শনিবার খাগড়াছড়িতে সকাল সন্ধ্যা সড়ক অবরোধ : মিঠুন চাকমার শেষকৃত্য সম্পন্ন

ইউপিডিএফ সংগঠক মিঠুন চাকমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে তার একমাত্র শিশু সন্তান
ইউপিডিএফ সংগঠক মিঠুন চাকমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে খাগড়াছড়ি সদরের বটতলী এলাকার পারিবারিক শশ্মানে সাংগঠনিক ও সর্বস্তরের জনগণের উপস্থিতিতে মিঠুন চাকমার দাহক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে অর্পণা চৌধুরী পাড়ার নিজ বাড়ি থেকে বিকেল ৩টায় মিঠুন চাকমার লাশ শশ্মানের উদ্দ্যেশে বের করা হয়।
সকাল থেকে অর্পণা চরণ চৌধুরী পাড়াস্থ বাসভবনে সর্বস্তরের পাহাড়ি জনগণ মিঠুন চাকমা’র মরদেহে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। অসংখ্য নারী-পুরুষ নিহতের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানান। মরদেহ পারিবারিক শ্মশানে নিয়ে যাবার প্রাক্কালে দুই বছর বয়সী শিশু তিরাজ চাকমা নিহত পিতার কফিনে ফুল অর্পণের সময় বেদনাঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মিঠুন চাকমার লাশ তার দীর্ঘদিনের সংগঠন ইউপিডিএফ কার্যালয়ে নেয়াকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের সাথে দীর্ঘ দর কষাকষির পর বিকেল সাড়ে তিনটায় মৌন পদযাত্রার মাধ্যমে বটতলীস্থ পারিবারিক শ্মশানে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। ইউপিডিএফ’র পতাকাবাহী কফিনে করে মিঠুনের লাশ শ্মশানে নেয়ার সময় রাস্তার দু’পাশে শতশত মানুষ দাড়িঁয়ে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। দুই মিনিট নীরবতা পালন শেষে মিঠুনের কফিনে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা জানাতে অস্থায়ী বেদী খুলে দেয়া হয়।
ইউপিডিএফ’র পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মিঠুনের লাশ দীর্ঘদিনের সংগঠন ইউপিডিএফ’র জেলা কার্যালয় স্বর্ণিভর এলাকায় নিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে নিতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়। এর প্রতিবাদে আগামীকাল শনিবার খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল সন্ধ্যা সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে ইউপিডিএফসহ সমমনা কয়েকটি সংগঠন।
গত বুধবার বেলা ১২টায় মিঠুন চাকমাকে দিবালোকে খাগড়াছড়ি সদরের স্নইচ গেইট এলাকায় গুলি করে হত্যা করার তিনদিন অতিবাহিত হতে গেলেও এখনও পর্যন্ত থানায় কোন মামলা দায়ের হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থার নেয়ার কথা জানালেন খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তারেক মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান।
শেষকৃত্য শুরুর আগে গোলাবাড়ি বিলে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত স্মরণ সভায় গণতান্ত্রিক যুব ফোরমোর কেন্দ্রীয় সভাপতি অংগ্য মারমা মিঠুন চাকমা হত্যার প্রতিবাদ এবং খুনীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার দাবিতে শনিবার খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয়া হয়েছে।
এতে ইউপিডিফ’র বান্দরবান সংগঠক ছোটন কান্তি তঞ্চংগ্যা, মানবাধিকার সংগঠক সাদিয়া গুলরুখ, কেন্দ্রীয় ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি এস এম শাহাদাত লেনিন, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি অংগ্য মারমাসহ অন্যান্যরা বক্তব্য রাখেন।
মিঠুন চাকমা’র মরদেহ নিয়ে আয়োজিত ইউপিডিএফ’র শোক র‌্যালীকে ঘিরে পুরো শহরজুড়ে দিনভর আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন ছাড়াও যানবাহনের চলাচলে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। তল্লাশি করা হয় যাত্রবাহি বিভিন্ন যানবাহনেও।
নিহতের ছোট ভাই ডা. বাগীশ চাকমা জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় এখন পর্যন্ত কোন মামলা দায়ের করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। এমন নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার হবে কীনা তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
ইউপিডিএফ সংগঠক মাইকেল চাকমা বলেন, মিঠুন চাকমাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বাধা দেয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় কারা এঘটনার সাথে জড়িত। দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।
