লামায় পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে ৪ হাজার পরিবার

news---12বান্দরবানের লামায় পাহাড় ধসের ঝুকিতে রয়েছে প্রায় চার হাজার পরিবার। চলতি বর্ষা মৌসুমে ভারি বৃষ্টি পাতের ফলে এসকল ঝুকিপূর্ণ পাহাড় গুলোতে ধসের সৃষ্টি হলে ব্যাপক জানমালের ক্ষতির আশংকা করছেন স্থানীয়রা। গত বছর লামার ফাইতং পাহাড় ধস ট্রাজেডির পর কিছু দিন প্রশাসনের তোড়-জোড় থাকলেও পরবর্তীতে তা থেমে যায়। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ঝুকিপূর্ণদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলেও কার্যত তা বাস্তবায়িত হয়নি। একই ভাবে চলতি মৌসুমেও লামায় পাহাড়ের পাদদেশ ও পাহাড় চুড়ায় ঝুকিপূর্ণ ভাবে বসবাসকারিদের সরিয়ে নেয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন ধরনের উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত গ্রহন করা হয়নি।
লামা উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ৭ টি ইউনিয়নে দেড় লক্ষাধিক লোকের বসবাস। এখানকার ছোট বড় পাহাড়ে জনবসতির ইতিহাস প্রায় অর্ধশত বছরের । ভৌগলিক অবস্থানগত কারনে শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ পাহাড় চূড়া, পাদদেশ ও কোল ঘেঁষে বসবাস করে আসছে। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে বর্ষা মৌসুম এলেই এ অঞ্চল পরিণত হয় আতঙ্কিত জনপদে। পরপর কয়েক বছরের পাহাড় ধস ট্রাজেডির কারণে এ পার্বত্য জনপদে বসবাসকারী অধিবাসীরা এখন পাহাড় দেখলে রীতিমত আঁতকে ওঠে। গত বছর ২৭ জুন রাতে প্রবল বর্ষণে উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের রইম্যাখোলা, পোঁকখাইয়া ঝিরি, মগনামা পাড়া ও রূপসীপাড়া ইউনিয়নের সামাইছড়িতে পাহাড় ধসের মাটি চাপায় মর্মান্তিকভাবে মারা গেছে একই পরিবারের ১১ জনসহ ২৭ জন। এর আগে ২০০৯ সালের ৩০ আগস্ট আজিজনগর ও গজালিয়ায় একই পরিবারের ৬ জনসহ মারা গেল ১১ জন। এ ছাড়া পাহাড় ধসে প্রতিবছরই অনেকে আহত হচ্ছেন। আবার বাড়ি ঘর ধংস হচ্ছে। স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের দেয়া তথ্য এবং সরজমিন পরিদর্শন কালে দেখা গেছে, লামা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় চুড়া কিংবা পাহাড়ের পাদেেদশে ঝুকিপূর্ণ ভাবে প্রায় ৪ হাজার পরিবারে ২০ হাজার মানুষ এখনো বসবাস করছে। পাহাড় ধ্বসের চরম ঝুকিতে রয়েছে- আজিজ নগরের হরিনমারা , চিউরতলী, চিউনি পাড়া ও তেলুনিয়া, ফাইতং ইউনিয়নের রইম্যাখোলা, পোঁকখাইয়া ঝিরি, মগনামা পাড়া গজালিয়া, সরই, ফাসিয়াখালী এবং রুপসী পাড়ার পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী বাসিন্দারা। এছাড়া লামা পৌর এলাকার হাসপাতাল পাড়া, চেয়ারম্যান পাড়া, নুনারবিল পাড়া, কুড়ালিয়ারটেক, টি.এন্ড টি পাড়ায়ও লোকজন ঝুকিপূর্ণ ভাবে বসবাস করছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে ইতিমধ্যে দু’দফা ভারি বর্ষণ হয়ে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোথাও পাহাড় ধসের খবর পাওয়া না গেলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ফাটল ধরা পাহাড় গুলো দু’দফা ভারি বর্ষনের পানিতে ইতিমধ্যে নরম হয়ে আছে। আবারো ভারি বর্ষণ শুরু হলে এসকল ফাটল ধরা পাহাড় ধসে পড়ার আশংকা রয়েছে।
বান্দরবান মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ মাহবুবুল আলমের মতে, এখানকার পাহাড়গুলো পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত। যা সহজেই ভঙ্গুর প্রকৃতির। এছাড়া অবাধে বৃক্ষ নিধন, পাহাড় খুঁড়ে পাথর উত্তোলন, অপরিকল্পিত জুম চাষ, পাহাড় কেটে ইটভাটা স্থাপনসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি করায় পাহাড়গুলো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। যার ফলে ব্যাপক পাহাড় ধস সৃষ্টি হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানগণ জানিয়েছেন, তাদের ইউনিয়নে ঝুকিপূর্ণ বসবাসকারিদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার জন্য কোন আশ্রয় কেন্দ্র নেই। ফাইতং ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ সামশুল আলম জানান, তার ইউনিয়নে প্রায় ৫শ’ পরিবার এখনো পাহাড়ে ঝুকিপূর্ণ ভাবে বসবাস করছে। আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় ভারি বর্ষন শুরু হলে তাদেরকে পার্শ্ববর্তী স্কুল , মাদ্রাসায় আশ্রয় নিতে বলা হয়। কিন্তু অনেক এলাকায় বিদ্যালয় না থাকায় ঝুকিপূর্ণদের প্রয়োজনীয় মুহুর্তে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়না। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীরা জানিয়েছেন, মাথা গোঁজার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই তারা বসবাস করছেন। লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, ইউপি চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে পাহাড়ে ঝুকিপূর্ণ বসবাসকারিদের তালিকা তৈরি করে অধিক ঝুকিপূর্ণদের নিরাপদে সরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
পাহাড়ে ঝুকিপূর্ণ বসবাসকারিদের ভারি বর্ষণ শুরুর পূর্বেই নিরাপদে সরিয়ে নেয়া কিংবা অন্যত্র পূর্ণবাসন করা না হলে আবারো পাহাড় ধস ট্রাজেডির আশংকা করছেন স্থানীয়রা ।

Loading...