রুমায় পেঁপে চাষে অধিক আয়ের আশায় কৃষক মোতালেব

পেঁপে বাগানে কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ও কৃষক আব্দুল মোতালেব
হাইব্রীড পেঁপে চাষের সফলতা মুখ দেখছেন আব্দুল মোতালেব(৫৪)। বাজার থেকে বীজ কিনে এবার ব্যাপক আকারে করছেন রেড লেডি ও রেড রিগ্যান নামে হাইব্রীড পেঁপের চাষ । আবহাওয়া অনুকূল ও বাজারজাতে ভাল দাম পেলে আগামি আট মাসের মধ্যে ১৪ থেকে ১৬লাখ টাকা আয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বান্দরবানের রুমা বাজারের বাসিন্দা ও কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল মোতালেব। তিনি জানান, রুমা সদরে থানা পাড়া এলাকায় সাড়ে তিন একর জমিতে পেঁপে চাষ করেছেন। আট মাস আগে লাগানো চার হাজারের বেশি চারা এসব পেঁপে গাছে ধরা ফল এখন পরিপক্ক হয়ে গেছে। চলতি নভেম্বর মাস শেষ সপ্তাহ থেকে পাকা-কাচা বিক্রি শুরু হবে। গত বৃহস্পতিবার(৮নভেম্বর) বিকালে রুমা বাজারে জয়পাল বড়ুয়ার দোকানে খোলামেলায় আলাপচারিতায় কৃষক আব্দুল মোতালেব এসব কথা জানিয়েছেন।
এ প্রতিবেদক গত শুক্রবার সাড়ে তিনটায় সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখেন, বিশাল জায়গায় সারিবদ্ধ লাইনে খাটো ও কিছুটা লম্বা গাছে পেঁপে ফলন হয়েছে। জমিটি- সমতল বললে চলে। একটু ভিতরে গিয়ে এ প্রতিবেদক দেখতে পান, সামনে-পিঁছতে, ডানে-বামে সব গাছে ছোট-বড় আর মাঝারি ধরণের পেঁপের ফলন। অধিকাংশ গাছে খুঁটি গেড়ে থ্রেস দিয়ে রাখা হয়েছে। যা পেঁপে ফলন অধিক ওজনে গাছটি উপরে পড়ে না যায়। কিছু গাছের গোড়া থেকে ফল ধরেছে। গোড়ায় ধরা ফল মাটিতে লাগোয়া আছে।
সেখানে কাজ করেন এক শ্রমিকের নাম মোহাম্মদ ইসমাইল(৫২)। তিনি বলেন, প্রতি মাসে ১৪হাজার মাইনে আমরা দুইজন গত আট মাস যাবত এ বাগানে নিয়মিত কাজ করছি। তিনি আরো বলেন, মালিক চাইলে আরো টানা ৫-৬মাস এখানে কাজে লেগে থাকবো।
এসময় উপস্থিত হলেন পেঁপে বাগানের মালিক কৃষক আব্দুল মোতালেব(৫৪)। তিনি বলেন, আমার দুইটি বাগানে মোট চার হাজারের বেশি দুই জাতের হাইব্রীড পেঁপে চারা লাগিয়েছি। চারাগুলো সাত ফুট পর পর লাগানো। তবে একটি চারাও কেনা হয়নি। উন্নত হাইব্রীড বীজ বাজার থেকে কিনে নিয়ে এসে নিজের হাতে পলিথিন প্যাকেটে পেঁপে চারা উৎপন্ন করেছি। এতে প্রতিটি পকেটে দুই-তিনটি নষ্ট ছাড়া সব বীজ থেকেই চারা গজিয়ে ওঠে আসে। কম ক্ষতিতে লাভ বেশি হবে, একথাও বললেন কৃষক মোতালেব। এইসব কাজে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও মাঠ পর্যায়ে নিয়োজিত উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তার সার্বিক তত্ত্ববধান ও পরামর্শ প্রদানের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
চাষাবাদের ব্যয়ভার,ঝুঁকি ও ফলন উত্তোলন প্রসঙ্গে কৃষক আব্দুল মোতালেব বলেন,পেঁপে চাষের তিনটি ধাপে ভাগ করে হিসাব রাখার চেষ্টা করছি। প্রথমত; গর্ত খোঁড়া, জৈব সার সংগ্রহ ও প্রয়োগ এবং চারা উৎপন্ন করা। এসময় পরিশ্রম ও খরচ সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয়ত; গাছের রোগবালাই প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও পরিচর্যা করা। এ দুইটি ধাপে মাসিক বেতনে নিয়মিত দুইজন শ্রমিক ছাড়াও সময়মত দৈনিক সাত-আটজন শ্রমিক লাগিয়ে আমাকে কাজ করতে হয়েছে। তার সাথে ঝুঁকি-ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কৃষি বিভাগের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ ও পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত ওষুধ স্প্রে করছি। এ কারণেই আজকের এ ফলন। তাঁর ভাষ্যমতে, এ পর্যন্ত আনুমানিক সাড়ে ৫লাখ খেকে ৬লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে।