মিঠুনের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান চলার সময় জেলা সদরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ছিল। অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে।
প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে বাড়ির কাছ থেকে তুলে নিয়ে ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমা’র হত্যার ঘটনার দুই দিন পরও কোন দূর্বৃত্তকে গ্রেপ্তার না করে প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইউপিডিএফ নেতা-কর্মীরা। সংগঠনটির পক্ষ থেকে খুনীদের হত্যার প্রতিবাদ এবং হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিতে শনিবার সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে ইউপিডিএফ এবং সমর্থিত অন্যান্য সংগঠনগুলো।
এদিকে ব্রাশ ফায়ারে নিহত এ নেতাকে সমবেদনা জানানোর লক্ষ্যে সকালে স্বনির্ভর এলাকায় ইউপিডিএফ এক সমাবেশের মঞ্চ তৈরি করে। সেখানে শত শত নেতাকর্মী সমবেদনা জানানোর জন্য সমবেত হয়। কিন্তু আইনশৃংখলা পরিস্থিতি অবনতির আশংকায় প্রশাসন নিহত নেতার বাসা থেকে লাশ সেখানে নিতে দেয়নি। এ নিয়ে দিনবড় ছিল শহর জুরে আতংক। এমনকি নিহত মিঠুন চাকমা’র মরদেহ এবং বাড়ির আশেপাশেও মোতায়েন ছিল বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আনসার।
স্বর্নিভর এলাকায় লাশ নেয়া না নেয়া নিয়ে প্রশাসনের সাথে বেশকয়েক জন ইউপিডিএফ নেতার সাথে প্রশাসনের সাথে বাকবিতন্ডা হয়। ইউপিডিএফ নেতাকর্মীরা প্রশাসনকে হুমকি দিয়ে বলেন, লাশ নিতে না দিলে শত শত নেতাকর্মী মাঠে নেমে আন্দোলনের কর্মসূচি দেবে। এ কারনে ১২টার দিকে দাহক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা থাকলেও দাহক্রিয়া হয়েছে বিকেল চারটার পর। সেই সাথে স্বর্নিভর এলাকায় ইউপিডিএফ’র আয়োজিত স্মরণ সভাও পন্ড হয়ে যায়।
মিঠুন চাকমার স্ত্রী রিনা দেওয়ান জানান, নেতাকর্মীরা তাদের কার্য্যালয়ে নিয়ে সমবেদনা জানানোর দাবী তুলে ছিল। কিন্তু প্রশাসন বাধা দেয়ায় দাহক্রিয়া করতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম সালাউদ্দিন বাধা প্রয়োগ করার কথা অস্বীকার করে জানান, ইউপিডিএফ নেতাকর্মীরা শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করার পরিকল্পনা করেছিল তাই আইন শৃংখলা পরিস্থিতি অবনতির আশংকায় জেলা শহরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
উল্লেখ্য ৩ জানুয়ারী দুপুর ১২টা নাগাদ পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা দূর্বৃত্তরা নিজ বাড়ির সামনে থেকে তুলে নিয়ে শহরে প্রকাশ্যে ব্রাশ ফায়ার করে মিঠুন চাকমাকে হত্যা করে।

ইউপিডিফ’র বিবৃতি: মিঠুন চাকমা’র প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনে প্রশাসনের বাধা অভিযোগ
খাগড়াছড়ি সদরের স্বনির্ভরস্থ ইউপিডিএফ কার্যালয়ে মিঠুন চাকমা’র প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচিতে বাধা প্রদানের অভিযোগ করেছে, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)।
বিবৃতিতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় প্রচার শাখার প্রধান নিরন চাকমা অভিযোগ করেন, মিঠুন চাকমার দাহক্রিয়া ও শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান ভন্ডুল করার উদ্দেশ্যে খাগড়াছড়ির পানছড়ি, দীঘিনালা, মানিকছড়ি, লক্ষী ছড়ি, জালিয়া পাড়া, গুইমারা, মাটিরাঙ্গাসহ বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে আসা লোকজনকে গাড়ি আটকিয়ে তল্লাশি ও বাধা প্রদান করা হচ্ছে।
তবে প্রশাসনের বাধা সত্তে¡ও ঢাকা, রাঙামাটি, বান্দরবান, টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে খাগড়াছড়িতে এসে পৌঁছেছেন।
ইউপিডিএফ’র খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের প্রধান সংগঠক সচিব চাকমা প্রশাসনের বাধাদানের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, মিঠুন চাকমা হত্যার ঘটনায় সেনা-প্রশাসন যে জড়িত আজকের এই বাধা দানের মাধ্যমেই তা প্রমাণিত হচ্ছে।
তিনি শত বাধা সত্তে¡ও অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জন্য নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভাকাক্সক্ষীসহ সর্বস্তরের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।