লামা ও আলীকদমে তামাক বিক্রিতে কোম্পানীগুলোর প্রতারণার অভিযোগ

লামায় ক্রয় কেন্দ্রে তামাকের বেল
বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলায় উৎপাদিত তামাক বিক্রি করার পর শেষ হাসি হাসতে পারেনি চাষিরা। তামাক কোম্পানিগুলোর গুটি কয়েক কর্মকর্তা, কর্মচারীর অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতিই চাষিদের মুখের হাসি ও পরিবারের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে, আর সেটি ঘটেছে কোম্পানীগুলোর অভিনব প্রতারণার মাধ্যমে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তামাক বিক্রি করে কৃষকের পরিবর্তে লাভবান হয়েছে এক শ্রেনীর মধ্যস্বত্বভোগী। আর বৃথা গেল পরিবার পরিজনদের নিয়ে করা দীর্ঘ প্রায় ৭ মাস অক্লান্ত পরিশ্রম। কোম্পানিগুলোর গ্রেড প্রতারণা, ওজনে কারচুপিসহ নানা ছলচাতুরীর কারনে উৎপাদিত তামাকের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে প্রায়ই ঘটেছে অপ্রীতিকর ঘটনা। ইতিমধ্যে কোম্পানিগুলো তামাক বিক্রি বন্ধ করে দেয়ায় চাষিদের ঘরে থাকা তামাক বাধ্য হয়ে কম দামে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। এতে করে ভিটে বাড়ি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধন করতে হবে চাষিদের।
সূত্র জানায়, গত তিন যুগের বেশি সময় ধরে লামা ও আলীকদম উপজেলার ফসলি জমিতে বিষবৃক্ষ তামাক চাষ হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন তামাক কোম্পানীর স্থানীয় কর্মকর্তাদের লোভনীয় ডাকে কৃষকেরা ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন না করে তামাক চাষ করে থাকে কৃষকরা। চলতি মৌসুমে বিভিন্ন কোম্পানীর আওতায় বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানী বাংলাদেশ, ঢাকা টোব্যাকো কোম্পানী, আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানীসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানীর সহযোগিতায় উপজেলা দুটির প্রায় ১০ হাজার একর ফসলি জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। চাষিরা বছরের অক্টোবর মাস থেকে এ তামাক চাষ শুরু করেন। পরিবার পরিজন নিয়ে প্রায় ৭ মাস হাডভাঙ্গা অক্লান্ত পরিশ্রম করে তামাক উৎপাদন ও প্রক্রিয়জাতকরণ শেষে এপ্রিল- মে মাসে বিক্রি শুরু করে থাকেন। তামাক কোম্পানীগুলো তামাক ক্রয়ের জন্য উপজেলা শহরসহ ইউনিয়নগুলোর বিভিন্ন স্থানে ক্রয় কেন্দ্রও স্থাপন করে।
তামাক চাষি স্বার্থ রক্ষা কমিটির সভাপতি মো. শাহজাহান অভিযোগ করে বলেন, তামাক কোম্পানীগুলো চলতি মৌসুমে নানান ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে তামাক চাষিদের ঠকিয়েছে। প্রতি বেল তামাকে ব্যবহারিত চট বাবদ বিগত বছরগুলোতে সর্বোচ্চ ২ কেজি বাদ দেয়া হলেও চলতি মৌসুমে ৪ কেজি কোথাও কোথাও আরো বেশিও বাদ দেয়া হয়েছে। প্রতি কেজি ১নং গ্রেডের তামাক চলতি মৌসুমে ১৫৭ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। সে হিসেবে একজন চাষি অনেক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া কোম্পানীর লোকজন নিজেদের ইচ্ছামত গ্রেডিং করেছেন। একই ধরনের তামাক কোন পরিচিত চাষি থেকে স্বজনপ্রীতি দেখিয়ে ক্রয় করেছেন, আবার অন্য চাষির ক্ষেত্রে নিম্নমানের বলে বাদ দিয়েছেন। চাষি তামাক বিক্রয় কেন্দ্রে ১০-১২ বেল তামাক বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে আসলে ২-৪ বেল একটু ভালো মানের গ্রেডিং দিয়ে অন্যগুলো নিম্নমানের গ্রেডিং প্রদান করেছেন। গড়ে যা প্রায় ৫-৬ নং গ্রেড পড়েছে। এর ফলে চাষিরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুক্ষীণ হয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, প্রতি একর তামাক চাষে ৮শ’ থেকে ১ হাজার কেজি তামাক উৎপাদন হয়ে থাকে। এসকল তামাক প্রক্রিয়া শেষে বিভিন্ন কারনে ২-৩ বেল তামাক সাধারণত একটু কালো রংয়ের হয়ে থাকে। এসকল তামাক ক্রয় অযোগ্য বলে কোম্পানী গুলো চাষিদের থেকে ক্রয় করেনা। যার কারনে বাধ্য হয়ে চাষিরা এক শ্রেনীর মধ্যস্বত্ত¡ভোগীদের নিকট নাম মাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ওই তামাকই কোম্পানীর কিছু কিছু কর্মকর্তা নিজেদের পছন্দনীয় মধ্যস্বত্ত¡ভোগীদের নিকট থেকে মান সম্মত দামে ক্রয় করে থাকেন।
এদিকে, চাষিরা তামাক কোম্পানীগুলোর এসকল অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানীর গজালিয়া এবং লামা লাইনঝিরি এলাকায় তামাক বিক্রয় কেন্দ্রে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিলো। যা পরবর্তীতে পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সমাধান করেন। তামাক ক্রয় কেন্দ্রগুলো সরজমিন পরিদর্শনে গেলে- চাষি আব্দুর শুক্কুর, হাসিনুর ও কেমাচিং মার্মাসহ আরো অনেকে তামাক কোম্পানীগুলোর এসকল অনিয়মের কথা তুলে ধরেছেন। এসময় তারা বলেন, তামাক কোম্পানীগুলো পাতার রং এক দিকে যেমন একট কালো হলে ক্রয় করে নাই, অন্য দিকে ১২ বেলের বেশি তামাক ক্রয় করে নাই। এর ফলে চাষিরা বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখিন হয়েছেন। এতে চাষিরা ভিটেবাড়ি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ ছাড়া, আর কোন উপায় রইলনা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, কোম্পানীগুলোর ছলচাতুরীর কারনে লোকসানের সম্মুখিন হওয়ায় অনেক চাষিরা চলতি মৌসুমে পরিবার-পরিজনের স্বপ্ন পূরণতো দুরের কথা তাদের দাদনের টাকাও পরিশোধ করতে পারবেনা।
অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা টোব্যাকো কোম্পানীর ডিপো ম্যানেজার সানাউল্লাহ সিকদার বলেন, কোন ধরনের মধ্য মধ্যস্বত্ত¡ভোগীদের সুযোগ দেয়া হয়নি। প্রকৃত চাষিদের থেকেই তামাক ক্রয় করা হয়েছে। তবে যে সকল তামাকের রং একেবারে কালো এবং ঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত হয় নাই, সেকল তামাক ক্রয় করা সম্ভব নয়।
লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূরে আলম বলেন, বর্তমান সরকার কৃষি বান্ধব সরকার। কৃষকদেরকে সার, বীজসহ নানান ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছে। আমরা বিভিন্নভাবে কৃষকদেরকে তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করে আসছি। তারপরও তারা তামাক কোম্পানীগুলোর প্রলোভনে অধিক লাভের আশায় তামাক চাষ করছে। সরকারি কোন নির্দেশনা না থাকায় তামাক বিক্রয়কালিন সময়ে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কোন ধরনের মনিটরিং করা হয়না বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।