তিনি আরো বলেন, আগামি এক সপ্তাহ পর থেকে পেঁপে বিক্রি শুরু করতে পারবো। স্থানীয় বাজারে পাকা পেঁপে কেজি প্রতি ৩০-থেকে ৪০টাকায় বিক্রি করা যাবে। কাচা বিক্রি হবে-কেজিতে ২০টাকা। অনুকূল পরিবেশ থাকলে টানা ১৮মাস পেঁপের ফলন তোলা সম্ভব হবে। এসব ফলন ঠিকমতো বিক্রি করে ১৪ থেকে ১৬লাখ টাকা আয় হতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন কৃষক আব্দুল মোতালেব।
তবে পেঁপে ফলন বেশ ভাল হলেও আকারে সমান না হওয়ায় বাজারজাত নিয়ে কিছুটা চিন্তিত মোতালেব। তিনি বলেন, একটি পেঁপে যদি তিন থেকে চার কেজি হয়, তবে স্থানীয় কিংবা আগত পর্যটকেরা নিতে চায়না। প্রতিটি পেঁপে দেড় থেকে দুই কেজি হলে সহজে বিক্রি সুবিধা হয়। এসব কারণে চট্টগ্রামের আড়তদারের কাছে বিক্রি প্রচেষ্টায় যোগাযোগ করছেন বলে জানালেন তিনি।
পেঁপে চাষের উৎসাহ ও স্বপ্ন প্রশ্নে কৃষক মোতালেব আরো জানান,ছয় বছর আগে দেশের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশে নিজ ভিটায় প্রায় একশ পেঁপে চারা লাগান। তবে ফলন তোলার আগেই বন্যায় সব গাছ নষ্ট হয়ে যায়। তবে তিনি আশা ছাড়েননি। বলেন- রুমা বাজারে আমার নিজস্ব দোকান থাকায় অধিকাংশ সময় এখানে কাটে। গত তিন-চার বছর ৫০ থেকে একশ করে বিভিন্ন জায়গায় পেঁপে চাষাবাদ এখানে যথেষ্ট লাভের সম্ভাবনা আছে। তাই নিজে চাষাবাদের অভিজ্ঞতা ও কৃষি বিভাগের লোকজনের সার্বিক সহযোগিতায় এবার ব্যাপক আকারে করেছেন বলে জানালেন আব্দুল মোতালেব।
তিনি আরো বলেন, তার পেঁপে ফলন দেখে অন্য চাষিরাও পেঁপে চাষের উৎসাহিত হবেন। তাঁর এ কাজে ইতোমধ্যে অনেকজনকে পেঁপে চাষাবাদের উৎসহিতও করেছেন। একাজে সফলতা স্বরূপ রুমা থেকে ভবিষ্যতে কোনো কৃষক হয়তো একদিন সরকার প্রধানের নিকট পুরুস্কৃত হবে এটাই তাঁর এক মাত্র স্বপ্ন, জানালে তিনি।
মাঠ পর্যায়ে নিয়োজিত উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা সুতিমল তঞ্চঙ্গ্যা নাগা বলেন,রেড লেডি ও রেড রিগান নামে এই দুই জাতের হাইব্রীড পেঁপে চাষাবাদ করছেন কৃষক আব্দুল মোতালেব। হাইব্রীড পেঁপের মধ্যে রেড রিগান একেবারে গাছে গোড়া থেকে ফল ধরে। আমি মাঠ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করছি। ফলে তার পেঁপে চাষাবাদ ভাল ফলন হয়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,রুমা থেকে কোনো কৃষক কৃষি কাজে স্বীকৃতি স্বরূপ জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পেতে পারে, সেই প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কৃষি বিভাগের উদ্বুদ্ধ করার কারণে কৃষক আব্দুল মোতালেব উৎসাহিত হয়ে নিজ উদ্যোগে বড় পরিসর সাত কানি জমিতে এক সাথে চার হাজারেরও বেশি পেঁপে চারা লাগিয়ে চাষাবাদ করছেন। এটা শুধু রুমা নয়,সবজি বিপ্লবের বান্দরবান পার্বত্য জেলা তথা দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে বলে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।