঙ্গলবার অর্থাৎ ১৯ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে আসলে ২০ ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয়ে এসে পৌঁছার কথা। সত্যিকার অর্থে সরকারি ভাবে বন্ধ কিনা জানেন না সভাপতি। এসময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক অভিভাবক ঠাট্টার সূরে বলে ওঠেন, আসার সম্ভাবনা নেই। ২০তারিখের পর ২১শে ফেব্রুয়ারি , পরের দিন শুক্রবার। এ আর কি! ফাঁকিবাজি। এসময় উপস্থিত ক‘জনের হাসির রোল পড়ে যায়।
সভাপতি মংপাই খয় বলেন, ২০১৭ সালে ডিসেম্বর মাসে চান্দা পাড়া বিদ্যালয়ে যোগদান করেন চৌধুরী অমর বড়ুয়া। যোগদানের পর মাস তিনেক মাসে ১৫-২০দিন ক্লাস করতেন। ২০১৮সাল, জুন মাসের আগে থেকে টানা পাঁচ-ছয় মাস। তখন প্রতি মাসে চার-পাঁচদিন বিদ্যালয়ে আসেন। ঠিকমত উপস্থিত হতে বলা হলেও বিভিন্ন অজুহাত ও আইন দেখান প্রধান শিক্ষক চৌধুরী অমর বড়ুয়া। অল্প কথায় বাক-বিতন্ডে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
সভাপতি মংপাই খয়ের ভাষ্যমতে, আমার (প্রধান শিক্ষক) বিরুদ্ধে কোথাও অভিযোগ দিলেও কোনো লাভ হবেনা। টিও, এটিও (উপজেলা শিক্ষা, উপজেলা সহকারি শিক্ষা অফিসার) আমাকে কিছু করবেনা, কাকে কি করতে হয়, সব আমি জানি। আমি সে ধরণের মানুষ। হুঙ্কার দিয়ে এমন কথা শুনার পর সভাপতি মংপাইখয় কিছুটা যেন ভীতির সাথে নিরাশ হয়ে পড়েন মংপাই।
সভাপতি বলেন, বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যান ও এটিও স্যারকে বেশ কয়েকবার জানিয়েছিলাম কিন্তু কিছুই হয়না। বিষয়টি দেখবেন,শুধু এ আশ্বাস পেয়ে বাড়ি ফেরেন এসএমসির সভাপতি মংপাই খয় মারমা।
নিয়মিত উপস্থিত না হলেও মাসিক প্রতিবেদনে(এমআর) স্বাক্ষর করেন কেন এপ্রশ্নে সভাপতি মংপাই বলেন, সহকারি শিক্ষক আমাকে অনুরোধ করছেন, তাই স্বাক্ষর দিয়েছি।
হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর
এর আগে গত ১১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে চান্দা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ প্রতিবেদক সরেজমিনে যান। ওই দিন প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে ছিলেন না। ওই সময় সহকারি শিক্ষক মংবাচিং দাবী করেন, তাঁর প্রধান শিক্ষক চৌধুরী অমর বড়ুয়া বিদ্যালয়ে অনিয়মিত আসেন, তা সঠিক নয়।
তবে শিক্ষার্থীরা অনেকে প্রধান শিক্ষকের নাম বলতে পারলেও তারা জানিয়েছে মাসে দুই -তিন দিনের বেশি আসেন না চৌধুরী অমর।
পাড়া প্রধান কারবারী পাইচিং অং মারমা(৬০) জানান, চা নাস্তা খাইয়ে বেশ কয়েকবার নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে বলা হলে হেডমাস্টার ভাল আচরণ করেন না। বেশি নিয়ম নীতির কথা শুনিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।
এই ব্যাপারে স্থানীয় কারবারী অং বলেন, চৌধুরী মাসে চার-পাঁচ দিনের বেশি আসছেন বলে মনে হয় না। এই চৌধুরী (প্রধান শিক্ষক চৌধুরী অমর বড়ুয়া) ছেলে-মেয়েদের প্রতি কোনো মায়া মমতাবোধ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক চৌধুরী অমর বড়ুয়া বলেছেন, চান্দা পাড়ার বাসিন্দা এক সহকারি শিক্ষক সম্প্রতি চলতি দায়িত্বে প্রধান শিক্ষক পদোন্নতি পাওয়া নুমং প্রু মারমা ও সহকারি শিক্ষক মংবাচিং মারমা, এ দুইজনের ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন তিনি। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, নুমং প্রু মারমা তাঁকে (চৌধুরী অমর) সরিয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে চান্দা পাড়ায় আসতে চান।
এসব ষড়যন্ত্রের কোনো তথ্য প্রমাণ বা বিষয়টি তাঁর উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন কিনা জানতে চাওয়া হলে চৌধুরী অমর এসব কথা কোথাও প্রমাণ থাকে নাকি? পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি।
বিদ্যালয়ে তাঁর অনুপস্থিতি এ প্রতিবেদকের হাতে প্রমাণ থাকার কথা জানিয়ে জানুয়ারি মাসে শেষ সপ্তাহে কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে চৌধুরী অমর বলেন, আমি অসুস্থ মানুষ। চান্দা পাড়ায় বেশি দিন থাকবো না, এখান থেকে চলে যাব। এ অল্প সময়ে তাঁকে বিরক্ত না করতে বলেন চৌধুরী অমর। সরেজমিন ও অনুসন্ধানের পর প্রধান শিক্ষক নিয়মিত অনুপস্থিতির প্রমাণ এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
সূত্রমতে, কোনো কারণ ব্যতীত চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে ৭,৯ ও ১১তারিখ বিদ্যালয়ের অনুপস্থিত ছিলেন প্রধান শিক্ষক চৌধুরী অমর বড়ুয়া।
সহকারি শিক্ষা অফিসার বিদ্যালয় পরিদর্শনে যাবেন, সে খবর পেলে ১২তারিখ সকালে বিদ্যালয়ে যান। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে পাঠদানের নিয়ম থাকলেও ১৪তারিখ দুপুরে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। তাও দাপ্তরিক কোনো অনুমোদন নেই। তাছাড়া জানুয়ারি মাসে টানা ১০দিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন।
এ বিষয়টি দাপ্তরিক কোনো ছুটি না নেয়ার কথা নিশ্চিত করেন উপজেলা সহকারি শিক্ষা অফিসার মংসিনু মারমা। তিনি বলেন কেউ লিখিত অভিযোগ বা বিদ্যালয়ের অনুপস্থিতির তথ্য প্রমাণ পেলে নিয়ম অনুযায়ি এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।