লামায় শীতের কাঁপন

বান্দরবানের লামা উপজেলায় জেঁকে বসেছে হীম হীম শীত। সন্ধ্যার পর থেকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় প্রত্যন্ত পাহাড়ি পল্লীগুলো। আর সেটি অব্যাহত থাকে সকাল ১১টা পর্যন্ত। কোন কোন সময় দুপুর ১টা পর্যন্তও সূর্যের দেখা মেলে না। গত কয়েকদিন ধরে এ ঘন কুয়াশা ও শৈত্য প্রবাহে বিরাজ করছে। একদিকে শীতের তীব্রতা, অন্যদিকে বৃষ্টিতে দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষের জবুথবু অবস্থা। আর এই মানুষগুলো প্রশাসন বা বেসরকারী কোন প্রতিষ্ঠান থেকে শীত বস্ত্র পায়নি বলে অভিযোগ অনেকের।

আবার শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবও। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। দরিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী এখানকার অধিকাংশ অধিবাসীরা প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে রয়েছেন অতিকষ্টে। শীত নিবারণের জন্য দুর্গম পাহাড়ে বসবাসরতরা খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন বয়োবৃদ্ধ ও শিশুরা। আবার কেউ কেউ গরম কাপড়ের দোকানে দিকে ভিড় জমাচ্ছেন।
উপজেলায় শীতার্তদের জন্য সরকারীভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৬৬৪টি কম্বল। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগন্য। এছাড়া এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শীতার্তদের সহায়তায় কোন বেসরকারী সংস্থা এগিয়ে আসেনি বলেও জানান স্থানীয়রা। দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষ জনের শীতের কষ্ট লাঘবে গরম কাপড় ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।

এ বিষয়ে বাঙালি শ্রমিক আবদুর রহিম, বশির, জসিম বলেন, এ বছর অতিরিক্ত শীতের কারণে আমরা কোনও কাজ ঠিকমতো করতে পারছি না। কাজ করতে না পারায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে লামা উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এদের মধ্যে অর্ধেকের মত মানুষ দারিদ্র। গত মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে উপজেলায় শীতের তীব্রতা শুরু হয়। আস্তে আস্তে এ তীব্রতা বেড়ে চলেছে। সমতলের চেয়ে পাহাডি এলাকা হওয়ায় এখানে শীতের তীব্রতা একটু বেশি অনুভুত হয়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই পাহাড়ি জনপদে তীব্র শীত জেঁকে বসে। সকাল ১১টা পর্যন্ত শীত ও কুয়াশা অব্যাহত থাকার কারণে নিম্ন আয়ের পাথর শ্রমিকরা কাজে বের হতে পারেন না। এছাড়া বাগান এলাকায় কর্মরত শ্রমিকরাও দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

আরো জানা যায়, ঠান্ডা বাতাসের কারণে ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধরা নিউমোনিয়া ও কাশিসহ ঠান্ডাজনিত রোগে ভুগছে। শীত নিবারনে এ পর্যন্ত সরকারীভাবে পৌরসভা এলাকার জন্য ৪৬০টি ও ৭টি ইউনিয়নের জন্য ৪ হাজার ১২০টি কম্বল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট জানিয়েছে। অথচ উপজেলায় প্রায় এক লাখ মানুষ প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় দরিদ্র সীমার নিচে বাস করছে বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এদিকে কুয়াশার কারণে বিশেষ করে রাতের বেলা ও ভোর বেলায় লামা-চকরিয়া সড়কে যান চলাচল ব্যহত হচ্ছে। ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন।

জীপ চালক ওসমান গনি শিমুল জানান, সকাল ১১টা পর্যন্ত লামা-চকরিয়া সড়কের কয়েকটি এলাকা কুয়াশায় ঢেকে থাকে। অনেক সময় গাড়ির সামনে হেড লাইট জ্বালিয়েও ১৫-১৬ ফুটের বেশি দেখা যায় না।

এখানকার খেটে খাওয়া মানুষগুলো জানান, প্রচন্ড শীতের তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। প্রতিবছর এভাবেই শীতের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। এতে জীবনযাত্রা হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে জ্বালিয়ে আগুনে শরীর ছেঁকে শীত নিবারণের চেষ্টা করেন তারা।

ছোট বমু হেডম্যান পাড়ার পাহাড়ি নারী হ্লামাউ মারমা, উমে মারমা বলেন, অন্যবারের চেয়ে এ বছরে বেশি শীত পড়ছে। শীত থেকে রক্ষা পেতে আমরা আগুন জ্বালিয়ে তাপ নিচ্ছি। তিনি আরও বলেন, বেশি শীত পড়লেও আমরা এখানে যারা বসবাস করছি তাদের খবর কেউ রাখে না।

একই এলাকার পাহাড়ি মংহ্লা চিং মারমা ও বাবু মং মার্মা বলেন, বেশি শীত পড়ছে। আমাদের গরম কাপড় যা আছে, তা দিয়ে শীত ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। তীব্র শীতের কারণে দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হওয়ায় পরিবার-পরিজনের খাদ্য যোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষদের।

সরেজমিন উপজেলা শহরসহ বিভিন্ন বাজারঘুরে দেখা যায়, পুরানো কাপড় নিয়ে ব্যবসায়ীরা পসরা সাজিয়ে বসেছে। খোলা আকাশের নিচে প্রায় অর্ধ-শতাধিক শীতবস্ত্রের দোকান আছে। এসব দোকানে খুচরা মূল্যে পুরানো শীতবস্ত্র কাপড় বিক্রিতে ধুম পড়েছে।

বাজারের কাপড় ব্যবসায়ীরা জানায়,গত কয়েকদিন ধরে হাড়ভাঙ্গা শীত পড়ছে। অনুভূত হচ্ছে হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশা। গত বছরের চেয়ে পুরনো কাপড় বেচাবিক্রি ভালো।

আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, আমার ইউনিয়নের জন্য ৫২২পিস কম্বল বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত কম্বলের চেয়ে ইউনিয়নে দু:স্থ ও গরীব মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। একই অবস্থা অন্য ইউনিয়ন গুলোতে বিরাজ করছে বলে জানান জনপ্রতিনিধিরা।

লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক মো. শফিউর রহমান মজুমদার বলেন, শীতজনিত কারণে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হচ্ছে।

এ বিষয়ে লামা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মজনুর রহমান বলেন, চলতি শীত মৌসুমে উপজেলার একটি পৌরসভা ও সাত ইউনিয়নের দু:স্থ ও গরীবদের মধ্যে বিতরণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার থেকে ৪ হাজার ৫৮০টি কম্বল বরাদ্দ দেয়া হয়। ইতিমধ্যে এসব কম্বল ইউনিয়ন ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তরও করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।