লামায় আশা জাগিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিরাপদ প্রসূতি সেবা

প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার প্রায় দেড় লাখেরও বেশি পাহাড়ি বাঙ্গালী মানুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ভরসা লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। নানা জটিলতা, অপারেশন থিয়েটারের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসকের অভাবে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেটিতে ছিলনা কোন ধরনের অপারেশন কার্যক্রম। ফলে প্রতিনিয়ত ব্যাহত হয়ে আসছিল স্বাস্থ্য সেবা। সবচেয়ে বেশি বেহাল দশার সৃষ্টি হয় প্রসূতি সেবার। প্রতিনিয়ত চরম বিপাকে পড়তে হয় হাসপাতালে আসা প্রসূতিদের। সম্প্রতি এতে যোগ হয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, লোকবল ও যন্ত্রপাতি। এতে সংকট কাটিয়ে বিশেষ করে সচল হয়েছে প্রসূতী মায়েদের জন্য অপারেশন থিয়েটার। শুরু হয় গর্ভবর্তীদের নরমাল ও সিজারিয়ান ডেলিভারি কার্যক্রম। যা বর্তমানে উপজেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে।

গত নভেম্বর মাস থেকে রেকর্ড সংখ্যক গর্ভবর্তী মায়ের সফল ডেলিভারি সম্পন্ন হয় এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। যা তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে প্রথম। এ পরিসংখ্যান থেকেই উঠে আসে বর্তমানে প্রসূতি নারীদের জন্য কতোটুকু নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি।

জানা গেছে, ৫০ শয্যবিশিষ্ট লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি বিভিন্ন অনিয়ম, অবহেলা ও প্রয়োজনীয় লোকবলসহ যন্ত্রপাতির অভাবে ভোগান্তির শেষ ছিল না এখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের। সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই উপজেলার বাইরে পাঠানো হত রোগীকে। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়ের ক্ষেত্রে এ প্রচলন ছিল বেশি। যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসক সংকট কাটিয়ে গত নভেম্বর মাস থেকে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শুরু হয় গর্ভবর্তী মা’দের ডেলিভারি কার্যক্রম।

সে মতে ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে অপারেশন থিয়েটার চালু হওয়ার সাথে সাথে জরুরী প্রয়োজনে নভেম্বর মাসে ২জন ও ডিসেম্বর মাসে ১৪জন মা’কে নিরাপদ অস্ত্রোপচার করে সন্তান ডেলিভারি করাতে সক্ষম হয়। ২০২২ সালের জানুয়ারী মাসে নরমাল ডেলিভারী হয় ২৬টি ও সিজারিয়ান ডেলিভারি হয় ৩টি। ফেব্রুয়ারী মাসে নরমাল ২৯টি ও সিজারিয়ান ডেলিভারি হয় ৪টি। সর্বশেষ ৪ মার্চ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সর্বশেষ শুক্রবার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয় ৪ জন ডেলিভারি রোগী। কিন্তু অনেক অপেক্ষার পরেও নরমাল ডেলিভারি না হওয়ায় শনিবার সকাল থেকে দুুপুর পর্যন্ত একটানা এ ৪জন গর্ভবর্তী মায়ের সিজারিয়ান ডেলিভারি সম্পন্ন হয়।

প্রসূতিরা মায়েরা হলেন- লামা পৌরসভার বাজার পাড়ার মিনা বড়ুয়া, কলেজ গেইট পাড়ার আমেনা বেগম, পাশের চকরিয়া উপজেলার বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের মাটিয়াটিলার রাজিয়া বেগম (২৮) ও বমুরকুল পাড়ার মাজেদা আক্তার (২৮)। নারমাল ডেলিভারির চেষ্টা করেছি কিন্তু সম্ভব না হওয়ায় সিজার করতে হয়েছে। সফল ডেলিভারির পর মা ও নবজাতকরা সবাই ভালো আছেন বলে জানান, দায়িত্বরত চিকিৎসক এনেস্থেশিয়া কনসালটেন্ট নূর মুহাম্মদ।

এ ডেলিভারি অপারেশন পরিচালনায় রয়েছেন, গাইনী কনসালটেন্ট ডা. মাকসুদা বেগম, এনেস্থেশিয়া কনসালটেন্ট ডা. নূর মুহাম্মদ, সহাকারী সার্জন ডা. আতিয়া সুলতানা লাকি, সিনিয়র নার্স ইখেনুু মার্মা সিনিয়র স্টাফ নার্স ও মিডওয়াইফ নার্স শাহিনা বেগম, ইখেনু, জান্নাতুল ফেরদৌস, রেবেকা পারভিন, আরজিনা ও মিজবা। সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহিনা বেগম, জান্নাতুল ফেরদৌস ও মিডওয়াইফ মিজবা জানান, এখানে ২৪ ঘণ্টা নরমাল ডেলিভারি করানো হয়। যখনই প্রসূতি আসেন, তখনই সেবা দেওয়া হয়।

প্রসূতি রাজিয়া বেগমের অভিভাবক শফিকুর রহমান জানায়, এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি মা’দের নরলাম ও সিজারিয়ান ডেলিভারি কার্যক্রম চালু হওয়ায় আমরা সাধারণ মানুষ সরকারী চিকিৎসা সেবার প্রতি আস্থা ফিরে পেয়েছি।

এ বিষয়ে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মইনুদ্দীন মোর্শেদ বলেন, নরমাল ডেলিভারি সম্ভব না হওয়ায় প্রসূতির স্বজনদের সম্মতিক্রমে আমরা সিজারের ব্যবস্থা করি। শনিবার ৪জন গর্ভবর্তী মায়ের সফলভাবে সিজার সম্পূর্ণ করতে পেরেছি। সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে প্রসূতি মায়েদের জন্য এ ধারা অব্যাহত থাকবে।

প্রসূতি সেবা চালু করায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের ভূয়শী প্রশংসা করে লামা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা জামাল ও পৌরসভা মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম। সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে প্রসূতি মায়েদের জন্য এ ধারা অব্যাহত রাখার আহবানও জানান, এই দুই জনপ্রতিনিধি।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।